পাসপোর্ট থেকে কনস্যুলার সেবা এক প্ল্যাটফর্মে আনার প্রতিশ্রুতি এনসিপির

নতুন রাজনৈতিক দল ও ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রবাসী বাংলাদেশিদের নাগরিক সেবা, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অধিকার ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিতে আমূল পরিবর্তনের বিস্তৃত রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঘোষিত ইশতেহারে পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন ও কনস্যুলার সেবাসহ সব প্রবাসী সেবা একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানে লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলের লা ভিতা হলে ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ শিরোনামে ঘোষিত ৩৬ দফার ইশতেহারের ৯ নম্বর দফায় প্রবাসীদের মর্যাদা ও অধিকারকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে তুলে ধরে এনসিপি।
ইশতেহারে বলা হয়, দেশের উন্নয়ন, অর্থনীতি ও কূটনীতিতে প্রায় এক থেকে দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির অবদান অনস্বীকার্য। প্রতিবছর রেমিট্যান্স, দক্ষতা, জ্ঞান ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তাঁরা রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীরা রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, নাগরিক সেবা ও মানবিক সুরক্ষায় বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছেন।
এক প্ল্যাটফর্মে সব নাগরিক সেবা
প্রবাসী সেবার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এনসিপি ‘ডায়াস্পোরা ডিজিটাল পোর্টাল’ নামে একটি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর ঘোষণা দিয়েছে। এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পাসপোর্ট, এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, কনসুলার সেবা, সার্টিফিকেট ইকুইভালেন্স, বিনিয়োগ সংক্রান্ত আবেদন এবং ওয়েজ আর্নার্স মেম্বারশিপসহ সব সেবা অনলাইনে গ্রহণের সুযোগ থাকবে। এতে প্রবাসীদের বারবার দূতাবাসে যেতে না হওয়া এবং সময় ও অর্থের অপচয় কমবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়।
একইসঙ্গে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও অন্যান্য কনসুলার সেবার ফি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
দূতাবাস সংস্কার ও জবাবদিহি
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কাঠামোগত সংস্কারের জন্য একটি স্বতন্ত্র সংস্কার কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। কমিশনের মাধ্যমে দূতাবাস ও কনসুলার সেবাকে স্বচ্ছ, দক্ষ ও নাগরিকবান্ধব করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিটি দূতাবাসে পৃথক নাগরিক সেবা ও সুরক্ষা বিভাগ গঠন, পর্যাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কনসুলার অফিসের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও ইশতেহারে রয়েছে।
সেইসঙ্গে দূতাবাস ও কনসুলেটে হয়রানি প্রতিরোধে অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত সেল গঠন করা হবে বলেও ইশতেহারে বলা হয়েছে। এই সেল দ্রুত স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা রাখবে এবং অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখা হবে। পাশাপাশি প্রবাসী কমিউনিটির প্রতিনিধিদের যুক্ত করে ‘সিটিজেন সার্ভিস মনিটরিং বোর্ড’ গঠনের মাধ্যমে দূতাবাসের সেবার মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণের কথা বলা হয়েছে।
আইন সংস্কার, ডিজিটাল পরিচয় ও মানবিক সুরক্ষা
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন ২০২৩ সংশোধন করে প্রবাসী নাগরিকদের জন্য আলাদা ক্যাটাগরি তৈরির ঘোষণা দিয়েছে এনসিপি। এর ফলে প্রবাসীরা অনলাইনে দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে পাসপোর্ট, এনআইডি, জন্মনিবন্ধন এবং কনসুলার সহায়তা পাবেন।
এছাড়াও বিদেশে সংকটে পড়া প্রবাসীদের জন্য প্রতিটি দেশে জরুরি আইনি সহায়তা ও আর্থিক তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। মানবপাচার, শ্রমিক নির্যাতন ও অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়।
বিদেশে মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশিদের মরদেহ সরকারি খরচে হয়রানিমুক্তভাবে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মৃতদেহ এসকোর্ট সার্ভিস চালু করে বিমানবন্দরে আলাদা ব্যবস্থাপনার কথাও বলা হয়েছে।
বিমানবন্দর ও যাত্রীসেবা
প্রবাসীদের জন্য বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং দুর্ব্যবহারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের কথা জানিয়েছে এনসিপি। একইসঙ্গে বিমান টিকিট সিন্ডিকেট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি রোধে টিকিট এজেন্সিদের কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
রেমিট্যান্সের বিপরীতে ‘RemitMiles’ নামে বিশেষ ট্রাভেল মাইলস সুবিধা চালুর ঘোষণাও ইশতেহারে রয়েছে, যা ব্যবহার করে বাংলাদেশ বিমানে ছাড়, অতিরিক্ত লাগেজ ও অন্যান্য সুবিধা পাওয়া যাবে।
অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও বিনিয়োগ
প্রবাসীদের রেমিট্যান্স অ্যাকাউন্টের ভিত্তিতে ডিজিটাল প্রবাসী অ্যাকাউন্ট চালু করে স্বল্পসুদে ঋণ, সঞ্চয় ও পেনশন স্কিমের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগ এবং দেশি-বিদেশি অংশীদারিত্বে প্রবাসীদের সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়াও ইশতেহারে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রফেশনালদের দেশের উন্নয়নে যুক্ত করতে স্থায়ী ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন’ কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দিয়েছে এনসিপি। এর অংশ হিসেবে বিদেশি ডিগ্রি ও অভিজ্ঞতার সেক্টরভিত্তিক মূল্যায়ন, সরকারি উচ্চপদে সরাসরি যোগদানের সুযোগ এবং ‘গ্লোবাল বাংলাদেশি টেলেন্ট নেটওয়ার্ক (জিবিটিএন)' নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ
প্রবাসীদের সামাজিক সংহতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় জোরদারে প্রতিটি দেশে ‘বাংলাদেশ সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা, প্রবাসী শিশুদের জন্য বাংলা ভাষা ও ইতিহাস শেখার অনলাইন কারিকুলাম এবং দ্বিতীয়-তৃতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশিদের জন্য ফেলোশিপ ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, দলের মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
টিআই/এমএসএ