বিজ্ঞাপন

কৃষিতে ডিজেল সংকটের প্রভাব, শঙ্কায় কৃষক

অ+
অ-
কৃষিতে ডিজেল সংকটের প্রভাব, শঙ্কায় কৃষক

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের খবর যেমন বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি ও শক্তির বাজারকে প্রভাবিত করছে, তেমনি এর ছায়া সরাসরি পড়ছে আমাদের দেশের কৃষিক্ষেত্রেও। ডিজেল চালিত কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন ট্রাক্টর, সেচপাম্প এবং কৃষি সামগ্রী উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন সার ও কীটনাশক সরবরাহে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এই সংকটে বিশেষত প্রান্তিক কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ভুগছেন। তারা যেমন ইতিমধ্যেই সীমিত সম্পদ ও আয় নিয়ে সংগ্রাম করছেন, এবার ডিজেলের স্বল্পতা ও মূল্যবৃদ্ধির মুখোমুখি হচ্ছেন।

বাংলাদেশে কৃষিক্ষেত্রে ডিজেলের ব্যবহার প্রায় অপরিহার্য। বিশেষ করে ট্রাক্টর, সেচপাম্প এবং ছোট-বড় কৃষি যন্ত্রপাতি চালানোর ক্ষেত্রে ডিজেলের বিকল্প নেই। বর্তমানে ডিজেলের বাজার মূল্য ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় প্রান্তিক কৃষকেরা তাদের উৎপাদন পরিকল্পনা ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। ফলে মাঠে যেমন সঠিক সময়ে বীজ বোনা বা সেচ কার্যক্রম করা যাচ্ছে না, তেমনি ফসলের উৎপাদনও প্রভাবিত হচ্ছে।

ডিজেল সংকটের প্রভাব কেবল যন্ত্রপাতিতে সীমাবদ্ধ নয়। সার, কৃষি রাসায়নিক ও অন্যান্য ইনপুট সামগ্রীর উৎপাদন ও সরবরাহেও তীব্র প্রভাব পড়ছে। কারণ সার উৎপাদন ও পরিবহন প্রক্রিয়ায়ও ডিজেলের ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। যেকোনো প্রান্তিক কৃষক বা ক্ষুদ্র চাষি, যারা সার ও অন্যান্য জিনিসের সঠিক সময়ে কিনে মাঠে প্রয়োগ করে থাকেন, তাদের উৎপাদনশীলতা এই সংকটের কারণে হ্রাস পাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের সংকট দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যদি ডিজেলের অভাব ও সার সরবরাহের অসঙ্গতি অব্যাহত থাকে, তবে কৃষি উৎপাদন ও বাজার সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। ফলে খাদ্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, গরিব ভোক্তাদের জন্য প্রাপ্যতা সীমিত হওয়া এবং দেশের মোট খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়া অনিবার্য।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজেল সংকটের প্রভাবে প্রান্তিক কৃষকেরা দুই ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন।

প্রথমত, উৎপাদন খরচ বাড়ছে। ডিজেল ও সারসহ অন্যান্য জিনিসের দাম বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয়ত, উৎপাদন সময়সূচি বিঘ্নিত হচ্ছে। সঠিক সময়ে বীজ বোনা ও সেচ কার্যক্রম না হওয়ায় ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে, যা সরাসরি কৃষকের আয়ে প্রভাব ফেলছে।

অতীতেও আমরা দেখেছি, আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে প্রভাব পড়েছে। তবে এখন পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং তেলের সরবরাহে সম্ভাব্য ব্যাঘাত দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। অর্থাৎ এটি শুধু মূল্যবৃদ্ধি নয়, বরং সরবরাহ চেইনের সংকটও তৈরি করতে পারে।

এমন অবস্থায় নীতি নির্ধারকদের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সচেতন হওয়া জরুরি। কয়েকটি নীতিগত ব্যবস্থা তাত্ক্ষণিকভাবে প্রান্তিক কৃষকদের সুরক্ষা দিতে পারে।

প্রথমত, ডিজেলের বিকল্প জ্বালানি ও স্থানীয় উৎপাদিত জ্বালানির ব্যবহারের সুযোগ সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বায়োডিজেল, সোলার-চালিত সেচপাম্প বা LPG-চালিত যন্ত্রপাতি কৃষি কার্যক্রমে ব্যবহার বৃদ্ধি করা যেতে পারে। এটি শুধু বর্তমান সংকট মোকাবিলা করবে না, বরং ভবিষ্যতে কৃষি জ্বালানির স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

দ্বিতীয়ত, সার ও কৃষি ইনপুটের স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। যদি আমরা দেশের প্রয়োজনীয় সার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে পারি এবং ভোক্তা বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারি, তবে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠাপড়ার প্রভাব সীমিত হবে। বিশেষ করে, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী ও সময়মতো সার সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত, ডিজেল ও সারসহ কৃষি ইনপুটের জন্য সাবসিডি ও প্রণোদনা প্রয়োগ করা যেতে পারে। প্রান্তিক কৃষকরা মূলত সীমিত অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে বাজারমূল্যে সরবরাহিত জ্বালানি ও ইনপুট কিনতে পারছেন না। তাই সরকারের সক্রিয় প্রণোদনা তাদের উৎপাদনশীলতা রক্ষা করতে সহায়ক হবে।

চতুর্থত, কৃষিতে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার উপায় রয়েছে। সোলার পাম্প, ইলেকট্রিক ট্রাক্টর এবং আধুনিক ড্রিপ সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিজেল নির্ভরতা কমানো সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদে এটি শুধু ডিজেল সংকটের প্রভাব কমাবে না, বরং কৃষিকে আরও টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করে তুলবে।

পঞ্চমত, সরকারের উচিত কৃষি বিপণন ও সরবরাহ চেইনকে শক্তিশালী করা। ডিজেলের অভাবে ফসলের বাজারজাতকরণ বাধাপ্রাপ্ত হলে কৃষক ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। তাই সরবরাহ চেইন এবং কৃষি লজিস্টিক সিস্টেমকে উন্নত করা, ডিজেল-নির্ভরতা কমানো, এবং স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যবস্থাকে সক্রিয় করা গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়াও কৃষি সম্প্রদায় ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে ডিজেল-সংকট ও সার-উৎপাদনের প্রভাব মোকাবিলার স্থানীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রান্তিক কৃষকদের জন্য স্থানীয় সমবায় ও কৃষক সংগঠন গঠন করে জ্বালানি, ইনপুট সংরক্ষণ ও বণ্টন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের মূল্য ও সরবরাহে অস্থিরতা যে দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে, তা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। তাই এটি শুধুমাত্র কৃষি বিষয়ক সমস্যা নয়, জাতীয় অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নও। খাদ্য সংকট বা মূল্যস্ফীতি যে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, তা বিবেচনায় এনে এখনই নীতি নির্ধারক ও সরকারের উচিত সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

সংক্ষেপে, বর্তমান ডিজেল সংকট প্রান্তিক কৃষকদের জন্য মারাত্মক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। এটি শুধু উৎপাদন ও আয় হ্রাস করছে না, বরং দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

নীতিনির্ধারকরা ডিজেলের বিকল্প জ্বালানি, সার উৎপাদন সম্প্রসারণ, প্রণোদনা, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করতে পারেন। তৎপর পদক্ষেপ না নিলে, প্রান্তিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও বিপন্ন হতে পারে।

অতএব, বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে সৃষ্ট এই কৃষি-সংকটকে প্রান্তিক কৃষকের সুরক্ষা এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ হিসেবে দেখার সময় এখন। এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে, আগামী প্রজন্মের জন্য টেকসই ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে যাবে।

সমীরণ বিশ্বাস : কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
srb_ccdbseed@yahoo.com

বিজ্ঞাপন