চট্টগ্রাম-৮ আসনে উন্মুক্ত নির্বাচনের দাবি শহীদ ওমরের মায়ের

চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসন নিয়ে অস্থিরতার মধ্যে এবার আসনটিতে উন্মুক্ত নির্বাচন চেয়েছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ওমর ফারুকের মা রুবি আক্তার। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ১০ দিনব্যাপী নির্বাচন ক্যাম্পেইনের প্রথম দিনে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার কাছে এই দাবি জানান।
গত ২০ জানুয়ারি ১০ দলীয় জোটের আসন বণ্টনের ঘোষণা দেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। ওই ঘোষণায় চট্টগ্রাম-৮ আসনে জোটের প্রার্থী হিসেবে এনসিপির জুবাইরুল হাসান আরিফকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এরপর থেকেই আসনটি নিয়ে শুরু হয় নাটকীয়তা।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল ২০ জানুয়ারি। জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চূড়ান্ত প্রার্থী ছাড়া অন্য সব প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহার করার কথা ছিল।
তবে মনোনয়ন বাছাইয়ে ১০ দলীয় জোটভুক্ত তিন দলের প্রার্থী– জামায়াতে ইসলামীর ডা. আবু নাছের, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ এবং এনসিপির জুবাইরুল হাসান আরিফের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। পরে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করলেও জামায়াতের প্রার্থী ডা. আবু নাছের তা প্রত্যাহার না করায় নগরের একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করেন এনসিপির প্রার্থী জুবাইরুল হাসান আরিফ। সেখানে জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তোলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরিফ বলেন, ১০ দলীয় ঐক্যের লক্ষ্য জুলাইয়ের অর্জন বাস্তবায়ন। জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সবাই প্রার্থী দেবে, তবে চূড়ান্ত প্রার্থী ছাড়া অন্যরা মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন। কিন্তু এই আসনে অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে।
তবে পরে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিষয়টি ভুল বোঝাবুঝি। জামায়াতের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং তারা জানিয়েছেন, ডা. আবু নাছের চট্টগ্রামে না থাকায় সময়মতো মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে পারেননি।
২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের দিনে নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী ডা. আবু নাছের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক পান। ওইদিন বিকেলে জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। নগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মোরশেদুল ইসলাম চৌধুরী জানান, জোটের ঐক্যের স্বার্থে এনসিপি প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে আবু নাছের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে এর পরদিন থেকেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। আবু নাছেরের সমর্থকদের একটি অংশ এনসিপির প্রার্থীকে বয়কট করে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে প্রচারণায় নামেন। প্রতিদিন মিছিল ও স্লোগানের মাধ্যমে তারা মাঠে সক্রিয় থাকেন।
স্থানীয়দের মতে, তফসিল ঘোষণার আগে এনসিপির প্রার্থীর তেমন তৎপরতা দেখা না গেলেও জামায়াতের প্রার্থী ডা. আবু নাছের দীর্ঘদিন ধরে বোয়ালখালী-চান্দগাঁও এলাকায় কাজ করে আসছিলেন। মানবিক চিকিৎসক হিসেবে তিনি এলাকায় পরিচিত মুখ। ফলে শেষ মুহূর্তে নতুন প্রার্থী দেওয়ায় ভোটের সমীকরণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ২৫ জানুয়ারি এনসিপি জামায়াতের বিরুদ্ধে জোটের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন ও শরিক দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তোলে। দলটির দাবি, ১১ দলীয় ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’ জোটের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে জামায়াত প্রার্থী মাঠে অনড় থাকায় এবং এনসিপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে বয়কট স্লোগান দেওয়ায় রাজনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘিত হয়েছে।
যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জামায়াতের নগর সহকারী সেক্রেটারি মোরশেদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন এবং জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো কার্যক্রম চালাচ্ছেন না।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) চট্টগ্রামে নির্বাচনী সফরে আসেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি বোয়ালখালীর ফুলতলায় আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য দেন তিনি।
এসময় সেখানে উপস্থিত হন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ওমর ফারুকের মা রুবি আক্তার। তার উপস্থিতিতে জনতার ভিড় জমে যায়। শান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, এই আসনে স্থানীয় মানুষের ভোটই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় মানুষ স্থানীয় প্রার্থীকেই ভোট দিতে চায়।
তিনি বলেন, ডা. আবু নাছের কখনো জুলাইকে বিক্রি করেননি, কোনো সুবিধাও নেননি। তার পরিবার সবসময় মানুষের পাশে ছিল। এই আসন খালি হয়ে গেলে বড় ক্ষতি হবে।
রুবি আক্তারের বক্তব্যের জবাবে এনসিপির প্রার্থী জুবাইরুল হাসান আরিফ বলেন, ১০ দলীয় জোট ঐক্যবদ্ধ থাকলে আসন হাতছাড়া হবে না। তবে রুবি আক্তার পাল্টা বলেন, জোটের ভোট ২০ শতাংশ, স্থানীয় ভোট ৮০ শতাংশ। যাকে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে, তাকে এলাকার মানুষ চেনে না।
এমআর/এসএসএইচ