বিজ্ঞাপন

হাম ও হামের টিকা সম্পর্কে যা জানা জরুরি

অ+
অ-
হাম ও হামের টিকা সম্পর্কে যা জানা জরুরি

হাম বা রুবিওলা বা মিজলস একটি ভয়ানক সংক্রামক রোগ। কোনো সংক্রামক রোগের সংক্রমণ ক্ষমতা বিচার করার জন্য R₀ (আর-নট) নামের একটি ইনডিকেটর ব্যবহার করা হয়। R₀ এর মান নির্দেশ করে কোনো রোগে আক্রান্ত একজন ব্যক্তি গড়ে কতজনকে সংক্রমিত করতে পারে। যে রোগের R₀-এর মান যত বেশি, সে রোগ তত বেশি সংক্রামক।

বিজ্ঞাপন

হামের R₀-এর মান ১২-১৮ এবং এ অনুযায়ী এটি বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগ। একজন হাম আক্রান্ত রোগী গড়ে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। হামের ইনফেকটিভিটি বা সংক্রমণ ক্ষমতার হার প্রায় ৯০ শতাংশ।

হাম কী এবং কীভাবে ছড়ায়?

হামের ইংরেজি নাম রুবিওলা (Rubeola), তবে এটি ইংরেজিতে এটি মিজলস (measles) নামে বেশি পরিচিত। এটি ভাইরাসজনিত অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। হাম ভাইরাসের পূর্ণ বৈজ্ঞানিক নাম মিজলস মর্বিলিভাইরাস (Measles morbillivirus)। এটি একটি অতিক্ষুদ্র আরএনএ ভাইরাস।

বিজ্ঞাপন

হাম ভাইরাসের জিনোমে মাত্র ১৫,৮৯৪টি নিউক্লিওটাইড এবং এর মধ্যে ছয়টি প্রধান জিন থাকে যেগুলো মোট ৮টি প্রোটিনের সংকেত বহন করে। এর মধ্যে ভাইরাসের দেহে থাকা দুটি সার্ফেস প্রোটিন-হিমাগ্লুটিনিন (H) এবং ফিউশন (F) প্রোটিন- ভাইরাসটিকে মানবদেহে প্রবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অন্যান্য অনেক সংক্রামক রোগের মতো হাম সর্দি-কাশি ও কথা বলার সময় তৈরি হওয়া ক্ষুদ্র শ্বাসতান্ত্রিক ড্রপলেটের  মাধ্যমে হামের ভাইরাস একজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে পড়ে। শ্বাসগ্রহণের সময় ভাইরাসবাহী ড্রপলেটগুলো মানবদেহে প্রবেশ করে এবং প্রথমে ফুসফুসের অ্যালভিওলার ম্যাক্রোফেজ ও সাব-এপিথেলিয়াল ডেনড্রাইটিক কোষে সংক্রমিত হয়।

এরপর এই সংক্রমিত কোষগুলোর মাধ্যমে ভাইরাসটি নিকটবর্তী লিম্ফ নোডে পৌঁছায়, যেখানে এটি দ্রুত বংশবিস্তার করে। এরপর নতুন জন্ম নেওয়া ভাইরাসগুলো দ্রুত রক্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে সংক্রমণ বিস্তার করে, যার ফলে পরবর্তীতে জ্বর, কাশি ও র‍্যাশসহ হামের উপসর্গগুলো দেখা দেয়।

বিজ্ঞাপন

অসুস্থ ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা কথা বলার সময় ফুসফুস থেকে যে ভাইরাসবাহী ক্ষুদ্র ড্রপলেটগুলো তৈরি হয় তা প্রায় ২ ঘণ্টা পর্যন্ত সংক্রমণক্ষম থাকে। হামের রোগী র‍্যাশ শুরুর ৪ দিন আগে থেকে শুরু করে র‍্যাশ হওয়ার পর ৪ দিন পর্যন্ত সংক্রামক থাকে।

হামের লক্ষণ কী?

হামের জীবাণু শরীরে প্রবেশের পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে কমপক্ষে ১০-১৪ দিন সময় লাগে। তাই, কার মাধ্যমে এবং কখন ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে তা বোঝা কঠিন। হামের প্রাথমিক উপসর্গগুলো হলো, সর্দি, কাশি, তীব্র জ্বর (১০৩-১০৫°F), চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং গালের ভেতরে ছোট সাদা দাগ বা কপ্লিক স্পটের আবির্ভাব। এ উপসর্গগুলো সাধারণত ৪-৭ দিন স্থায়ী হয়।

হামের সবচেয়ে দৃশ্যমান লক্ষণ হলো ত্বকে লাল ফুসকুড়ি (র‍্যাশ)। র‍্যাশ সাধারণত সংক্রমণের ৭-১৮ দিন পরে শুরু হয়, প্রথমে মুখ ও গলার উপরের অংশে দেখা যায়। এটি প্রায় ৩ দিনের মধ্যে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, শেষ পর্যন্ত হাত ও পা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। র‍্যাশ সাধারণত ৫-৬ দিন স্থায়ী হয়, তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।

অধিকাংশ হাম আক্রান্ত রোগী রোগের সূচনা থেকে ৭-১০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে এবং শরীরে আজীবন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় এবং দ্বিতীয়বার হাম দিয়ে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। হাম ভাইরাস সংক্রমণের পর মানবদেহ মূলত হিমাগ্লুটিনিন (H) প্রোটিনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে এবং এ অ্যান্টিবডিই পরবর্তী সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।

একজন হাম আক্রান্ত রোগী গড়ে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। হামের ইনফেকটিভিটি বা সংক্রমণ ক্ষমতার হার প্রায় ৯০ শতাংশ।

তবে, রোগীর বয়স, রোগ প্রতিরোধ অবস্থা, ভিটামিন-এ-এর অবস্থা, আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে প্রায় ৩০ শতাংশ হাম আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা যায়। তবে, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু ও ৫ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ৩০ বছরের বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে জটিলতা বেশি দেখা দেয়।

হামের জটিলতাগুলোর মধ্যে রয়েছে অন্ধত্ব, কানের সংক্রমণ (otitis media), ল্যারিঞ্জোট্র্যাকি ব্রঙ্কাইটিস (croup), ডায়রিয়া এবং নিউমোনিয়া। সংক্রমণ-পরবর্তী হামজনিত এনসেফালাইটিস প্রতি ১০০০-২০০০ রোগীর মধ্যে প্রায় ১-৪ জনে দেখা যায় এবং সাবঅ্যাকিউট স্ক্লেরোজিং প্যানেন্সফালাইটিস (SSPE) সাধারণত সংক্রমণের কয়েক বছর পরে প্রতি ১০,০০০-১,০০,০০০ রোগীর মধ্যে প্রায় ১ জনে দেখা দেয়।

যে রোগীদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল যেমন এইডস আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে হাম-এর গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে যার মধ্যে রয়েছে তীব্র এনসেফালাইটিস এবং মারাত্মক নিউমোনিয়া।

গর্ভাবস্থায় কোনো নারী হাম আক্রান্ত হলে তা মায়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং এর ফলে শিশুর অকাল জন্ম বা কম ওজন নিয়ে জন্মানোর সম্ভাবনা থাকে।

হামের মৃত্যুহার কেমন?

উন্নয়নশীল দেশগুলোয় হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া এবং প্রোটিন-ক্ষয়জনিত অন্ত্ররোগ দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি এসব দেশে অপুষ্টি, বিশেষ করে ভিটামিন-এ-এর ঘাটতি এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রভাব বেশি থাকায় হামজনিত মৃত্যুহার সাধারণত ৩-৬ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ করে বাস্তুচ্যুত বা বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে মৃত্যুর হার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

এক বছরের কম বয়সী শিশু এবং ৩০ বছরের বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। তবে, সঠিক চিকিৎসা না পেলে হাম আক্রান্ত রোগীর ১০ শতাংশ মৃত্যুবরণ করতে পারে। এইডস আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে এই মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

অন্যদিকে, উন্নত দেশগুলোতে হামজনিত মৃত্যু নেই বললেই চলে এবং মৃত্যুহার সাধারণত ০.০১–০.১ শতাংশ।

হামের প্রাদুর্ভাব কোন সময়ে হয় এবং বিশ্বে কত মানুষ আক্রান্ত হয়?

বাংলাদেশসহ বিশ্বের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলগুলোতে এ রোগটি শুষ্ক আবহাওয়ার সময় বিস্তার ঘটে। তবে, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে এটি শীতের শেষ ভাগে ও বসন্তের সময় বিস্তার লাভ করে।

১৯৬৩ সালে হাম টিকা চালুর আগে এবং ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার পূর্বে বিশ্বে প্রতি দুই থেকে তিন বছর পরপর বড় ধরনের হামের মহামারি দেখা দিত এবং এতে প্রতি বছর আনুমানিক ২৬ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটত।

বিশ্বব্যাপী হামের ত্বরান্বিত টিকাদান কার্যক্রমের ফলে ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ছয় কোটি মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। একটি পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। বিশ্বে হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ২০০০ সালে ছিল প্রায় ৭ লাখ ৮০ হাজার; টিকাদান কর্মসূচির কারণে এটি কমে ২০২৪ সালে ৯৫ হাজারে নেমে এসেছে।

তবে, ২০২৩ সাল থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকাসহ অনেক দেশে হামের রোগীর সংখ্যা হঠাৎ বৃদ্ধি পেয়েছে। সে বছর বিশ্বে মোট ১ কোটি ৩ লাখ হামের রোগী শনাক্ত হয়। কোভিডের কারণে হামের টিকা প্রদানে বিঘ্ন ঘটা, টিকা গ্রহণে দ্বিধা, টিকা নিয়ে অপপ্রচার, এক ডোজ টিকা না নিয়ে ২য় ডোজ না নেওয়া পুনরায় সংক্রমণের মূল কারণ।

বাংলাদেশে হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবের কারণ কী?

কোভিডের কারণে হামের টিকা প্রদানে বিঘ্ন ঘটা ও অন্য কিছু কারণে ২০২৩ সাল থেকে বিশ্বের অনেক দেশে হামের সংক্রমণ বেড়ে গেলেও, বাংলাদেশ ছিল ব্যতিক্রম। তবে, ২০২৬ সালের শুরুর থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হামের রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং কয়েকদিনে বিভিন্ন মিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী হাম প্রায় সব বিভাগেই ছড়িয়ে পড়েছে এবং পঞ্চাশের অধিক শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী হাম আক্রান্ত রোগীদের একটি বড় অংশ ছয় মাস বয়সী শিশু।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট প্রকাশিত ‘Expanded programme on Immunization (‎EPI)‎ factsheet 2024: Bangladesh’ শীর্ষক ফ্যাক্টশিটটি দেখলে বোঝা যায়, বাংলাদেশে ২০১৫ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত শিশুদের হাম ও রুবেলার জন্য প্রদত্ত এমআর টিকা গ্রহণের হাড় ছিল প্রায় ১০০ ভাগ।

কিন্তু, ২০২৪ সালে হাম ও রুবেলার জন্য দেওয়া এমআর টিকাদানের হার কমে যায় প্রায় শতভাগ থেকে কমে দাঁড়ায় ৮৬ দশমিক ৬ শতাংশে এবং ২০২৫ সালে এ হার অনেক কমে গিয়ে হয় ৫৯ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ, ২০২৫ সালে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়নি (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ৩১ মার্চ ২০২৬)।

দেশে নতুন করে দ্রুত হাম ছড়িয়ে পড়ার কারণ হিসেবে ২০২৫ সালে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শিশুকে হাম ও রুবেলা জন্য এমআর টিকা না দেওয়ার ফল হিসেবে জনস্বাস্থ্যবিদরা দায়ী করছেন।

হাম প্রতিরোধের উপায় কী?

হাম যেহেতু অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ, এটি প্রতিরোধের প্রধান এবং সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা। হাম প্রতিরোধে বাংলাদেশ, ভারতসহ অন্যান্য নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় এমআর টিকা ব্যবহার করা হয় যেটি হামের পাশাপাশি রুবেলা বা জার্মান হাম থেকে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু, উচ্চ আয়ের দেশসমূহে দেওয়া হয় এমএমআর টিকা যেটি হাম ও রুবেলার পাশাপাশি মাম্পস থেকেও সুরক্ষা দেয়।

এছাড়া কিছু দেশে এমএমআরভি (Measles–Mumps–Rubella–Varicella) টিকা ব্যবহার করা হয়, যা হাম, রুবেলা, মাম্পসের পাশাপাশি চিকেনপক্স থেকেও সুরক্ষা প্রদান করে।

এমআর বা এমএমআর বা এমএমআরভি টিকা সাধারণত দুই ডোজে দেওয়া হয় এবং প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা প্রদান করে। একটি জনগোষ্ঠীতে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষ টিকাপ্রাপ্ত হলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হয়, যা সে কমিউনিটিতে হামের বিস্তার রোধ করে।

শিশুদের নির্ধারিত বয়সে টিকা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে শিশুদের ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে বিনামূল্যে এক ডোজ এমআর টিকা নয় মাস বয়সে এবং ২য় ডোজ টিকা ১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয়। তবে, উন্নত দেশগুলোতে যেখানে MMR (Measles–Mumps–Rubella) টিকা ব্যবহৃত হয়, সেখানে সাধারণত প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ১২-১৫ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় ৪-৬ বছর বয়সে। তবে, বিশেষ পরিস্থিতিতে (যেমন ভ্রমণ বা আউটব্রেক পরিস্থিতি), ৬ মাস বয়সে একটি আগাম ডোজ দেওয়া যেতে পারে, যদিও এটি নিয়মিত ডোজ হিসেবে গণ্য হয় না।

প্রাপ্তবয়স্করা যদি আগে টিকা না নিয়ে থাকেন বা টিকার ইতিহাস অজানা থাকে, তাহলে ২ ডোজ MMR টিকা (কমপক্ষে ২৮ দিন ব্যবধানে) নিয়ে নিতে পারেন। দেশে ইনসেপ্টা ফার্মা Rubavex-M নামে যে ভ্যাকসিনটি তৈরি করে সেটির এক ডোজের দাম ৪০০ টাকা। প্রাপ্তবয়স্করা এ টিকা কিনে ব্যবহার করতে পারেন।

হাম শুধু শিশুদের রোগ নয়, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এই সংক্রমণ হতে পারে। বিশেষ করে যারা টিকা নেননি, অসম্পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত বা পূর্বে সংক্রমিত হননি তাদের মধ্যে হাম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে যে মোট হাম আক্রান্তদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রাপ্তবয়স্ক।

হাম যেহেতু খুব সংক্রামক তাই এটি ছড়িয়ে পড়া কমাতে হাম আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা অত্যন্ত জরুরি। কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা, মাস্ক ব্যবহার এবং ভিড় এড়িয়ে চলা সংক্রমণ কমাতে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

পুষ্টিকর খাবার, বিশেষ করে ভিটামিন-এ গ্রহণ, হাম প্রতিরোধ ও জটিলতা কমাতে সাহায্য করে।

হাম কী শুধু শিশুদের হয়?

হাম শুধু শিশুদের রোগ নয়, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এই সংক্রমণ হতে পারে। বিশেষ করে যারা টিকা নেননি, অসম্পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত বা পূর্বে সংক্রমিত হননি তাদের মধ্যে হাম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে যে মোট হাম আক্রান্তদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রাপ্তবয়স্ক।

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে হামের লক্ষণ সাধারণত বেশি তীব্র হয় এবং জটিলতার ঝুঁকিও বেশি থাকে। শিশুদের তুলনায় প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস এবং হেপাটাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। বিশেষ করে যাদের বয়স ৩০ বছরের বেশি, অপুষ্টি রয়েছে, গর্ভবতী নারী অথবা যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল (যেমন HIV সংক্রমিত ব্যক্তি) তাদের জটিলতা বেশি দেখা দেয়। তাই, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও হাম প্রতিরোধে টিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হাম হলে করণীয় কী?

হামের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই, তাই চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা, জটিলতা প্রতিরোধ এবং সংক্রমণ ছড়ানো বন্ধ করা।

হাম রোগীকে বিশ্রামে রাখতে হবে এবং অন্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে, কারণ এটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। রোগীর পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি, মুখে খাওয়ার স্যালাইন বা তরল খাবার গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে যাতে ডিহাইড্রেশন না হয়। এ সময় শিশুর সর্দি, কাশি জ্বর না হলে স্কুলে পাঠানো উত্তম।

হামজনিত জ্বর ও ব্যথা কমানোর জন্য প্যারাসিটামল ব্যবহার করা নিরাপদ। কোনোভাবেই অ্যাসপিরিন ব্যবহার করা যাবে না। চোখ লাল বা সংবেদনশীল হলে আলো থেকে দূরে রাখতে হবে এবং চোখ পরিষ্কার রাখতে হবে। রোগীকে পুষ্টিকর খাদ্য দিতে হবে এবং বিশেষ করে শিশুদের ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টেশন দিতে হবে, কারণ এটি হামজনিত অন্ধ হওয়া থেকে শিশুকে রক্ষা করে।

রোগীর শ্বাসকষ্ট ও খিঁচুনি হলে, রোগী অচেতন হয়ে পড়লে এবং তীব্র ডায়রিয়া দেখা দিলে বা উচ্চ জ্বর দীর্ঘস্থায়ী হলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। নিউমোনিয়া বা ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ হলে চিকিৎসকরা অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করে থাকেন। সুরক্ষার জন্য পরিবারের কেউ হাম আক্রান্ত হলে পরিবারের অন্য সদস্যরা যারা পূর্বে টিকা নেননি তারা দ্রুত টিকা নিয়ে নিতে পারেন।

পরিশেষে

সরকার ও জনস্বাস্থ্যবিদরা দেশের সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে হাম দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে কারণ, ২০২৫ সালে প্রায় ৪০ ভাগ শিশু হামের টিকা পায়নি। এই ৪০ ভাগ শিশুই এখন হাম হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। দেশে শিশুদের জন্য আইসিইউ সংকট প্রকট। তাই, হামজনিত নিউমোনিয়া বা এনসেফালাইটিস দেখা দিলে শিশুর জীবন বিপন্ন হতে পারে।

তাছাড়া, দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে নয় মাসের কম বয়সী শিশুদেরও হাম শনাক্ত হচ্ছে, যেটি খুব উদ্বেগজনক। তাই, সরকার এ বিশেষ পরিস্থিতিতে ছয় মাস বয়সী শিশুদের ১ম ডোজ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মনে রাখতে হবে, যেহেতু ছয় মাস বয়সে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পূর্ণ হয় না, তাই এ ডোজটি নিয়মিত ডোজ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

সরকার থেকে বলা হয়েছে, ৫ এপ্রিল থেকে জরুরি ভিত্তিতে দেশব্যাপী ছয় মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের হামের টিকা দেওয়া শুরু হবে। সরকারের ত্বরিত পদক্ষেপে জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এখন নিশ্চিত করা জরুরি যাতে একটি শিশুও হাম ও রুবেলার টিকা এমআর টিকা ও ইপিআই প্রোগ্রামের অন্য কোন টিকা থেকে বঞ্চিত না হয়।

ভবিষ্যতে যাতে ইপিআই প্রোগ্রামের টিকা কিনতে ও প্রদানে বিলম্ব না হয় সংশ্লিষ্ট মহলকে সে বিষয়েও সজাগ থাকতে হবে। কারণ, প্রতিটি শিশুর জীবন খুব গুরুত্বপূর্ণ। কোন শিশু যাতে আর কারো অবহেলার বলি না হয়।   

ড. মো. আজিজুর রহমান : অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ajijur.rubd@gmail.com