বিদ্রোহীদের চাপে কোণঠাসা, ‘ধানের শীষের’ জয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় হাইকমান্ড

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন ঘিরে ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। তবে, ভোটের লড়াইয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী বিদ্রোহী প্রার্থীরা। তথ্য অনুযায়ী, নারী প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র ১০ জন হলেও ৭৯টি আসনে বিএনপির ৯২ জন নেতা স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।
শরিকদের আসনে অস্বস্তি
বিএনপি ১২টি আসনে নিজেদের প্রার্থী না দিয়ে জোটের শরিকদের (এলডিপি, গণঅধিকার পরিষদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি প্রভৃতি) আসন ছেড়ে দিয়েছে। কোথাও শরিকরা নিজস্ব প্রতীকে, আবার কোথাও ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন। তবে, সংকট তৈরি হয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে। শরিকদের ছেড়ে দেওয়া প্রায় প্রতিটি আসনেই বিএনপির প্রভাবশালী স্থানীয় নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছেন। এতে যেমন জোটের মধ্যে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি এসব আসনে জয় নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
শরিক দলগুলোর নেতাদের মতে, বিএনপির হাইকমান্ড দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারলে আসন সমঝোতার মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। এটি জোটের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আস্থার সম্পর্কেও ফাটল ধরাতে পারে।
বিএনপি ১২টি আসন শরিকদের ছেড়ে দিলেও সেখানে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন দলের প্রভাবশালী স্থানীয় নেতারা। জোটের প্রার্থীরা ধানের শীষ নিয়ে লড়লেও প্রায় প্রতিটি আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও বহিষ্কৃত নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে সক্রিয়। ফলে জোটের রাজনৈতিক আস্থার সম্পর্ক যেমন দুর্বল হচ্ছে, তেমনি আসনগুলোতে শরিকদের জয় নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা
গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে বিদ্রোহীদের দাপট
ঢাকার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে বিএনপির প্রার্থীরা নিজ দলের বিদ্রোহীদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। আসনগুলো হলো—
• ঢাকা-৭ : এই আসনে দলীয় প্রার্থী হামিদুর রহমানের বিপরীতে লড়ছেন যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার।
• ঢাকা-১২ : এখানে জোটের প্রার্থী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব। এ কারণে তাকে দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। নীরব জানান, তিনি ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। জয়ের ব্যাপারে তিনি বেশ আশাবাদী। অন্যদিকে সাইফুল হক অভিযোগ করেছেন, তার কর্মী ও জোটের ভাইদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এটা বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাকে এ আসনের জন্য মনোনীত করেছেন। জোটের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে যে সিদ্ধান্ত এসেছে, তা সবাইকে মেনে নিতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।’
নেতাকর্মীদের কোনো ধরনের বিভ্রান্তিতে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দল ও মত নির্বিশেষে জোটের প্রার্থীর পক্ষেই সবার কাজ করা উচিত।
• ঢাকা-১৪ : গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলিকে মনোনয়ন দিলেও সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বহিষ্কৃত নেতা সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজু।
• নারায়ণগঞ্জ- ১ : এ আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া। তার বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ-সম্পাদক মোহাম্মদ দুলাল হোসেন। তার প্রতীক জাহাজ। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তিনি বহিষ্কৃত হয়েছেন। তবে দুলাল হোসেন জানান, তিনি আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন এবং দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়া সত্ত্বেও ভোটের মাঠে আছেন।
• নারায়ণগঞ্জ-২ : ঢাকা বিভাগীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম এই আসনে বিএনপির প্রার্থী। তার বিরুদ্ধে নির্বাচন করছেন তিনবারের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আতাউর রহমান খান আঙ্গুর। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি কলস প্রতীক পেয়েছেন এবং জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
• নারায়ণগঞ্জ-৩ : এই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আজহারুল ইসলাম। তার বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বহিষ্কৃত সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম এবং সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। রেজাউল করিমের প্রতীক ঘোড়া এবং গিয়াস উদ্দিনের প্রতীক ফুটবল।
• নারায়ণগঞ্জ-৪ : এই আসনে বিএনপি সমর্থন দিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মনির হোসেন কাসেমীকে। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির বহিষ্কৃত সদস্য ব্যবসায়ী নেতা মোহাম্মদ শাহ আলম ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। শাহ আলম হরিণ ও গিয়াস উদ্দিন ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের মাঠে সক্রিয় আছেন।
• মুন্সিগঞ্জ-১ : এই আসনে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মো. আবদুল্লাহকে প্রার্থী করে বিএনপি। তার বিপরীতে শ্রীনগর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. মমীন আলী নির্বাচনী মাঠে রয়ে গেছেন।
• ময়মনসিংহ-১ : এই আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ। এখানে দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সালমান ওমর।
• ময়মনসিংহ-২ : এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি-দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) শাহ্ শহীদ সারোয়ার। তাকে দল থেকে বহিষ্কৃত করা হয়েছে। স্বতন্ত্র নির্বাচন করায় ২০২৪ সালেও তিনি দল থেকে বহিষ্কার হন।
• ময়মনসিংহ-৩ : এই আসনে দলীয় প্রার্থী বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য এম ইকবাল হোসেইন। এখানে মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন গৌরীপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আহাম্মদ তায়েবুর রহমান। তাকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
• ময়মনসিংহ-৬ : এই আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. আখতারুল আলম। তার বিপক্ষে প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি-দলীয় সাবেক এমপি শামসুদ্দিন আহমেদের স্ত্রী আখতার সুলতানা। তিনি উপজেলা মহিলা দলের সাবেক সভাপতি ছিলেন।
• ময়মনসিংহ-৭ : এই আসনে দলীয় প্রার্থী দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মো. মাহাবুবুর রহমান। এখানে বিএনপির সাবেক এমপি আবদুল খালেকের ছেলে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আনোয়ার সাদাত স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন।
• ময়মনসিংহ-৯ : এই আসনে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইয়াসের খান চৌধুরী দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন ইয়াসের খানের চাচা ও সাবেক এমপি খুররম খান চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা খান চৌধুরী। ভাতিজার বিরুদ্ধে চাচির প্রার্থী হওয়া নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা চলছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান জানান, শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া এখনও চলমান। এটি দলের কোনো বিশেষ নির্বাচনী কৌশল কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেরকম কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ছিল, তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে।’
• ময়মনসিংহ-১০ : এই আসনে দলীয় প্রার্থী দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান। শেষ সময়ে বিএনপির তিনজন নেতা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করলেও দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান ভোটের মাঠে এখনও সক্রিয় আছেন।
• ময়মনসিংহ-১১ : ময়মনসিংহ-১১ আসনে ভালুকা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফখর উদ্দিন আহমেদ দলীয় প্রার্থী। তার বিপক্ষে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম।
• ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ : এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী নাসিরনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ হান্নান। এখানে দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। তারা হলেন জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ কে এম কামরুজ্জামান এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি (বহিষ্কৃত) ও বুড়িশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ইকবাল চৌধুরী।
• ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ : এই আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবীবকে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন বিএনপির সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক রুমিন ফারহানা। যদিও তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের মহাসচিব তরুণ দে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। তাকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
জানতে চাইলে রুমিন ফারহানা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছি। আমার ভোটাররা আমার শক্তি ও সাহস। আশা করি বিজয়ী হয়ে মানুষের সেবা করতে পারব।’ বিজয়ী হলে আবারও বিএনপিতে যোগ দেবেন কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আগে নির্বাচনটা হোক। তারপর দেখা যাবে।’
বিদ্রোহীদের সামলাতে বিএনপি ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ জন নেতাকে বহিষ্কার করেছে। তবে বিএনপির উপদেষ্টা মাহাদী আমিনের মতে, বিদ্রোহীরাও দলের অনেক ত্যাগী নেতা। তাদের বুঝিয়ে মাঠ থেকে সরানোর চেষ্টা করা হলেও অনেকে সাড়া দেননি। দলের পক্ষ থেকে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থার প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে
• ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ : এই আসনে দলীয় প্রার্থী হলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. আবদুল মান্নান। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আছেন জেলা বিএনপির অর্থবিষয়ক সম্পাদক কাজী নাজমুল হোসেন।
• পটুয়াখালী-৩ : এই আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী ও গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। তবে এখনও মাঠে সক্রিয় আছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন। এ বিষয়ে নুরুল হক নুর ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমরা একটি স্থিতিশীল সরকারের জন্য আসন সমঝোতা করে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচন করছি। যেসব আসনে বিএনপি সরাসরি প্রার্থী দেয়নি সেখানে প্রায় প্রতিটি আসনেই তাদের বিদ্রোহী প্রার্থী আছে। আমরা বিষয়টি হাইকমান্ডকে জানিয়েছি। আশা করি তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন।’
• যশোর-৫ : আসনটি বাংলাদেশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (অনিবন্ধিত দল) নেতা মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাছকে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। অন্যদিকে, মনিরামপুর থানা বিএনপির সভাপতি শহীদ মো. ইকবাল হোসেন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
• ঝিনাইদহ-৪ : এই আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁন। সম্প্রতি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রাশেদ খাঁনের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। তিনি ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সদস্য ও জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
• কিশোরগঞ্জ-৫ : এই আসনে ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় দল থেকে আসা সৈয়দ এহসানুল হুদা। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে আছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও বাজিতপুর উপজেলার সভাপতি শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। তিনি হাঁস প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তাকে বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
• সিলেট-৫ : আসনটি বিএনপি ছেড়ে দিয়েছে জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুককে। এখানে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন) ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে মাঠে সক্রিয় আছেন। দল তাকে বহিষ্কার করলেও স্থানীয় নেতাকর্মীরা তার পক্ষে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।
তারেক রহমানের ব্যক্তিগত অনুরোধ সত্ত্বেও মাঠ ছাড়েননি রুমিন ফারহানা, সাইফুল আলম নীরব ও আতাউর রহমান খান আঙ্গুরের মতো হেভিওয়েট নেতারা। বহিষ্কারের তোয়াক্কা না করে এসব অভিজ্ঞ নেতা স্বতন্ত্র প্রতীকে নির্বাচন করছেন। তাদের মতে, দল বহিষ্কার করলেও ভোটাররাই তাদের প্রধান শক্তি। এই অনড় অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে বিএনপির মূল প্রার্থীদের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে
• সুনামগঞ্জ-৩ : এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ। এখানে দলীয় সিদ্ধান্ত না মেনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন।
• সুনামগঞ্জ-৪ : এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন নুরুল ইসলাম। জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। তিনি সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান।
বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় বিএনপির হাইকমান্ড
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ৭৯টিতে বিএনপির ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিষয়টি নিয়ে দলের হাইকমান্ডের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, শুরুতে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল বিএনপি। প্রথম দফায় একযোগে বেশ কয়েকজনকে বহিষ্কারও করা হয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে অনেক প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। এতে কেউ কেউ সাড়া দিলেও শেষপর্যন্ত বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের ৯২ জন নেতা নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে দাঁড়াননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৭৯টি আসনে ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি ভোটের মাঠে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ধানের শীষের সমর্থক ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের ভোট দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন। দলীয় সংহতি নষ্ট হওয়ার এই আশঙ্কা এখন বিএনপির নীতিনির্ধারকদের কপালে দুশ্চিন্তার বড় ভাঁজ তৈরি করেছে
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, যেসব আসনে জোটের শরিক বা বিএনপির মূল প্রার্থীর বিপরীতে শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে, সেখানে ভোটের বিভাজনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন। মূলত এই সমীকরণটিই এখন দলের সিনিয়র নেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
এ বিষয়ে তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা মাহাদী আমিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বিদ্রোহী প্রার্থীরাও দলের অনেক ত্যাগী নেতা। তাদের বুঝিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হয়েছিল এবং অনেকেই তাতে সাড়া দিয়েছেন। তবে, যারা শেষ পর্যন্ত অনড় থেকেছেন, ধানের শীষের বৃহত্তর স্বার্থে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’
বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান জানান, শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া এখনও চলমান। এটি দলের কোনো বিশেষ নির্বাচনী কৌশল কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেরকম কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ছিল, তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে।’
এএএম/