আদালতকে বিতর্কিত করে জুলাই সনদ অপ্রাসঙ্গিক করা হবে রাজনৈতিক-আইনি ভুল

যদি বিচার বিভাগের কাঁধে বন্দুক রেখে বিপ্লব-পরবর্তী চার্টারকে অপ্রাসঙ্গিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয় তাহলে তা হবে রাজনৈতিক ও আইনি ভুল। বিচার বিভাগকে বিতর্কিত করার এ ধরনের কর্মকাণ্ড করা সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির।
সোমবার (২ মার্চ) রাতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান।
সংবাদ সম্মেলনে রিট পিটিশন দুটি বিষয়ে অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, আজকে আদালতে দুটি রিট পিটিশন জারি করা হয়েছে। একটি রিট পিটিশনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ এবং সাংবিধানিক সংস্কার সভা গঠন এবং সংসদ সদস্য হিসেবে সংবিধান সংস্কার সভার শপথকে কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, এই মর্মে একটি রিট চেয়েছেন। যতোদিন পর্যন্ত রুল নিষ্পত্তি না হয়েছে ততোদিন পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার আদেশ চাওয়া হয়েছে।
অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, আরেকটি রিট পিটিশনে গণভোট অধ্যাদেশের ধারা-৩ এ যেখানে প্রশ্ন দেওয়া হয়েছে, সেই প্রশ্ন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না— এই মর্মে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে।
এই রিট পিটিশনে আইন মন্ত্রণালয়, সেক্রেটারি, কেবিনেট ডিভিশন; সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সেক্রেটারির ওপর নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছে, যেন এ বিষয়সংক্রান্ত কোনো পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ না করা হয়। এই রিটের ওপর শুনানি হয়েছে।
শিশির মনির বলেন, শুনানিতে আমরা যে কথাগুলো বলার চেষ্টা করেছি- প্রথমত, গণভোটের প্রশ্নকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। গণভোট তো হয়েই গেছে। প্রশ্নের ওপর মানুষ মতামত দিয়েই দিয়েছে। প্রশ্নে যখন ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দেওয়া হয়, তখন প্রশ্নকে চ্যালেঞ্জ করার অর্থ কী? এখন তো আর প্রশ্নকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে না; চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে গণভোটের ফলাফলকে। যদিও বলা হচ্ছে প্রশ্নকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন তো ইতোমধ্যে ফলাফলে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ ফলাফলকেই চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, জুলাই জাতীয় সনদ হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে, মাত্র কয়েকটি ভিন্নমত ছাড়া। যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে জারি করা হয়েছে, সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে- জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার ভিত্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সুপারিশ অনুযায়ী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি এ আদেশ জারি করেছেন। এই আদেশটিকেও তারা সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলে দাবি করছেন।
তিনি বলেন, এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। আর মাত্র ১০ দিন বাকি আছে সংসদ বসার। এতো তাড়াহুড়া করে দুজন আইনজীবীর মাধ্যমে এই রিট পিটিশন দায়ের করে- আসলে যারা দায়ের করেছেন তারা কী পেতে চান? আমি স্পষ্টভাবে সরকারের ইন্ধন দেখতে পেয়েছি। কোর্টে সরকারের ইন্ধন লক্ষ্য করেছি। আইনজীবীদের মধ্যেও সরকারের ইন্ধন দেখা যাচ্ছে। একটি সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য আছে- এই বিষয়টিকে আদালতে ‘সাব জুডিস’ বলে সংসদকে যেন কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত করা যায়।
শিশির মনির বলেন, আমরা আদালতে প্রশ্ন তুলেছি, ১০ দিন অপেক্ষা করে সংসদ যদি সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আদালতের হস্তক্ষেপের কোনো কারণ থাকে না। যেহেতু নভেম্বর মাসে আদেশ হয়েছে, এখন মার্চ মাস। এতদিন চ্যালেঞ্জ করার প্রয়োজন হয়নি, তাহলে ১২ মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করলে অসুবিধা কোথায়? এ প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি।
তিনি আরও বলেন, এটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন। ‘ডকট্রিন অব পলিটিক্যাল কোয়েশ্চন’ নামে একটি নীতি রয়েছে, যেখানে উচ্চমাত্রার রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয় আদালতের বিবেচনার বাইরে থাকে।
তিনি প্রশ্ন রাখেন— বাংলাদেশের অভ্যুত্থান কি আদালতের নিয়ম মেনে হয়েছে? আদালতের আদেশ মেনে কি বিপ্লব হয়েছে? অন্তর্বর্তী সরকার, গণভোট বা জাতীয় নির্বাচন- এসব কি আদালতের নির্দেশে হয়েছে?
তিনি বলেন, একটি ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো- তারা জাতীয় নির্বাচনের অংশটুকু চ্যালেঞ্জ করেন না; শুধু গণভোটের অংশটুকু চ্যালেঞ্জ করেন। অথচ গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে, পাশাপাশি ব্যালটে হয়েছে। আপনি যদি গণভোট অধ্যাদেশের-৩ নম্বর ধারা চ্যালেঞ্জ করেন, গণপরিষদ গঠন না করতে চান, তাহলে জাতীয় নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ করেন না কেন? জাতীয় নির্বাচন ঠিক থাকবে, কিন্তু গণভোট থাকবে না, জাতীয় নির্বাচনে ফলাফল ঠিক থাকবে, কিন্তু গণপরিষদ গঠন করা যাবে না! এমনটি কীভাবে সম্ভব? এতে বোঝা যায়, এই দুটি রিট পিটিশন ক্যালকুলেটিভ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
শিশির মনির বলেন, এগুলো কোনো না কোনো জায়গা থেকে, কেউ না কেউ একটা ডিজাইনকে ইমপ্লিমেন্ট করার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কিছু আইনজীবীকে ম্যানেজ করে এই রিট করা হয়েছে।
শিশির মনির উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আদালতের সামনে এগুলো উপস্থাপন করে অতীতে আদালতকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে, যা বুমেরাং হয়েছে। এটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এর সমাধান হওয়া উচিত। সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে গেলেও তা রাজনৈতিকভাবেই আলোচনার ভিত্তিতেই সরতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আজ যিনি বিচারক ছিলেন, তিনি এ সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত। বিচার বিভাগে নিয়োগ কমিশন গঠনের পর সেই আইনের অধীনে হাইকোর্টে দুই সেট বিচারক নিয়োগ হয়েছে। আজকের জুনিয়র বিচারকও সেই আইনের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত। যদি অভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ বা গণভোট কিছুই বৈধ না হয়, তাহলে ওই মাননীয় বিচারকের নিয়োগ কীভাবে বৈধ হবে? কোন জায়গায় তিনি অ্যাপয়নমেন্ট হবেন? আমি তো দেখছি এখানে তাড়াহুড়ো।
তিনি বলেন, কোনোভাবে বিপ্লবের চেতনা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বিষয়টিকে সংসদের পরিবর্তে আদালতের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংসদে না পাঠিয়ে আদালতে পাঠিয়ে এটাই বলার চেষ্টা করা হবে যে, কোর্ট এখানে বলেছে, সুতরাং আমাদের কিছু করার নাই। এই রকম মানসিকতা সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের এই বিশিষ্ট আইনজীবী প্রশ্ন রেখে বলেন, কেন শুধু গণভোট বাতিলের দাবি উঠছে? কেন জাতীয় নির্বাচন বাতিলের দাবি উঠছে না? মাঝখানে আরও ১৩৫টি অধ্যাদেশ রয়েছে, সেগুলোর কী হবে? তাহলে কি আমরা আবার ৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে যাব?
তিনি বলেন, যদি তাই করতে চান, তবে সবই বাতিল করুন। কিন্তু তখন তারা রাজি নন। অর্থাৎ যা সুবিধাজনক তা রাখা হবে, আর যা অসুবিধাজনক তা বাদ দেওয়া হবে- এমন মানসিকতা গ্রহণযোগ্য নয়। যদি বিচার বিভাগের কাঁধে বন্দুক রেখে বিপ্লব-পরবর্তী চার্টারকে অপ্রাসঙ্গিক করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয় তাহলে তা হবে রাজনৈতিক ও আইনি ভুল। বিচার হবে বিতর্কিত করার এ ধরনের কর্মকাণ্ড করা সঠিক নয়।
শিশির মনির বলেন, আদালতে যারা এই রিট মুভ করেছেন, তাদের জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন, ক্লায়েন্টের ইন্সট্রাকশন। পরবর্তী প্রশ্ন ক্লায়েন্ট কে? ক্লায়েন্ট দেখা যাচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের দুজন আইনজীবী। তারা কোন প্রেক্ষাপটে এখানে এসেছেন? জানতে চাইলে বলা হয়, আমাদের ক্লায়েন্ট আমাদের ইন্সট্রাকশন দিয়েছে। পেছনে গেলে দেখা যায়, যে বা যারা দ্বিতীয় শপথ নেননি, বা নিতে চাননি। দ্বিতীয় শপথ না নিয়ে এখানে এখানে একটা ক্যাওয়াজ বা ধ্রুমজাল সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন, জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশের পেছন দিকে যে শপথ আছে সেটা নিতে চাননি, বা নেননি তারাই এই মামলা মোকদ্দমা ও রিটের আইনজীবীদের ব্যাকিং হিসেবে কাজ করছেন। আদালত কি আদেশ দেবে সেটার জন্য আমাদের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জেইউ/এসএম