তারেক রহমানের সমাবেশ : প্রস্তুত পলোগ্রাউন্ড, তিন স্তরের নিরাপত্তা

চট্টগ্রাম নগরীর ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড মাঠে রোববার (২৫ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মহাসমাবেশ। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর দলের প্রধান হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম চট্টগ্রাম সফরকে কেন্দ্র করে বন্দরনগরীতে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক উত্তাপ, উৎসবমুখর পরিবেশ ও ব্যাপক প্রত্যাশা। নগরীর প্রধান সড়ক, মোড় ও অলিগলিতে ব্যানার–ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে এলাকা। দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে বাড়তি আগ্রহ ও উদ্দীপনা।
এদিকে, মহাসমাবেশ উপলক্ষ্যে কয়েকদিন ধরে পলোগ্রাউন্ড মাঠে চলছে প্রস্তুতি। মাঠের পশ্চিম পাশে প্রায় দুই হাজারের বেশি বাঁশের খুঁটি ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছে ১০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৬০ ফুট প্রস্থের একটি বিশাল মঞ্চ। আয়োজকদের দাবি, এই মঞ্চে একসঙ্গে প্রায় দেড় হাজার মানুষ বসতে পারবেন। মঞ্চের সামনে রাখা হচ্ছে আরও পাঁচ হাজারের বেশি চেয়ার।
মাঠ ও আশপাশের এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে দুই শতাধিক মাইক ও ১০টি শক্তিশালী সাউন্ডবক্স। পলোগ্রাউন্ড মাঠ থেকে কদমতলী ও টাইগারপাস পর্যন্ত এলাকায় ব্যবহৃত হবে প্রায় ২০০টি মাইক। শনিবার সরেজমিনে দেখা যায়, মাঠ সমতল করা হয়েছে, চারপাশে বসানো হয়েছে নিরাপত্তা ব্যারিকেড। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের গাড়ি দিয়ে মাঠে পানি ছিটানো হয়। একের পর এক গাড়িতে করে মাঠে প্রবেশ করছেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
মহাসমাবেশ উপলক্ষ্যে চট্টগ্রাম নগরী রাখা হয়েছে কঠোর নিরাপত্তার আওতায়। প্রায় দুই হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। মঞ্চসহ পুরো এলাকাকে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ভাগ করা হয়েছে—রেড জোন, ইয়েলো জোন ও গ্রিন জোন। মঞ্চকে রেড জোন ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে কেবল বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা, স্থায়ী কমিটির সদস্যরা এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের ২৩টি আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থীরা অবস্থান করতে পারবেন। মঞ্চের সামনের অংশ ইয়েলো জোন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে সাংবাদিক ও নারীদের জন্য আলাদা ব্লক থাকবে। পুরো মাঠকে রাখা হয়েছে গ্রিন জোন হিসেবে।

পোশাকধারী ও সাদাপোশাক পুলিশের পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছেন বিএনপির নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী সিএসএফ (চেয়ারম্যান সিকিউরিটি ফোর্স)। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও নিরাপত্তা ইস্যুতে কাজ করছে। এর আগে সিএমপির ডগ স্কোয়াড ইউনিট প্রশিক্ষিত পাঁচটি বিদেশি কুকুর দিয়ে মঞ্চসহ আশপাশের পুরো এলাকা তল্লাশি চালায়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সহকারী কমিশনার আমিনুর রশিদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ৩ স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। পোশাকধারীর পাশাপাশি সাদা পোশাকেও পুলিশ মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি র্যাব, সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থা নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, শনিবার রাতে তারেক রহমান বিমানযোগে চট্টগ্রামে পৌঁছে পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুতে অবস্থান করবেন। রোববার সকাল সাড়ে ৯টায় তিনি তরুণদের সঙ্গে একটি পলিসি ডায়ালগে অংশ নেবেন। এরপর বেলা সাড়ে ১১টায় পলোগ্রাউন্ড মাঠের মহাসমাবেশে যোগ দেবেন। চট্টগ্রাম সফর শেষে ফেনী, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জে একাধিক পথসভায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে শনিবার দুপুরে মহাসমাবেশের প্রস্তুতি কার্যক্রম তদারকির অংশ হিসেবে পলোগ্রাউন্ড মাঠ পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি মাঠের সার্বিক অবস্থা, মঞ্চ স্থাপন, প্রবেশ ও বহির্গমন পথ, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি ঘুরে দেখেন এবং সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।
পরিদর্শনকালে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে মহাসমাবেশ আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। তিনি চট্টগ্রামবাসীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাবেশে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। তারেক রহমানের নেতৃত্বে জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার কথাও বলেন তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এই সমাবেশ কোনো দলীয় গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ হবে। তিনি বলেন, এটি একটি ভিন্নধর্মী জনসমাবেশ, যেখানে শুধু বিএনপির নেতাকর্মী নয়, সাধারণ মানুষও অংশ নেবেন। চট্টগ্রামের মানুষ বরাবরই গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং এবারের সমাবেশেও সেই চিত্র ফুটে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
চট্টগ্রামের মানুষের প্রত্যাশা ও আশার প্রতীক হয়ে তারেক রহমান আসছেন বলেন মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম-১০ আসনের ধানের শীষ প্রতীকের সংসদ সদস্য প্রার্থী সাঈদ আল নোমান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার বঞ্চিত মানুষ আজ নতুন আশায় বুক বেঁধেছে। সেই আশার নাম তারেক রহমান, সেই আশার প্রতীক ধানের শীষ। চট্টগ্রামের তারেক রহমানের মহাসমাবেশ সেটিই প্রমাণ করবে।
সাঈদ আল নোমান বলেন, চট্টগ্রাম সব সময় গণতন্ত্রের পক্ষে, ভোটের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই নগরের মানুষ কখনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেনি। আজ আবারও চট্টগ্রাম জেগে উঠেছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রত্যয়ে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি জনগণের সেই হারানো অধিকার ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত।
মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে বিধিনিষেধ উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে সিএমপি। এতে উল্লেখ করা হয়েছে জনশৃঙ্খলা, শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে আগামী ২৪ ও ২৫ জানুয়ারি মহানগর এলাকায় অস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য, ইট-পাথর বহন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একইসঙ্গে অননুমোদিত ড্রোন উড্ডয়ন এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবিরোধী কোনো বস্তু প্রদর্শন বা প্ল্যাকার্ড বহনেও নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে।
সিএমপি জানিয়েছে, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর ২৯ ধারার ক্ষমতাবলে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে। আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এমআর/জেডএস