এনসিপিকে চট্টগ্রাম-৮ আসন ছেড়ে দেওয়ার খবরে জামায়াতে ক্ষোভ

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও–বোয়ালখালী আংশিক) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. আবু নাসেরকে সরিয়ে জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা জোবাইরুল আরিফকে আসন ছেড়ে দেওয়ার গুঞ্জন উঠেছে। এতে করে জামায়াতের তৃণমূল পর্যায়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মাঠে সক্রিয়ভাবে কাজ করা, গণসংযোগ ও সেবামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে এলাকায় শক্ত অবস্থান তৈরি করা একজন প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার সম্ভাব্য সিদ্ধান্তে নেতাকর্মীরা হতাশা ও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
জামায়াতের নেতাকর্মীরা বলছেন, ডা. আবু নাসের প্রায় তিন দশক ধরে চান্দগাঁও ও বোয়ালখালী এলাকার মানুষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি সামাজিক, ধর্মীয় ও মানবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে একটি শক্ত সামাজিক ভিত্তি গড়ে তুলেছেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার অনেক আগেই তিনি নিয়মিত উঠান বৈঠক, গণসংযোগ, মেডিকেল ক্যাম্প ও সহায়তামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছাচ্ছেন। ফলে এই আসনে প্রার্থীদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি মাঠে কাজ করা ও পরিচিত মুখ বলে দাবি তৃণমূলের।
প্রায় এক বছর আগে দলীয় মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই ডা. আবু নাসের গণসংযোগে গতি বাড়ান। উঠান বৈঠক, সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা ও নিয়মিত গণসংযোগের পাশাপাশি তিনি বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, মেডিকেল ক্যাম্প এবং ওষুধ বিতরণের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছাচ্ছেন। গত ১২ রবিউল আউয়াল ঈদে মিলাদুন্নবি (সা.) উপলক্ষ্যে আয়োজিত জশনে জুলুসে ডা. আবু নাসেরের উদ্যোগ বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।
ডা. আবু নাসের বলেন, আমি সব সময় এলাকার মানুষের বিপদে-আপদে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। রাজনীতি আমার কাছে ক্ষমতার বিষয় নয়, এটি মানুষের সেবা করার একটি মাধ্যম। বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। জনগণ যদি আমাকে নির্বাচিত করেন, তাহলে এই এলাকার মানুষের কল্যাণে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করব।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জামায়াত ও এনসিপির জোট সমঝোতার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম-৮ আসনটি এনসিপিকে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে— এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই চান্দগাঁও ও বোয়ালখালী এলাকায় জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, মাঠের বাস্তবতা বিবেচনা না করে সিদ্ধান্ত নিলে জোট রাজনীতির পাশাপাশি জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে।
চান্দগাঁও থানা জামায়াতের সেক্রেটারি জসিম উদ্দীন সরকার বলেন, এনসিপি কাকে মনোনয়ন দেবে, সেটা তাদের দলীয় বিষয়। কিন্তু সেই প্রস্তাব যখন জোটে এসেছে, তখন জোটের পক্ষ থেকে সরজমিনে মাঠ পরিদর্শন করা হয়নি, কোনো জরিপ চালানো হয়নি। প্রার্থী বা মহানগর পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারাও হয়তো জানেন না। এখানে যদি জোবাইরুল আরিফের গ্রাউন্ড পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা সচেতন থাকতেন, তাহলে এমন সিদ্ধান্ত নিতেন না।
তিনি আরও বলেন, এই আসনের ১৮৭টি ভোট কেন্দ্রের কয়টিতে এনসিপি প্রার্থীর প্রস্তুতি আছে— এটা বড় প্রশ্ন। শুধু একটা সিট পেয়ে গেলাম, তাই নিয়ে নিলাম— এমন চিন্তাধারা থেকে তারা হয়ত আসনটি চাইছে। মহানগরের নেতাদের সঙ্গে তার সম্পর্কও ভালো নয়। বাইরে থেকে বন্ধু-বান্ধব এনে কিছু এলাকায় গণসংযোগ করলেই নির্বাচন করা যায় না। মহানগরীর পাঁচটি ওয়ার্ডের কয়টি ভোট কেন্দ্র তার পরিচিত, কয়টিতে কমিটি আছে— এসব বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই।
বোয়ালখালী উপজেলা জামায়াতের আমির ডা. মো. খোরশেদ বলেন, দায়িত্বশীল হিসেবে বোয়ালখালীর মানুষের নাড়িনক্ষত্র আমি বুঝি। এই আসনে মানুষ শুধু দলীয় প্রতীক দেখে ভোট দেবে না। এখানে ডা. আবু নাসেরের ভোট তার নিজস্ব অবদান ও দীর্ঘদিনের সেবামূলক কাজের ফল। তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান— সবাইকে ইনসাফভিত্তিক সেবা দিয়ে গেছেন। তার সহায়তামূলক কার্যক্রম কোনো ধর্মে সীমাবদ্ধ ছিল না। এই ইমেজের কারণে তিনি বিপুল ভোট পাওয়ার সক্ষমতা রাখেন।
জামায়াতের কর্মী নাহিন অভিযোগ করে বলেন, জোবাইরুল আরিফ কয়েকদিন আগে আমাদের প্রার্থীর বিরুদ্ধে মিডিয়ায় আপত্তিকর মন্তব্য করেছে, এতে আমাদের কর্মীরা ক্ষুব্ধ। এখন পর্যন্ত তার কোনো প্রচারণায় আমাদের নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য বা সমন্বয় দেখিনি। জোটের প্রার্থী হয়ে যদি সে এখানে নির্বাচন করে, তাহলে বোয়ালখালীতে আমাদের নেতাকর্মীরা মাঠে নামবেন না। এতে তৃণমূল জামায়াতের ভবিষ্যৎ রাজনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এদিকে আসন সমঝোতা নিয়ে সোমবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির নজরুল ইসলাম। এতে তিনি লেখেন, দশ দলীয় সমঝোতা : সর্বশেষ মাঠ জরিপের ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাই চূড়ান্ত করতে না পারলে শহীদদের স্বপ্ন তথা ফ্যাসিবাদমুক্ত বৈষম্যহীন কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্য পূরণে বেগ পেতে হবে।
এমআর/এমজে