বিজ্ঞাপন

অটিজম শনাক্তকরণে ত্রুটি

দায়সারা প্রক্রিয়ায় কি জনস্বাস্থ্যের লক্ষ্য পূরণ সম্ভব?

অ+
অ-
দায়সারা প্রক্রিয়ায় কি জনস্বাস্থ্যের লক্ষ্য পূরণ সম্ভব?

২ এপ্রিল, বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও বর্ণিল আয়োজনে দিবসটি পালিত হচ্ছে। সভা- সেমিনারের আর রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার ভিড়ে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, অটিজম বা ‘অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার’ (ASD) কোনো রোগ নয়, বরং এটি মস্তিষ্কের বিকাশের একটি বিশেষ অবস্থা। বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে সামাজিক সচেতনতা এক দশকে অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর সঠিক শনাক্তকরণ ও সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতিগত দুর্বলতা রয়ে গেছে, তা একজন মানসিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমাকে আজ গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ভাতাভোগী নির্ধারণের জন্য যে তাড়াহুড়ো এবং অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, তা এই শিশুদের অধিকার ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, উভয়ের জন্যই এক বড় অন্তরায়।

বিজ্ঞাপন

আমাদের দেশের তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণের গুরুদায়িত্ব মূলত ন্যস্ত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসারদের ওপর। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মেডিকেল অফিসারের অটিজম বা নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার (NDD) বিষয়ে কোনো বিশেষায়িত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ নেই। এমবিবিএস কারিকুলামে এই বিষয়টি অত্যন্ত সংক্ষেপে পড়ানো হয়, যা দিয়ে একটি শিশুর জটিল আচরণগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তাকে ‘অটিস্টিক’ হিসেবে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব। যখন ভাতাভোগী নির্বাচনের সময় শত শত আবেদনকারী ভিড় করেন, তখন মাত্র কয়েক মিনিটের সাধারণ শারীরিক পরীক্ষা বা অভিভাবকের মুখে শুনেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এই ‘তড়িঘড়ি সংস্কৃতি’ জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি অশনিসংকেত। কারণ, অটিজম এমন কোনো বিষয় নয় যা স্টেথোস্কোপ বা রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়বে; এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ এবং শিশুর সামাজিক ও যোগাযোগ দক্ষতার নিবিড় মূল্যায়ন। প্রশিক্ষণহীন অবস্থায় এই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা অনেক সময় ভুল ডায়াগনোসিসের দিকে ঠেলে দেয়।

যেকোনো বৈজ্ঞানিক নির্ণয়ের জন্য একটি ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বা আদর্শ টুল থাকা আবশ্যিক। উন্নত বিশ্বে অটিজম শনাক্তকরণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে আজও এমন কোনো সহজবোধ্য এবং বৈজ্ঞানিক ‘ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ডায়াগনস্টিক টুল’ বাধ্যতামূলক করা হয়নি যা তৃণমূলের একজন সাধারণ চিকিৎসক অনায়াসে ব্যবহার করতে পারেন। একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা বা টুলের অভাবে একেক চিকিৎসক একেক মানদণ্ডে অটিজম নির্ধারণ করছেন। এর ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে, কোনো শিশু হয়তো কেবল শ্রবণ প্রতিবন্ধী বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধী, তাকে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে অটিজম কার্ড। আবার প্রকৃত অটিজম আক্রান্ত শিশুটি সঠিক যাচাইয়ের অভাবে তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। এতে প্রকৃত অটিজম আক্রান্ত শিশুর সঠিক পরিসংখ্যান যেমন মিলছে না, তেমনি তারা সঠিক থেরাপি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এই ভুল ডায়াগনোসিসের প্রভাব শুধু ব্যক্তির ওপর নয়, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও সুদূরপ্রসারী। আমাদের জাতীয় তথ্য বাতায়ন বা ডিসঅ্যাবিলিটি ইনফরমেশন সিস্টেমে (DIS) যে তথ্যগুলো জমা হচ্ছে, তার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার অবকাশ থেকে যাচ্ছে। যখন ডেটাবেজে ভুল তথ্য প্রবেশ করে, তখন সরকারের পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যখন জনস্বাস্থ্য নীতিমালা তৈরি হয়, তখন প্রকৃত সমস্যা আড়ালেই থেকে যায়। এতে রাষ্ট্রের সম্পদের অপচয় ঘটে এবং যারা প্রকৃত সেবা পাওয়ার যোগ্য, তারা বঞ্চিত হয়। এই বিভ্রান্তি দূর করা না গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি (SDG) লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করাও আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।

অটিজম দিবসের আজকের অঙ্গীকার হওয়া উচিত এই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার আমূল সংস্কার। উপজেলা পর্যায়ের প্রতিটি মেডিকেল অফিসারকে অন্তত স্বল্পমেয়াদি নিবিড় প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে, যাতে তারা ক্লিনিক্যাল অবজারভেশনের মাধ্যমে অটিজমের প্রাথমিক লক্ষণগুলো নির্ভুলভাবে চিনতে পারেন। পাশাপাশি বাংলা ভাষায় রূপান্তরিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত একটি স্ক্রিনিং টুল তৃণমূল পর্যায়ে বাধ্যতামূলক করতে হবে। শুধু একজন চিকিৎসকের ওপর ভার না দিয়ে একজন সমাজসেবা কর্মকর্তা, একজন ফিজিওথেরাপিস্ট বা সাইকোলজিস্টের সমন্বয়ে একটি ‘মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি টিম’ গঠন করা জরুরি। একইসঙ্গে ভাতাভোগী নির্ধারণের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় ও কক্ষ বরাদ্দ রাখতে হবে, যাতে প্রতিটি শিশুকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া যায়। ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মাধ্যমে উপজেলা থেকে পাঠানো ডেটাগুলো জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দ্বারা মাঝেমধ্যে যাচাই করার ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।

পরিশেষে বলতে চাই, অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি কেবল সহানুভূতি দেখানোই যথেষ্ট নয়, তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের রাষ্ট্রীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। আর এই অধিকারের প্রথম ধাপ হলো সঠিক শনাক্তকরণ। দায়সারা গোছের ডায়াগনোসিস দিয়ে আমরা শুধু একটি ভুল পরিসংখ্যানই তৈরি করছি না, বরং হাজার হাজার শিশুর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছি। আজকের এই দিবসে আমরা যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে, মাঠপর্যায়ের এই কাঠামোগত ত্রুটিগুলো দূর করার শপথ নেই। কারণ, সঠিক রোগ নির্ণয়ই হলো সঠিক সেবার প্রথম ও প্রধান সোপান।

বিজ্ঞাপন

ইমদাদুল হক তালুকদার : সহকারী অধ্যাপক (খণ্ডকালীন), মনোবিজ্ঞান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
haque.talukdar@gmail.com