জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন

Manosh Chowdhury

১২ জানুয়ারি ২০২২, ০৩:১০ পিএম


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন

ছবি : সংগৃহীত

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ইদানীং প্রায় ভুলতেই বসেছি। মানে দিনটা আসার আগে, কিংবা আয়োজনের তোড়জোড় না দেখলে মনে পড়ে না। আর দিনটা সাধারণত সাধারণ ক্লাসের ছুটি থাকে। ঠিক ঘোষিত ছুটি কি না মনে পড়ছে না। তবে বাস্তবে উৎসবের জন্য ছুটি হিসেবেই ব্যবহৃত হয়।

স্বীকার করি, মনে পড়ার পরই আমি দিনটা ক্যাম্পাস কামাই দিয়ে থাকি। তবে আমি যে চিরকালই বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের উৎসব এড়িয়ে চলেছি তা নয়। চাকরি পাওয়ার পরের বছরের দিবসটা আমার মনেই পড়ে। ১৯৯৬ সালের কথা। আগের তিন বছর ‘মহৎ’ এই পেশায় ঢুকতে না পারার ব্যথা বেদনাতেই হোক, এই চাকরিতে ঢুকতে পারার উত্তেজনাতেই হোক, আর যাই হোক, আমি কিন্তু ঠিকই জামা-জুতা পরে বেশ গেছি।

আমার মনে পড়ে, আমার চাকরি উপলক্ষেই আগের শীতে, ১৯৯৫-এর শেষের দিকে মায়ের উপহার হিসেবে তার দেওয়া টাকা দিয়ে একখানা কলাপাতা (বা মতান্তরে পেস্ট) রঙের ব্লেজার কিনেছিলাম। এটা ছিল মা-বাবার সাথে ফয়সালা যে আমি একটা বনেদি ধরনের পোশাক পরব। আমার বন্ধুর সাথে কথাবার্তা বলে রেখেছিলাম যে, কয়েকদিন এই বস্তুটা আমি পরব এবং তারপর সে ওটা উপহার হিসেবে নেবে।

ওই ব্লেজারটা গায়ে চাপিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে গিয়েছিলাম। কেন্দ্রীয় মাঠের পাশে যে বহু পুরাতন তেঁতুলগাছটা আছে সেটার নিচে ওই ব্লেজারের উপরে উৎসবের একটা ঢোল নিয়ে শিক্ষার্থী-অভ্যাগতদের চমৎকৃত করারও চেষ্টা করেছিলাম। ছবি সংগ্রহে রাখা নেই, যে প্রমাণ দেব। তবে এটার প্রিন্টেড ছবি দেখেছিলাম। মোবাইলে যে কেউ দেখাননি ওই ১৯৯৬ সালে তা এমনকি মনে করে বলারও দরকার নেই। তবে এটাও অস্বীকার করব না যে, বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের অনুষ্ঠানে গেলেও শোভাযাত্রায় হাঁটার সময় আমার নিজেকে বোকা বোকা লাগছিল। আসলে নির্বাক শোভাযাত্রাতে আমার বোকা বোকাই লাগে।

ন্যূনতম কোনো শ্লোগান না থাকলে এই বোকা বোকা ভাব আমার বাড়তে থাকে। যতই হাঁটতে থাকি, ততই বাড়তে থাকে। আর মাথায় কার্ডবোর্ডের যে তাজখানা পরানো হয়ে থাকে সেটা মাথায় চাপানো ভয়াবহ অত্যাচারের মতো লাগে। দর্শকদের কেমন লাগে তারাই জানেন। কিন্তু আমি এই বস্তু মাথায় দর্শিত হচ্ছি, সেই অনুভূতির মতো হেনস্তার তুলনা নাই কোনো। সেদিনের ওই কাগজের মুকুটখানাও আস্তে করে হাতে নিয়ে ভাঁজ করে ব্লেজার বা কিছু একটার পকেটে চালান করে দিয়েছিলাম।

চাকরি পাওয়ার পরের বছরের দিবসটা আমার মনেই পড়ে। ১৯৯৬ সালের কথা। আগের তিন বছর ‘মহৎ’ এই পেশায় ঢুকতে না পারার ব্যথা বেদনাতেই হোক, এই চাকরিতে ঢুকতে পারার উত্তেজনাতেই হোক, আর যাই হোক, আমি কিন্তু ঠিকই জামা-জুতা পরে বেশ গেছি।

বিষয়টা যে কেবল বিশ্ববিদ্যালয় দিবস নিয়ে তা নয়। সাধারণভাবেই যেকোনো উৎসব দিবস নিয়েই আমার এই অশান্তি আছে। সমস্যাটা অন্যত্র। উৎসবমুখর হওয়ার জন্য যতখানি সদলবলে থাকার মানসিক প্রস্তুতি থাকা দরকার, তা সম্ভবত আমি শৈশবের পরই একদম হারিয়ে ফেলি। তাছাড়া দিবস যখন প্রতিষ্ঠানের থেকেও অতিকায় হয়ে যায় তখন আসলেই বিপদের ব্যাপার বলেই ভাবি আমি। তা সে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান হোক, আর রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠান।

জাহাঙ্গীরনগরের কথাই ভাবুন না! দর্শন বিচারেই বা কী পাই আমরা! মূল তোরণখানা, বহুদিন তোরণ ছিল না যেমন, বহুদিন ধরেই তোরণ আছে তাও ঠিক। একখান গোলাপি দরজা। তার সামনে গাঁদা ফুল না হলেও কাছাকাছি ধরনেরই ফুল, স্টিলের কাঁচা অক্ষরে প্রতিষ্ঠানের নাম। পাশে গোলাপি একখানা মসজিদ। তারও পাশে বিগত দুজন সাবেক খ্যাতিমান শিক্ষকের সমাধি আছে। এখানে তোরণ ছাড়া আর কিছু নিয়েই ভক্তি ছাড়া আর কিছু বিরাজ করা ঠিক হবে না। তোরণই আলাপে থাকুক।

আমি ভিক্টোরীয় স্থাপত্যের গুরুতর কোনো ভক্ত নই। স্টিল-কাচের, মডার্ন-পোস্ট মডার্ন স্থাপত্যেরও গুরুতর ভক্ত নই। হয়তো স্থাপত্যরস আমার মাথায় কম। কিন্তু সত্যি বললে প্রতিষ্ঠানের তোরণে গভীরতা-গাম্ভীর্যের (যাই মানে হোক) পক্ষে আমি। বা অন্তত চোখের দেখাতে আরাম লাগার। সেই আরাম এই গেইট নিশ্চিত করে বলে আমার মনে হয়নি কখনো। আপনাদের চোখে দৃষ্টিনন্দন লাগলে আমার পক্ষে মাফ চাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

কয়েক কদম হাঁটলেই বাম হাতে মাজহারুল ইসলামের ডিজাইনে করা ক্যাফেটেরিয়া আর মুক্তমঞ্চ। আর ডান হাতে জুতার বাক্সের মতো দেখতে সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ফটক। এই জুতার বাক্সটি তৈরি মোটামুটি শেষ হয়েছিল ১৯৮৯ সালে, মনে আছে। বলাই বাহুল্য মাজহারুল সাহেব এই বস্তুটির তত্ত্বাবধান করেননি। বাম ও ডান হাতের মধ্যভাগে রাস্তার পাশে আছে ‘ভাষা অমরতা’ ভাস্কর্য।

এরকম ভাস্কর্য আগামী দিনের তরুণ-তরুণীর সামনে যারা পেশ করতে পারেন তাদের শরীরে দয়ামায়া আছে বলে বিবেচনা করা কঠিন। সত্যি কথা হলো, সমাজবিজ্ঞান (আমি সামাজিক বিজ্ঞানই বলি) অনুষদের স্থাপত্যের বেদনা দীর্ঘকাল আমি বহন করেছিলাম।

প্রথমে ছাত্র হিসেবে, পরে বেকার হিসেবে, তারপর মাস্টার হিসেবে। তবে জাহাঙ্গীরনগরের পরের স্থাপত্যগুলো নিজগুণে আমাকে এই বেদনা থেকে মুক্তি দিয়েছে। কোনো কোনো ভবন পরিকল্পনা দেখলে মনে হয় ওটা বরং মাস্টার ক্লাস। নন্দনবোধ চিরকালই তুল্য বিচারে অনুভূত হয়।

তবে প্রশাসন সবচেয়ে সৃজনশীল গভর্ন্যান্স নির্ভর স্থাপত্য বোধের পরিচয় দিয়েছেন নারীদের হল বানানোর ক্ষেত্রে। একটার ঘাড়ে আরেকটা হল বানানোর একমাত্র ব্যাখ্যা হতে পারে যাতে একটা মিনার থেকেই সকল নারীদের উপর পাহারাদারি করা হয়। আর কোনো ব্যাখ্যা থাকলে নিশ্চয়ই সেসব আমরা শুনব। তবে অতিসম্প্রতি ভবন-পরিকল্পনার থেকে অনেক বেশি শয়ে শয়ে কোটি টাকার কথা বেশি শোনা যায়। বোঝাই যাচ্ছে, বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় বস্তুপিণ্ডের চরিত্র থেকে মুদ্রামানের গুরুত্ব অনেক বেশি।

...প্রচুর কাঁঠাল গাছ ছিল, বৃদ্ধ হয়ে গেছে, কুৎসিত হয়ে গেছে, কাটা পড়ে গেছে। আর ছিল দারুণ এক ঘন শালবেষ্টনী। আরিচা মহাসড়কের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমিনের সীমানা ঘেঁষে। সেই শালবেষ্টনীর অপরূপ রূপ। পড়ন্ত বিকেলে যখন সেগুলোর ফুলের ওপর সূর্যালোক পড়ত, মনে হতো তামাটে সোনা দিয়ে বানানো ঋজু বৃক্ষরাজির মাথার মুকুট।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তুচ্ছ কয় টাকার ঘুষাঘুষির আওয়াজ ওঠার পর থেকে স্থাপত্য বিষয়ক আলাপ বোধহয় চিরতরেই জাহাঙ্গীরনগর থেকে বিদায় নিল। মিথ্যা হোক বা সত্য, গোয়েন্দারা এই খবরটা প্রকাশ করে জাহাঙ্গীরনগরের উপকার করেননি, অন্তত ওই কয়টা মাত্র টাকার জন্য।

জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীদের ভেতর সংহতি বোধ নিয়ে উচ্ছ্বাস আর তামাশা দুই-ই জাগরূক। চলতি ভাষায় ‘জাবিয়ান’ শব্দটি দিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান-সাবেক শিক্ষার্থীদের দলকে বোঝানো হয়ে থাকে। ‘জাবিয়ান’দের মধ্যকার অটুট বন্ধন নিয়ে যেমন এই মানুষগুলোর আগ্রহ আছে, তেমনি তাদের এই আগ্রহকে বাইরের অনেকেই আদিখ্যেতা হিসেবে দেখে থাকেন।

আমি দুই অনুভূতিরই মেরিট দেখতে পাই। আর কোনোটাই উৎকটভাবে আমার নাই। তবে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের মানুষজন, বিশেষত সাবেকগণ একত্রিত হলে অন্য-পরিচয়ের মানুষজন যথেষ্ট পরিসর পাচ্ছেন কি না এটা সাধারণ সৌজন্যের মধ্যেই পড়ে। কেবল জাহাঙ্গীরনগরের সাবেকরাই দায়ী হয়তো নন।

মহানগরের এত কাছে একটা আধুনিককালের ‘রিসোর্ট’ মার্কা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বাইরের ও ভেতরের মানুষজনের বিপুল উদ্দীপনার ন্যায্য কারণ আছে। এটা পুরোটা বুঝতে মহানগর হিসেবে ঢাকার যে প্রশাসনিক পরিকল্পনা তার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এই যে বাগান না থাকা, পার্ক না থাকা, ভ্রমণ করার জায়গা না থাকা এগুলো গুরুতর বিষয়।

এমনকি জাহাঙ্গীরনগরের আশপাশে যে এলাকাগুলো ‘রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ’ করা হয়েছে, তার মধ্যে গবাদিপশুর জন্য কিছু এলাকা বাদ দিলে প্রায় পুরোটাই সামরিক এলাকা, এমন এক এলাকা যা নিয়ে সিভিলদের আলাপ না করাই উত্তম। তাছাড়া দর্শনার্থীরা তো আর মুখ্যত রাতে ঘুমাতে যাচ্ছেন না ক্যাম্পাসে যে স্থাপত্যের গুণ বুঝবেন। তাদের জন্য চোখের বৃক্ষ-আরামই যথেষ্ট।

ক্যাম্পাসে অনেক শিক্ষার্থী সংগঠন ছিল। সাংস্কৃতিক তো বটেই, তথাকথিত রাজনৈতিকও। হোক অল্প লোকজন, তাও অনেক সংগঠন। বামপন্থী সংগঠনই ছিল কমবেশি ১২-১৪টা, যখন আমি ওখানকার ছাত্র।

তবে সত্যিই যখন কোনো মেহমান রাতে ঘুমাতে চান, খুবই লজ্জায় পড়ে যাই। তেমন কোনো রহস্যজনক কারণ নয় যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কখনোই এখানে একটা ঠিকঠাক মতো মেহমানখানা বানাতে চাননি। পুরান যে ব্যাচেলর-কোয়ার্টার আছে সেটাও ভেঙে-না-পড়া পর্যন্ত সম্ভবত হাত লাগানো হবে না। তবে হ্যাঁ, এ দফা ১৪০০ কোটি টাকার আইটেমে এগুলো আছে কি না আমার জানা নেই।

মানুষের স্মৃতি খুবই প্রতারণামূলক। আর সেসব কারণেই সহজে মিথ বা প্রোপাগান্ডা চালু হয় বোধহয়। কিংবা রাজনীতি। মানে কোনটা যে কারণ আর কোনটা ফলাফল তা আউলে যেতে পারে। যে বৃক্ষকুলের জন্য, সবুজের জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিখ্যাত, নগরাত্মার প্রাণ আঁইঢাঁই করে সেগুলো আদি ও অনন্তকালের নয়। গাছ ছিলই। কিন্তু বর্ষার পানি লাল মাটিতে পড়লে, মাত্র ৩০-৩২ বছর আগেই, এমন আঠালো কাদা জুতার নিচে জমত যে শিক্ষক বা সহপাঠী কেউই ক্লাসে মনোযোগ না দিয়ে আপনার জুতার নিচের ওই বিচিত্রবর্ণ আঠালো তলার দিকে তাকিয়ে ক্লাস শেষ করে দিতেন।

প্রচুর কাঁঠাল গাছ ছিল, বৃদ্ধ হয়ে গেছে, কুৎসিত হয়ে গেছে, কাটা পড়ে গেছে। আর ছিল দারুণ এক ঘন শালবেষ্টনী। আরিচা মহাসড়কের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমিনের সীমানা ঘেঁষে। সেই শালবেষ্টনীর অপরূপ রূপ। পড়ন্ত বিকেলে যখন সেগুলোর ফুলের ওপর সূর্যালোক পড়ত, মনে হতো তামাটে সোনা দিয়ে বানানো ঋজু বৃক্ষরাজির মাথার মুকুট।

সেই গাছগুলো এমনভাবে কাটা হলো যে টের পাওয়ার জন্য প্রায় কুড়ি বছর রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। ধীরে ধীরে, আস্তে আস্তে, মাথায় টাক পড়ার মতো করে গাছের বেষ্টনী শেষ হলো। এই গাছগুলো কাটার প্রধান কৃতিত্ব বনবিভাগের, সড়ক বিভাগের, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের, নাকি ক্যাম্পাসের গুণ্ডাদের তা নিয়ে বিশেষ গবেষণা কখনোই করা হয়নি। তবে লজিকটা সকলেই সহজে বুঝবেন—নিরাপত্তা আর সড়ক ব্যাপ্তি।

মনে পড়ল, ক্যাম্পাসে অনেক শিক্ষার্থী সংগঠন ছিল। সাংস্কৃতিক তো বটেই, তথাকথিত রাজনৈতিকও। হোক অল্প লোকজন, তাও অনেক সংগঠন। বামপন্থী সংগঠনই ছিল কমবেশি ১২-১৪টা, যখন আমি ওখানকার ছাত্র। কোনো সংগঠনে হয়তো ১০-১২ জন, কিন্তু হয়তো দারুণ এক সংগঠক ছিলেন। হয়তো দারুণ বক্তা, দারুণ শান্ত এক নেতা! পাশে অন্য সংগঠনের বা অসংগঠনের যে বালক হাঁটছে তা নিয়ে গুরুতর কোনো উত্তেজনা নেই। থাকলেও আমার বেলায় আমি তা টের পাইনি। কী যেন এক পরিতোষের মধ্যে পাশাপাশি হাঁটছি—মামুন ভাই, বোরহান ভাই, লিপি আপা কিংবা দোলা আপার সঙ্গে। ওই সংগঠনগুলোর সবগুলোর নামও আজ সবাই বলতে পারবে না। কোনো দিবসেই না।

মানস চৌধুরী ।। অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Link copied