দেশের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে বর্তমান সরকার নির্লজ্জভাবে দলীয়করণ করছে অভিযোগ করে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, এটি কার্যত আরেকটি ফ্যাসিবাদ এবং ‘অলিখিত বাকশাল’ প্রতিষ্ঠার শামিল।
বিজ্ঞাপন
গুম প্রতিরোধ, বিচার বিভাগ ও স্থানীয় সরকারসংক্রান্ত বিতর্কিত কিছু বিল পাসের প্রতিবাদে জাতীয় সংসদ থেকে সাময়িক ওয়াকআউট করার পর বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) রাতে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি অভিযোগ করেন, বিগত স্বৈরাচারী শাসনের পতন হলেও তাদের অনুসৃত দমনমূলক নীতিগুলো এখনো বিদ্যমান।
সংবাদ সম্মেলনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আজকের অধিবেশনে এমন কিছু জনবিরোধী বিল উত্থাপন করা হয়েছে, যা সুস্পষ্টভাবে জনগণের অধিকার হরণ করে। আমরা এর প্রতিবাদ জানাতে চাইলে সংসদে আমাদের কথা বলার সুযোগ সীমিত করা হয়। বিরোধীদলীয় সদস্যদের জন্য মাত্র ২ থেকে ৬ মিনিট সময় বরাদ্দ করা হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা কোনো সময়সীমা ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছেন। স্পিকারের এ ধরনের ভারসাম্যহীন আচরণ সংসদীয় রীতির পরিপন্থী এবং এটি বিরোধী দলের কণ্ঠরোধের চেষ্টা।’
বিজ্ঞাপন
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করার অভিযোগ তুলে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘সরকার এমন সব বিল পাস করছে, যার মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ নির্বাহী বিভাগের হাতের মুঠোয় চলে যাচ্ছে। অতীতে এভাবেই দলীয় বিবেচনায় বিচারপতি নিয়োগ করে খায়রুল হক বা মানিকের মতো দলীয় বিচারপতিদের জন্ম দেওয়া হয়েছিল; শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ এনায়েতুর রহিমের জন্ম হয়েছে। বিচার বিভাগের নিয়োগ নির্বাহী বিভাগের হাতে থাকলে ভবিষ্যতেও একই দুর্ঘটনা ঘটবে এবং জনগণ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে।’
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বিচার বিভাগীয় নিরপেক্ষ অধ্যাদেশ বাতিল করে বর্তমান সরকার পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে গেছে। এর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করল, হাসিনা খারাপ হলেও হাসিনার নীতি ভালো। যে পদ্ধতি ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি তারা চান না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্থানীয় সরকারের জেলা পরিষদ, উপজেলা, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা সম্পর্কিত বিলগুলোর সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে বেপরোয়াভাবে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিএনপি তাদের সংস্কার প্রস্তাব ও ইশতেহারে বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া প্রশাসক বসানো যাবে না বললেও, এখন কী কারণে বসানো হলো তার সুস্পষ্ট জবাব তারা দিতে পারেনি। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরে এই নির্লজ্জ দলীয়করণ মূলত অলিখিত ফ্যাসিজম ও বাকশাল।’
বিজ্ঞাপন
দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, তারা জনগণের পক্ষে আছেন। সংসদ বর্জন না করে অধিকারের পক্ষে সংসদে কথা বলবেন। তবে জনস্বার্থবিরোধী আইন পাস হলে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হবে।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত শেরপুর ও বগুড়া উপনির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘৯৪ সালে মাগুরায় যে কলঙ্কিত নির্বাচন হয়েছিল, আজ বগুড়া ও শেরপুরে একই স্টাইল দেখা গেছে। দলীয় সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, তা আবারও প্রমাণিত হলো। শেরপুর-৩ আসনে আমাদের একজন সহকর্মী, উপজেলা সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে হত্যা করা হয়েছে। আজও আরেকজনকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা খুনিদের বিচার দাবি করছি।’
বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এত দিন পর্যন্ত বিএনপির সমস্ত ভুলই ছিল মানুষকে ধোঁকা দেওয়া ও প্রতারণা করা। আমরা ফ্যাসিবাদকে মেনে নেব না। ভবিষ্যতে কেউ নতুন করে ফ্যাসিবাদ বা বাকশাল কায়েম করতে চাইলে জনগণকে সাথে নিয়ে তা রুখে দেওয়া হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, একটি বিশেষ কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই হওয়া ৯৮টি অধ্যাদেশের মধ্যে গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ, স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য বিচার বিভাগ সচিবালয় এবং মানবাধিকারবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো সরকার বাতিল করে দিচ্ছে। স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত অনেকগুলো অধ্যাদেশ বিরোধী দলের যৌক্তিক আপত্তি সত্ত্বেও আইনে পরিণত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আজকে এর কয়েকটি অধ্যাদেশ, যেগুলো নিয়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল, সেগুলো উপস্থাপন করা হলেও সরকারের মন্ত্রীদের কাছ থেকে আমরা সুস্পষ্ট কোনো জবাব পাইনি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ করে তারা সংবিধানবিরোধী অবস্থান নিচ্ছে। এর প্রতিবাদেই মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতার নেতৃত্বে আমরা সাময়িক ওয়াকআউট করতে বাধ্য হয়েছি।’
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামী ও বিরোধী জোটের শীর্ষস্থানীয় সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তারা একযোগে সরকারের এই ‘গণবিরোধী’ অবস্থানের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
জেইউ/বিআরইউ
