বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সেচনির্ভর বোরো ধান চাষ। স্বাধীনতার পর খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলায় যে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন কৃষিতে বিপ্লব ঘটায়, তার অন্যতম ভিত্তি ছিল ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর সেচের বিস্তার। বর্তমানে দেশে প্রায় ৬০ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হয়, যার প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-এর তথ্য অনুযায়ী, বোরো ধান একাই দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৫৫-৫৭ শতাংশ সরবরাহ করে। অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বোরো মৌসুম এবং তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সেচব্যবস্থা।
বিজ্ঞাপন
তবে এই সাফল্যের পেছনে একটি গভীর পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা হলো ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ক্রমাগত নিম্নগামীতা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, দেশের অনেক অঞ্চলে প্রতিবছর গড়ে ০.৫-১.০ মিটার পর্যন্ত পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে; উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু জেলায় এই হার আরও বেশি। ৫ দশকে বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমেছে, যেখানে বিভিন্ন অঞ্চলে এই পতন ৪ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত। বরেন্দ্র অঞ্চলসহ কিছু এলাকায় এটি প্রায় ৪০ মিটার পর্যন্ত নেমে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ অগভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়ে এবং ঢাকা, রংপুর, রাজশাহীসহ বিভিন্ন স্থানে পানির স্তর গড়ে ৫-২৪ মিটার নেমেছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সেচের জন্য পানির প্রাপ্যতা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, উত্তোলন ব্যয় বাড়বে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং সামগ্রিক পানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩.৮-৪.০ কোটি টন ধান উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে বোরো মৌসুমে উৎপাদন প্রায় ২.০-২.২ কোটি টন। শুষ্ক মৌসুমে নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় সেচের প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশ পানি ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে আসে। দেশে বর্তমানে প্রায় ১৪-১৫ লাখ অগভীর নলকূপ এবং ৩৫-৪০ হাজার গভীর নলকূপ সচল রয়েছে। এই বিশাল সেচ অবকাঠামো খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, একই সঙ্গে এটি পানির স্তর হ্রাসের অন্যতম কারণ। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন-এর তথ্য অনুযায়ী, অনেক সেচ এলাকায় পানির ব্যবহার দক্ষতা মাত্র ৪০-৪৫ শতাংশ; অর্থাৎ উত্তোলিত পানির অর্ধেকেরও বেশি অপচয় হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বোরো মৌসুমে পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি হিসেবে অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং (এডব্লিউডি) বা পর্যায়ক্রমিক ভেজা-শুকনা পদ্ধতি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এ পদ্ধতিতে ধানের জমি সবসময় পানিতে প্লাবিত না রেখে নির্দিষ্ট সময় অন্তর মাটি কিছুটা শুকাতে দেওয়া হয়। জমিতে পানির স্তর পর্যবেক্ষণের জন্য ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা একটি ছিদ্রযুক্ত পাইপ বসানো হয়, যার ১৫ সেন্টিমিটার মাটির নিচে থাকে এবং নির্দিষ্ট দূরত্বে ছিদ্র থাকে। পানির স্তর নির্ধারিত সীমার নিচে নামলে তবেই পুনরায় সেচ দেওয়া হয়। ফলে অপ্রয়োজনীয় সেচ বন্ধ হয় এবং পানির ব্যবহার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।
বিজ্ঞাপন
গবেষণায় দেখা গেছে, এডব্লিউডি পদ্ধতিতে ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত সেচের পানি সাশ্রয় সম্ভব, অথচ ফলন সাধারণত অপরিবর্তিত থাকে কিংবা অনেক ক্ষেত্রে ৫-৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। পাশাপাশি সেচ ব্যয় ১৫-২০ শতাংশ কমে এবং মিথেন নিঃসরণ ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। প্রচলিত প্লাবন সেচ পদ্ধতিতে ১ কেজি ধান উৎপাদনে প্রায় ২৮০০-৩৫০০ লিটার পানি লাগে, যা বিশ্বে অন্যতম উচ্চ ব্যবহার হার। এ বাস্তবতায় এডব্লিউডি কেবল পানি সাশ্রয়ী নয়, বরং পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার একটি কার্যকর উপায়।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে পানির সংকট সব অঞ্চলে এক নয়; তাই এডব্লিউডির প্রয়োজনীয়তাও অঞ্চলভেদে ভিন্ন। উত্তরাঞ্চলে (রাজশাহী-রংপুর অঞ্চল) বৃষ্টিপাত তুলনামূলক কম এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বেশি, এখানে এডব্লিউডি সরাসরি পানির পুনর্ভরণে সহায়ক হতে পারে। হাওর অঞ্চলে বর্ষায় পানির প্রাচুর্য থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে সেচ সংকট দেখা দেয়; মৌসুমি বৈপরীত্য সামাল দিতে পানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা একটি বড় সমস্যা; স্বাদু পানির সীমাবদ্ধতায় কম পানি ব্যবহার অপরিহার্য। চরাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় সেচ অবকাঠামো সীমিত; সেখানে পানি সংরক্ষণ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা ছাড়া টেকসই কৃষি সম্ভব নয়। এসব অঞ্চলে এডব্লিউডি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধান দিতে পারে।
তবু এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তিন দশকে প্রযুক্তিটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়নি। এর প্রধান কারণ প্রযুক্তিগত নয়, বরং আচরণগত ও প্রাতিষ্ঠানিক, তথা সেচের পানি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। বাংলাদেশে ধানক্ষেতে পানি জমিয়ে রাখার সংস্কৃতি বহু পুরোনো। অনেক কৃষকের বিশ্বাস যে জমি শুকনো থাকলে ফলন কমবে। ফলে নিজের জমি শুকনো এবং পাশের জমি পানিতে ভরা দেখলে কৃষক উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। আবার বোরো মৌসুমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নলকূপ মালিকের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে পানি কিনতে হয়, অর্থাৎ পানি ক্রয় করা হয় পুরো মৌসুমের জন্য, ব্যবহারের পরিমাণের ওপরে নয়। ফলে কৃষক পানি ‘পাওয়ার অধিকার’ নিশ্চিত করতে চান, প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক। প্রভাবশালী কৃষক হলে ব্যত্যয় হওয়ার সুযোগ কম; ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক হলে জমিতে পানি না থাকলে তাদের কাছে বঞ্চনা মনে হয়। তবে বাস্তবতা হলো ক্ষুদ্র ও প্রান্তিকের পক্ষে এককভাবে এডব্লিউডি অনুসরণ করা সম্ভব নয়। এছাড়া প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের প্রক্রিয়ায় অংশীজনের সীমিত সম্পৃক্ততাও বড় বাধা। অনেক সময় গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। আবার প্রকল্পভিত্তিক সম্প্রসারণে প্রকল্প চলাকালীন অগ্রগতি থাকলেও শেষ হলে ধারাবাহিকতা থাকে না। প্রশিক্ষণ, তদারকি ও পরামর্শ সেবাও সব এলাকায় সমান নয়। ফলে কৃষকের আস্থা তৈরি হয় না।
বিজ্ঞাপন
এডব্লিউডি সম্প্রসারণ এখন রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার তাদের হালনাগাদ এনডিসি ৩.০-এ ২০৩০ সালের মধ্যে বোরো ধানের প্রায় ৩০ শতাংশ জমিতে এডব্লিউডি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান ও সমন্বিত পদক্ষেপ এখনো সীমিত বা অনেকক্ষেত্রে অনুপস্থিত। ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা ও পানি সুরক্ষার স্বার্থে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
বাস্তবমুখী সম্প্রসারণ কৌশলের প্রথম ধাপ হতে পারে, যেমন একটি সম্পূর্ণ সেচ স্কিমে একযোগে এডব্লিউডি বাস্তবায়ন, প্রাথমিক অবস্থায় আগ্রহী সেচ স্কিমকে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। এতে সামাজিক তুলনা ও দ্বিধা কমবে।
দ্বিতীয়ত, ভূগর্ভস্থ পানির মৌসুম ভিত্তিক না হয়ে, পরিমাণভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ জরুরি। নির্দিষ্ট হারে পানি ব্যবহার করলে খরচ কম, এমন কাঠামো গড়ে তুললে কৃষক সাশ্রয়ে উৎসাহিত হবেন। পানি সাশ্রয়কারী কৃষকদের প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়া যেতে পারে।
তৃতীয়ত, উন্নত পানি বিতরণ ব্যবস্থা, ভূ-নিম্নস্থ পাইপ, ফিতা পাইপ ইত্যাদির ব্যবহার বাড়াতে হবে, যাতে অপচয় কম।
চতুর্থত, সম্প্রসারণ ব্যবস্থাকে প্রকল্পনির্ভরতা থেকে বের করে প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতায় আনতে হবে। কৃষক মাঠদিবস, সফল কৃষকের অভিজ্ঞতা বিনিময়, গণমাধ্যম প্রচারণা এবং স্থানীয় নেতৃত্বের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকের প্রধান লক্ষ্য নিশ্চিত উৎপাদন তাই প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে ফলন অক্ষুণ্ন বা বৃদ্ধি পাওয়ার বাস্তব প্রমাণ তুলে ধরতে হবে।
বাংলাদেশ শুধুমাত্র বোরো মৌসুমে প্রায় ২০০০০ মিলিয়ন কিউবিক মিটার ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে, এডব্লিউডি বাস্তবায়ন হলে প্রতি বছর বোরো মৌসুমে প্রায় ৫০০০ মিলিয়ন কিউবিক মিটার ভূগর্ভস্থ পানি সাশ্রয় করা সম্ভব, পাশাপাশি হেক্টর প্রতি প্রায় ৩০ লিটার ডিজেল সাশ্রয় হয়, যা জাতীয় পর্যায়ে কোটি কোটি টাকার জ্বালানি খরচ সাশ্রয়, জীবাশ্ম জ্বালানি হতে নিঃসৃত গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে কাজ করবে।
বাংলাদেশের কৃষি আজ ভূগর্ভস্থ সেচনির্ভর বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু পানির স্তরের ক্রমাগত পতন ভবিষ্যতের জন্য বড় সতর্কবার্তা। এডব্লিউডি প্রযুক্তি পানি সাশ্রয়, ব্যয় হ্রাস, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই কৃষি নিশ্চিত করার কার্যকর উপায়। তবে প্রযুক্তি জনপ্রিয় করতে কেবল বৈজ্ঞানিক প্রমাণ যথেষ্ট নয়; সামাজিক আচরণ, অর্থনৈতিক কাঠামো ও নীতিগত সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা, প্রণোদনা, আইনগত কাঠামো ও সমন্বিত সেচ ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়িত হলে এডব্লিউডি বাংলাদেশের কৃষিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারে। এখনই পানি ব্যবস্থাপনায় সংস্কার না আনলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদনের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই এডব্লিউডিকে কেবল একটি প্রযুক্তি নয়, বরং ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষার কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা সময়ের দাবি।
ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন : গবেষক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট
nazim.68@gmail.com
