অন্যায়ের প্রতিকার না পেলে বাধ্য হবো আমাদের পথ ধরতে

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, যেসব আসনে কারসাজি, অন্যায় আচরণ করা হয়েছে, যাদের অধিকার জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, আমাদের সিদ্ধান্ত তারা প্রতিকার চাইবেন। সুনির্দিষ্ট সময়ের ভেতরে যদি প্রতিকার না পাই তাহলে আমরা বাধ্য হবো, আমাদের পথ ধরতে।
জামায়াত আমির বলেন, আমরা আশা করবো নির্বাচন কমিশনের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে এবং তারা ন্যায়-ইনসাফ করবেন। না করলে দায় তাদেরকে নিতে হবে।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারের জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য জোটের পক্ষ থেকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন নির্বাচন ও ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল জনগণ। গতকাল স্বাচ্ছন্দে স্বস্তির সঙ্গে তারা ভোট দিতে চেয়েছিলেন। আমরা গতকাল রাতেও বলেছিলাম, বাংলাদেশে আমরা সুস্থ ধারার রাজনীতির পক্ষে। আমরা চাচ্ছি, ইতিবাচক দ্বারা রাজনীতি করবো। আর আমরা এও বলেছিলাম, আমাদের বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ আছে, আপত্তির জায়গা আছে।
তিনি বলেন, নির্বাচন মানে হার-জিতের ব্যাপার থাকবে স্বাভাবিক। সেই হার-জিতটা যদি স্বাভাবিকভাবে হয় তাহলে কারো সেখানে বড় কোনো আপত্তি থাকে না। সবাই সাধারণত মেনে নেয়। কিন্তু যদি সেখানে বড় ধরনের কোনো বৈষম্য অথবা অনিয়ম হয়ে থাকে তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এটা প্রশ্ন তৈরি করে।
তিনি আরও বলেন, আমরা আমাদের পক্ষ থেকে গতকাল এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জানানোর পরেও আজকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের কর্মী সমর্থক, এজেন্ট, ভোটার বিভিন্ন জায়গায় বাড়িতে বাড়িতে হামলা হচ্ছে। ব্যক্তির ওপর হামলা হচ্ছে। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বাড়িতে। এটা তো ফ্যাসিবাদী তৎপরতা। যে ফ্যাসিবাদের ধ্বংসস্তূপের ওপর জাতির জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক এবং এর সম্পূর্ণ দায় তাদেরকে নিতে হবে যারা এই ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হবেন। আমরা চাইলেও যদি তারা ইতিবাচক ধারার রাজনীতি না চান তাহলে আমরা জোর করে ইতিবাচক রাজনীতি করতে পারবো না।
জামায়াত আমির বলেন, নির্বাচনে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছেন যেভাবেই পেয়ে থাকুন। এ ব্যাপারে আমাদের যথেষ্ট অবজারভেশন, আপত্তি আছে। দায় মূলত তাদেরকেই নিতে হবে। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা হবে। যদি তারা সরকার গঠন করে এটা তাদের দায়িত্ব। কিন্তু এখন এগুলা কিসের আলামত? এখন এগুলা বন্ধ করতে হবে।
তিনি এও বলেন, এখনো যদি এগুলো বন্ধ করা না হয় আমরা বাধ্য হবো, যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে।
তিনি বলেন, আমরা নিরীহ দেশবাসী যারা ভালোবেসে একটা পরিবর্তনের পক্ষে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলেছেন এবং আমাদেরকে ভোট দিয়েছেন, সহযোগিতা সমর্থন করেছেন। আমরা তাদেরকে বলতে চাই, আপনারা যেমন আমাদের সঙ্গে ছিলেন, আমরা আপনাদের সঙ্গে ছিলাম আজকে থেকে আরও শক্তভাবে আপনাদের সঙ্গে থাকবো, ইনশাআল্লাহ।
নর্বাচনী ফলাফল প্রকাশে দেরি হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, বেশ কিছু জায়গায় কালকে নির্বাচনী সম্প্রচার যখন হয় ফলাফল হঠাৎ করে বন্ধ। কষ্টমষ্ট করে তাকে ছাড় দিয়ে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে, যেটা অবাস্তব। আবার আমাদের কাছে ডকুমেন্ট আছে। বিভিন্ন জায়গায় রেজাল্ট শিটের উপর ঘষামাজা করা হয়েছে। কিছু কিছু আসনে দ্বৈতনীতি অবলম্বন করা হয়েছে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, নাসীরউদ্দিন পাটোয়ারীর আসনের ব্যাপার আপনারা সবাই জানেন। এটা আমাকে বড় করে আর বলতে হবে না সেখানে কি হয়েছে। সেন্টার দখল করে একজন নেতার আপনজনের নেতৃত্বে সেখানে যা হয়েছে তার সাক্ষী দেশবাসী, বিশ্ববাসী।
নাসীরউদ্দিন পাটোয়ারীর ওখানে যে কারণে অন্য একজন প্রার্থীর পক্ষে ব্যালট এক্সেপ্ট করা হয়েছে ঠিক একই কারণ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক সাহেবের ক্ষেত্রে এক্সেপ্ট করা হয়নি। তো এক দেশে কি দুই আইন চলবে? নির্বাচন কমিশন কি এ এক জায়গায় একেকটা আইনের প্রয়োগ করবে? একই বিষয়ে এটা এখন বিশাল প্রশ্নের ব্যাপার। আমাদের সেক্রেটারি জেনারেলসহ বেশ কিছু আসনে এই ধরনের ব্যাপার আছে।
তিনি বলেন, আমরা দেশকে ভালোবাসি। ভালোবাসার জায়গা থেকে আমরা দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা এবং দেশের ঐক্য চাই। আমাদের স্লোগানই ছিল ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ। ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশে থাকতে হলে পরস্পরকে সম্মান করেই থাকতে হবে। এখানে কেউ রাজা নয় আর বাকিরা প্রজা নয়। এখানে কেউ মালিক বা অধীনস্থ নয়। এখানে সবাই বাংলাদেশের একই সংবিধানের অধীনে সমান অধিকার ভোগ করবেন।
জামায়াত আমির বলেন, অতীতে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই হয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম, এই কালো অধ্যায়ের অবসান হোক। কিন্তু যদি আবার এটা ফিরে আসে আমরা লড়ে যাব। আমরা থামবো না, ইনশাআল্লাহ। এখানে কোনো ছাড় দেবো না। দেশের জনগণের ফ্যাসিবাদ আমাদের বিরুদ্ধে না। ফ্যাসিবাদ দেশবাসীর বিরুদ্ধে।
সারা বিশ্ব থেকে এখানে পর্যবেক্ষকরা এসেছিলেন, তারা সময় দিয়েছেন, দেখেছেন আপনারাই জানাবেন। নতুন ধারার সুস্থ রাজনীতি চালু হোক এবং এখানে সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে, দায়িত্বজ্ঞানহীন কোনো আচরণ জাতি দেখতে চায় না, সহ্যও করবে না।
ইতিপূর্বে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, আমাদের তরুণ সমাজ যারা বুকের রক্ত দিয়ে জীবন দিয়ে আমাদের উপর এই আমানত রেখেছে, আমরা কথা দিচ্ছি, নির্বাচনের আগে যা বলেছি, তা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
আমাদের নারী সমাজের অধিকার এবং তাদের নিরাপত্তা নির্বাচনের আগে বিঘ্নিত হয়েছে। আমরা তাদের অধিকার নিরাপত্তার পক্ষে লড়ে যাবো। আমরা ছাড় দেব না। আমরা বাংলাদেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের পক্ষে আছি। আমরা কোনো দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে নই। আমাদের অবস্থান আপামর জনগণের পক্ষে। এই জায়গা থেকে চুল পরিমাণ সরার আমাদের কোনো সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, দেশবাসী আমাদের ইন্টেনশন দেখেছেন। আমরা গতকালকেই বলেছিলাম, আমাদের ভদ্রতাকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে কেউ যদি দুর্বলতা মনে করেন তারা নিজের উপরে জুলুম করবেন। এটা আমাদের দুর্বলতা নয়। এটা ছিল আমাদের উদারতা। উদারতাকে দুর্বলতা মনে করলে বিপত্তি তাদের জন্যই ঘটবে যারা মনে করবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা বিনয়ের সঙ্গে বলবো, এ সমস্ত অপকর্ম এখন বন্ধ করুন। এখন রাইট না আমরা আপনাদের সদিচ্ছা দেখতে চাই। নিশ্চয়ই আপনাদের নেতৃত্ব আছে, কমান্ড আছে। আমরা তার বাস্তবায়ন দেখতে চাই। আমরা এই সমস্ত ঘটনা যেগুলো ঘটেছে গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত সবগুলার তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা এটার প্রতিকার চাই। আমরা প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই। কিন্তু প্রতিকার পাওয়ার এবং নেওয়ার আমাদের অধিকার আছে। আমরা আশা করবো জাতির সেন্টিমেন্টের প্রতি সম্মান রেখে নির্বাচনে অনিয়ম, দুর্নীতি, মাসল পাওয়ার, কালো টাকা, যাই হয়েছে, এটার প্রতিকার চাইবো, আমাদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলতে দিন।
তিনি বলেন, ঋণ খেলাফিদের ঋণের এই দায় থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে।
নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, আরপিও যেটা কাভার করে না এরকম যারাই নির্বাচিত হয়েছেন তাদেরকে মেহেরবানি করে তাদের ফলাফল স্থগিত রেখে এ ব্যাপারে আগে সুরাহা করুন। তারপরে আপনারা আগান। দ্রুত সুরাহা করলে দ্রুত আগাইতে পারবেন, কোনো সমস্যা নাই। আমরা সহযোগিতা করবো। কিন্তু এর সুরাহা হওয়া উচিত।
যারা এই ঋণখেলাফি হয়েছেন, এটা এক ধরনের অপরাধ। তাদেরকে আরপিওর আন্ডারে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, সেটা তারা গ্রহণ করেন নাই। তারা গ্রহণ করলে আমাদের আজকে এই কথাগুলো বলার দরকার হতো না। অনেকে ঋণখেলাপির তথ্য গোপন করেছেন। সেইটাকে অবলীলায় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। দৃষ্টি আকর্ষণ করা সত্ত্বেও ক্ষেত্রবিশেষে সেগুলো আমলে নেওয়া হয়নি। স্পষ্টভাবে এটা আর আরপিওর লঙ্ঘন। আমরা সেই ভায়োলেশন দেখতে চাই না।
তিনি বলেন, সাংবাদিকরা আমরা মনে করি সত্যের পক্ষে অবস্থান নেবেন। সংবাদজগত ন্যায়ের পক্ষে নেবে। আপনাদের অবস্থান হবে ফ্যাসিবাদবিরোধী। আপনাদের অবস্থান হবে জনগণের স্বার্থ এবং কল্যাণের পক্ষে। আমরা এটাও লক্ষ্য করছি।
তিনি আরও বলেন, কোন কোন জায়গায় ফ্যাসিবাদীদেরকে ঘোষণা দিয়ে এখন পুনর্বাসন করা হচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময়েও তা লক্ষ্য করেছি। এটা মনে রাখবেন কিছু মানুষ জীবন বাজি রেখে লড়াই করে জীবন দিয়ে এই ছাব্বিশ আমাদেরকে এনে দিয়েছে। চব্বিশের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যে কেউ অপমানজনক আচরণ করবেন জাতি তাদেরকে ক্ষমা করবে না। বিশেষ করে যুবসমাজ তাদেরকে ক্ষমা করবে না।
গণভোটের পক্ষে জনগণের রায়কে অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, আমরা অনুরোধ করবো চব্বিশের আকাঙ্ক্ষাকে যেন ধারণ করা হয়। গণভোটের ব্যাপারে আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার রায় দিয়েছে গণভোটের পক্ষে। অবশ্যই তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এর কোনো ব্যতিক্রম আমরা দেখতে চাই না। পচা রাজনীতির পরিবর্তনের জন্যই ছিল এই গণভোট। নতুন ধারার সুস্থ রাজনীতির পক্ষেই গণভোট। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়েছে। এখন বাস্তবায়ন করা যারাই সরকার গঠন করবেন তাদের দায়িত্ব। তারা যদি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো।
তিনি বলেন, কেউ যদি এড়িয়ে চলতে চান আমরা এ বিষয়ে অবশ্যই আমাদের কন্ঠ থেমে থাকবে না। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করবো।
তিনি যে সমস্ত আসনে ভয়াবহ অনিয়ম হয়েছে আমাদের পক্ষ থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আমরা তার প্রতিকার চাইবো। কিন্তু হাস্যকর এতো কিছু করার পরেও একটা পক্ষ তারা সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। ভোট কেড়ে নেওয়া, তারপরে রেজাল্টে বিভিন্ন ধরনের মেকানিজম প্রয়োগ করা। এখন আবার সেই সিটগুলোর বিরুদ্ধে অনেকে নতুন কসরত শুরু করেছেন। কি চাচ্ছেন আপনারা? জাতির সামনে পরিষ্কার করে বলে দেন। এই প্রক্রিয়া যদি বন্ধ না হয় তাহলে আমাদের কি করার থাকবে? যারা এই ধরনের কাজ করবেন দায় তাদেরকে নিতে হবে। আমরা আবারও বলবো, দেশকে ভালোবাসি। আমরা ইতিবাচক ধারার রাজনীতি চাই। আমাদেরকে ইতিবাচক ধারার রাজনীতি থেকে কেউ যেন বঞ্চিত না করেন। বঞ্চিত করলে দায় তাদের।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, জাগপা মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি এটিএম মা'ছুম, সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিমসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
জেইউ/এএমকে