সাইবার আক্রমণ, উসকানি দিয়ে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধের চেষ্টা করছে একটি দল

একটি দল নারীদের প্রতি অশালীন আচরণ, আক্রমণ, উসকানিমূলক বক্তব্য এবং সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ও সাধারণ মানুষকে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে ঠেলে দেওয়ার হীন অপপ্রয়াস চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
দলটি বলছে, শেরপুরে জামায়াত নেতা রেজাউল হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার এক সপ্তাহ শেষ হয়নি, রক্তের দাগ শুকায়নি। হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে নাম উল্লেখ করে মামলা দেওয়া হয়েছে, যা তদন্তাধীন। সেই তদন্তাধীন মামলার আসামিরা হাইকোর্টে আগাম জামিন পাওয়ায় সংক্ষুব্ধ জামায়াত।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিকেল সাড়ে ৫টায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সংঘটিত নানা বিষয় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
তিনি বলেন, বিগত ২৮ জানুয়ারি শেরপুরে প্রিজাইডিং অফিসারের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে আমাদের লোকজন যোগদান করেছিলেন। সে অনুষ্ঠানে বিএনপির সেই এলাকার সংসদ সদস্য প্রার্থীর নেতৃত্বে ও নির্দেশনায় বিএনপির সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। ওই হামলায় শ্রীবর্দী থানা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। হত্যার ঘটনার পর আমরা মামলা দিয়েছিলাম এবং ওই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার এক সপ্তাহ শেষ হয়নি, রক্তের দাগ শুকায়নি। হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে নাম উল্লেখ করে মামলা দেওয়া হয়েছে, যা তদন্তাধীন।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর শহীদ পরিবারের প্রতি সহানুভূতি জানাতে জামায়াত আমির গতকাল শ্রীবর্দীতে গেছেন। রেজাউল করিমের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সান্ত্বনা দিয়েছেন, শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে কবর জিয়ারত করেছেন এবং এলাকাবাসীকে নিয়ে তিনি সেখানে দোয়া করেছেন।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আজ আমরা আশ্চর্য হলাম যে সেই চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা উচ্চ আদালতে এসে জামিন নিয়েছেন। এত বড় একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড যেটি প্রকাশ্য দিবালোকে হয়েছে, সেই হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই চিহ্নিত সেই সমস্ত সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের গ্রেপ্তার তো দূরের কথা, বরং তাদের জামিন দিয়ে জনমনে স্বাভাবিকভাবে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। যেখানে হত্যাকাণ্ডের রক্তের দাগ এখনো শুকিয়ে যায়নি সেখানে খুনি ও সন্ত্রাসীরা এইভাবে পার পেয়ে যাবে।
তিনি বলেন, এলাকাবাসী তাদের প্রিয় নেতাকে হারিয়ে কষ্ট ও বেদনার ভেতরে তারা আছেন। এ অবস্থায় সন্ত্রাসীদের জামিন দেওয়ার মাধ্যমে আমরা মনে করি আইনের শাসন বাদ দিয়ে অনুকম্পা দেখানো হচ্ছে। আমরা এ ব্যাপারে সংক্ষুব্ধ। আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করতে বলেছি, যাতে উচ্চ আদালত এই জামিন স্থগিত করেন।
প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান বলেন, আমরা দেশবাসীকে জানাচ্ছি বিগত ১২ ডিসেম্বর শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলা ও শাহাদাতের পর থেকেে এটি ছিল নিষ্ঠুর ও নির্মম হত্যাকাণ্ড। খুব নির্মমভাবে পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাকে হত্যা করা হয়েছে। আরও অনেকে আহত হয়েছে। সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য এ সমস্ত চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করা। কিন্তু আমাদের কাছে মনে হয় স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছেন।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জাতির কাছে আমরা বিচার দিচ্ছি যে, এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়া উচিত। দোষীদের আইনের আওতায় এনে তাদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা। অন্যথায় দেশবাসীর কাছে, জনগণের কাছে এটি প্রমাণিত হবে খুন করেও পার পাওয়া যায়। ফ্যাসিবাদের সময় এগুলো হয়েছে, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার এ কাজগুলো করেছে, যার ফলশ্রুতিতে জনমনে মারাত্মক ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল এবং গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদকে বিদায় নিতে হয়েছিল।
তিনি বলেন, আমরা অবিলম্বে রেজাউল করিমের খুনিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায়ে এনে সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে তাদের যথাযথ শাস্তি দেওয়া উচিত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়টি বিবেচনার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।
জামায়াতের এ নেতা বলেন, বিগত ১৭ দিনে ৩৩ জেলায় বিভিন্নভাবে সন্ত্রাসীরা এবং বড় একটি দলের নেতাকর্মীরা উসকানি দিয়েছেন, আমাদের ভোটের জন্য কাজ করা নারী বা মহিলা কর্মীদের হুমকি দিয়েছেন, অশালীন মন্তব্য করেছেন এবং তাদের প্রতি এমন সব আচরণ ও কটূক্তি করেছেন, যা কোনো সুস্থ মানুষ কল্পনা করতে পারেন না। কোনো কোনো জায়গায় তাদের শারীরিকভাবে হামলা-আঘাত করে আহত করা হয়েছে।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) একজন শীর্ষ নেতা বোরখা নিয়ে কমেন্ট করেছেন, নির্বাচনের দিন হিজাব খুলে দেখতে হবে। এর মাধ্যমে নারীদের তারা ভীতিকর ম্যাসেজ দিচ্ছেন। জামায়াতের প্রতি নারীদের যে বিপুল সমর্থন আমরা দেখছি। আমাদের জনসভায় নারীদের উপস্থিতি দেখে তাদের মাথায় বড় ধরনের কোনো চাপ হয়েছে, যার কারণে তারা নারীদের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ করছে। একটার পর একটা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, তারপরও তাদের বোধোদয় হচ্ছে না। উল্টো আমাদের আমীরে জামায়াত নারীদের প্রতি দায়িত্বশীল কথা বলছেন। অন্যদিকে জামায়াত আমিরের টুইটার একাউন্ট বঙ্গভবনের মতো সুরক্ষিত জায়গা থেকে হ্যাক করা হয়েছে। তাহলে জাতীয় নিরাপত্তা কোথায়। জাতীয় নিরাপত্তার ব্যাপারে আমরা উদ্বিগ্ন। সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিকভাবে বড় দলের শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকেও এমন সব কথা বলা হচ্ছে, যা দেশবাসী প্রত্যাশা করে না। আমরা আশা করব যে, নারীদের সম্মান ও মর্যাদা রেখে চলব। একইসঙ্গে আমাদের ব্যাপারে অসত্য, অন্যায় ও মিথ্যা অভিযোগ যারা করছেন দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আমরা তাদের মোকাবিলা করব। সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচনের জন্য জাতি উন্মুখ। আমরা আচরণবিধি মেনেই নির্বাচনী কাজে অংশগ্রহণ করছি। আশা করছি সবাই স্ব স্ব অবস্থান থেকে সে দায়িত্ব পালন করবেন। কোনো উসকানি যাতে এ জাতিকে বিভ্রান্ত না করে। দায়িত্বশীল বক্তব্য সবাই দেবেন। নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এমন কোনো আচরণ করা ঠিক না। একদল লোক নারীদের ওপর আক্রমণ ও আচরণ, উসকানিমূলক বক্তব্য, সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে তারা এ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ও সাধারণ মানুষকে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে ঠেলে দেওয়ার হীন অপপ্রয়াস চালাচ্ছে।
জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান বলেন, আমরা জাতিকে, বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাচ্ছি আসুন সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য এগিয়ে যাই। চব্বিশের ৫ আগস্ট আমাদের সেটিই শিখিয়েছে। ফ্যাসিবাদ ও তাদের দোসররা যে ক্ষতি করেছে, সুষ্ঠু, সুন্দর নির্বাচনের মাধ্যমে আগামীর বাংলাদেশে যে সরকার আসবে তার ওপর অনেক বড় দায়িত্ব আসবে। অনেক চ্যালেঞ্জ তাকে মোকাবিলা করতে হবে। সবাই সম্মিলিতভাবে সেই বাংলাদেশ গড়ার দিকে এগিয়ে যাব। রাজনৈতিক দলগুলো প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ভূমিকা পালন করবেন, আমরা সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সাংবাদিক ওলিউল্লাহ নোমান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সহকারী প্রচার সম্পাদক আব্দুস সাত্তার সুমন।
জেইউ/এসএসএইচ