বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বনাম সরু গলি, কার বাক্সে যাবে উত্তরার ভোট?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুয়ারে বাংলাদেশ। ভোটের আমেজে সরগরম গোটা দেশ; ব্যতিক্রম নয় ঢাকা-১৮ আসনও। এ আসনে একদিকে যেমন রয়েছে উত্তরার মতো পরিকল্পিত ও অভিজাত আবাসিক এলাকা, অন্যদিকে রয়েছে উত্তরখান-দক্ষিণখানের মতো অবহেলিত জনপদ। এর মাঝেই অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও ঘনবসতিপূর্ণ কর্মজীবী এলাকা। এই বৈচিত্র্যই ঢাকা-১৮ আসনকে রাজনৈতিকভাবে জটিল ও কৌশলনির্ভর করে তুলেছে। এখানে ‘এলিট ভোট’ এবং ‘প্রান্তিক ভোট’—উভয় সমীকরণ নিয়েই প্রার্থীদের আলাদাভাবে ভাবতে হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-১৮ আসনে দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ভোটযুদ্ধে নেমেছেন আটজন প্রার্থী। তবে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন এবং এনসিপি মনোনীত ১১ দলীয় জোটের আরিফুল ইসলাম। এই দুই প্রার্থীকে ঘিরেই স্বপ্ন দেখছেন এখানকার অধিকাংশ ভোটার। নিজ নিজ প্রতীকের পক্ষে জনমত গড়তে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে প্রচার চালাচ্ছেন তাদের কর্মী-সমর্থকরা।
নির্বাচনী প্রচারের শেষ মুহূর্তে মাঠে বেশ সরব বিএনপি প্রার্থী জাহাঙ্গীর হোসেন। এ আসনে তিনি নিয়মিত গণসংযোগ করছেন। ‘ধানের শীষ’ প্রতীককে বিজয়ী করতে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় সমর্থকদের উপস্থিতিও তাঁর প্রচারণায় চোখে পড়ছে। এবারের ভোটে বিএনপির প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ‘পরিবর্তনের বার্তা’ এবং বিদায়ী সরকারের সমালোচনা। যদিও এমন প্রচারণায় ভোটারদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা একে কৌশলের শক্তি হিসেবেই দেখছেন।
বিএনপির মতোই এ আসনের পাড়া-মহল্লায় নিজের শক্তি জানান দিচ্ছেন আরিফুল ইসলাম। এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটের বার্তা নিয়ে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ভোট চাইছেন তিনি। জোটের শক্তি কাজে লাগিয়ে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক প্রচার জোরদার করেছেন এই তরুণ প্রার্থী। এলিট কিংবা প্রান্তিক— উভয় শ্রেণির ভোটারদের কাছে তিনি উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির কথা বলছেন। সব শ্রেণির ভোটারকে এক ছাতার নিচে আনাকেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন তাঁরা। নিজস্ব শক্তি কাজে লাগিয়ে এই লক্ষ্য অর্জনে অনেকটা সফল হয়েছেন বলেও দাবি করেছেন জোট নেতারা।
বিএনপি ও এনসিপির এই লড়াইয়ের বাইরে ‘কেটলি’ প্রতীকেরও কিছুটা জোয়ার লক্ষ্য করা গেছে। এই প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আনোয়ার হোসেনের ‘হাতপাখা’, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ইসমাইল হোসেনের ‘হরিণ’, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মো. জসিম উদ্দিনের ‘মোমবাতি’, এনপিপির সাবিনা জাবেদের ‘আম’ ও বাসদের সৈয়দ হারুন অর রশীদের ‘মই’ প্রতীকের পোস্টার-ব্যানারও দেখা গেছে। প্রার্থীরা নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী প্রচার চালালেও ভোটের মূল সমীকরণে তাঁদের প্রভাব সীমিত বলেই মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা।

আলোচনায় ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন রনিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি তিনি ব্যক্তিগতভাবেও প্রচারণা চালিয়েছেন। তবে সম্প্রতি শাহবাগে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হওয়ার পর থেকে তিনি কার্যত প্রচারণার বাইরে রয়েছেন।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উত্তরার সেক্টরভিত্তিক এলাকাগুলোতে ভোটের পরিবেশ তুলনামূলক শান্ত। অভিজাত ফ্ল্যাটবাড়ি ও প্রশস্ত সড়কের কারণে এখানে সরব মিছিল বা উচ্চকিত প্রচারণা তেমন চোখে পড়ে না। তবে এই নীরবতার আড়ালেই চলছে হিসাবি আলোচনা। উন্নয়ন, নিরাপত্তা, যানজট নিরসন এবং বিমানবন্দরকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই এখানকার বাসিন্দাদের প্রধান বিবেচ্য বিষয়। অনেকে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে অনাগ্রহী হলেও ঘরোয়া আলাপচারিতায় নিজেদের পছন্দের প্রার্থী প্রায় ঠিক করে ফেলেছেন বলে জানিয়েছেন।
চাকরির সুবাদে উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরে বসবাসকারী হিমেল আহমেদ এবার প্রথম ভোটার। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, এ এলাকায় দীর্ঘদিনের বসবাস। আগের নির্বাচনগুলোও দেখেছি, তবে এবারের পরিবেশ ভিন্ন। প্রার্থীদের প্রচারণা চললেও ভোটারদের মনোভাব বোঝা কঠিন, কারণ কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলছেন না। তবে জামায়াতের সরাসরি প্রার্থী না থাকায় বিএনপির অবস্থান বেশ শক্ত বলে মনে হচ্ছে।

উত্তরার ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেছে উত্তরখান ও দক্ষিণখান এলাকায়। সরু গলি, অপরিকল্পিত বসতি, জলাবদ্ধতা এবং গ্যাস-পানির সংকটের কারণে এখানকার ভোটারদের অভিযোগের অন্ত নেই। ফলে প্রার্থীদের পদচারণাও এখানে বেশি। পোস্টার ও লিফলেট হাতে প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে আশার বাণী শোনাচ্ছেন।
দক্ষিণখানের বাসিন্দা জাহিদুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, উত্তরার পাশে আমাদের এলাকাটি একেবারেই বেমানান। গত ১৭ বছরে প্রার্থীরা এসে অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তব চিত্র বদলায়নি। ভোট এলে সবার দেখা মেলে, কিন্তু পরে আর কাউকে পাওয়া যায় না। এবার আমরা আর ফাঁকা প্রতিশ্রুতি শুনতে চাই না। যিনি প্রকৃত সমস্যার সমাধান করবেন, তাকেই ভোট দেবো।
উত্তরখানের ব্যবসায়ী মোজাম্মেল মিয়া জানান, তার দোকানে বিএনপি ও এনসিপিসহ বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা এসেছেন। তারা উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে তিনি কাকে ভোট দেবেন তা এখনই বলতে চান না। তার মতে, সংসদে এমন যোগ্য লোক যাওয়া উচিত যিনি এই জনপদের সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলতে পারবেন।
বাস্তবতার এই ভিন্নতার কারণে প্রার্থীরাও প্রচারণায় ভিন্ন কৌশল নিচ্ছেন। এলিট এলাকাগুলোতে তারা উন্নয়ন ও আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছেন। অন্যদিকে প্রান্তিক জনপদে জলাবদ্ধতা নিরসন ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করছেন। এছাড়া বিমানবন্দর এলাকার শ্রমজীবী মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কাছে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উন্নয়ন ও সেবার প্রতিশ্রুতি বিএনপির জাহাঙ্গীরের
নির্বাচনী প্রচারণায় উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরছেন বিএনপির প্রার্থী জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি বলেন, জনগণের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করাই আমার রাজনীতির মূল লক্ষ্য। নির্বাচিত হলে উন্নয়ন ও সেবামুখী কার্যক্রমে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
জাহাঙ্গীর বলেন, গত ১৭ বছরে স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। যন্ত্রপাতি আমদানির নামে অতিরিক্ত বিল দেখিয়ে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যার ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এ অবস্থায় ধানের শীষে ভোট দিয়ে আমাকে বিজয়ী করলে এ খাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করবো। বিএনপির রাজনীতি জনকল্যাণের রাজনীতি, আর সেই জনকল্যাণেই আমি আজীবন নিজেকে নিবেদিত রাখতে চাই।

নগর ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন সেবার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজউক ও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাচারিতা ও যথাযথ আইন প্রয়োগে ব্যর্থতার কারণেই অপরিকল্পিত নগরায়ন হচ্ছে এবং বিধিবহির্ভূত ভবন নির্মাণ বাড়ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্বশীলভাবে কাজ করলে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। পরিকল্পিত নগরায়ন ও সঠিক নজরদারি থাকলে দিয়াবাড়িতে যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় হতাহতের পরিমাণও অনেক কম হতে পারতো। তাই নগর উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাগরিক সংকট দূর করার প্রতিশ্রুতি আরিফুলের
১১ দলীয় জোটের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম নাগরিক সংকট দূরীকরণ ও রাজনৈতিক সহনশীলতার ওপর জোর দিচ্ছেন। উত্তরার তুরাগ এলাকায় এক মহিলা সমাবেশে তিনি বলেন, বিগত ১৭ বছর মায়েরা যেভাবে ধৈর্য ধরেছেন, আসন্ন নির্বাচনে তাঁদের হাত ধরেই একটি ‘নীরব গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ ঘটবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গঠিত হবে।

তিনি বলেন, মানুষ এমন একটি বাংলাদেশ চায়— যেখানে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হবে, নারীরা মর্যাদার সঙ্গে কাজ করতে পারবে, যুবকদের কর্মসংস্থান থাকবে এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চর্চায় কোনো বাধা থাকবে না।
নাগরিক সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বাউনিয়াসহ তুরাগ এলাকার দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটের কথাও বলেন শাপলা কলির এই প্রার্থী। আরিফুল বলেন, নিয়মিত বিল পরিশোধের পরও পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন মায়েরা। আমি নির্বাচিত হলে গ্যাস সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেবো। একইসঙ্গে বেহাল সড়কব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা ও সিটি করপোরেশনের নাগরিক সেবার দুর্বলতার সমালোচনা করে প্রতিটি ওয়ার্ডে পরিকল্পিত উন্নয়নের অঙ্গীকারও করেন তিনি।
/আরএইচটি/এমআরআর/