গ্রিসে তালাবদ্ধ এজেন্সি, প্রবাসীদের ঘাম ঝরানো অর্থ এখন অনিশ্চয়তায়

প্রবাস থেকে বেশিরভাগই বিভিন্ন মানি ট্রান্সফার এজেন্সির মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে পরিবার ও দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। কিন্তু গ্রিসে তিন শতাধিক প্রবাসীর সেই কষ্টার্জিত অর্থই দেড় মাস ধরে আটকে রেখেছে দেশটিতে অবস্থিত বাংলাদেশ ন্যাশনাল ব্যাংকের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘এনবিএল মানি ট্রান্সফার এসএ’। এরই মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে প্রতিষ্ঠানে ঝুলছে তালা। এতে চরম হতাশায় রয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগীদের একজন গ্রিস প্রবাসী মোহাম্মদ ইসলাম। তার স্ত্রী অসুস্থ অবস্থায় ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য জরুরিভাবে ২ হাজার ইউরো বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ লাখ টাকা পাঠান গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের ওমোনিয়ায় অবস্থিত ‘এনবিএল’ মানি ট্রান্সফার এজেন্সির ‘এনবিএল কুইক পে’র মাধ্যমে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসের ২১ তারিখে পাঠানো এই রেমিট্যান্স এখনো পৌঁছায়নি ইসলামের পরিবারের অ্যাকাউন্টে। প্রতিষ্ঠানটিতে বারবার গিয়েও কোনো সদুত্তর পাননি এই রেমিট্যান্স যোদ্ধা।
ওই প্রতিষ্ঠানের একটি সূত্র বলছে, গত বছরের ২৫ নভেম্বর থেকে মোহাম্মদ ইসলামের মতো তিন শতাধিক প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স এখনো দেশে পরিবারের অ্যাকাউন্টে পৌঁছায়নি। এ নিয়ে দূতাবাসেও লিখিত অভিযোগ করেছেন বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী। এসব ভুক্তভোগীর তালিকায় রয়েছেন দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীও। অনেকের ধারণা, আটকে থাকা টাকার পরিমাণ অন্তত ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা হবে। বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর রেমিট্যান্স প্রেরণের রশিদ যাচাই করে দেখা গেছে, প্রত্যেকের পাঠানো অর্থের পরিমাণ দুই থেকে তিন লাখ টাকার বেশি।
প্রবাসীদের দাবি, কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত এই অর্থ নিয়ম মেনে বৈধ পথে পাঠিয়ে এতদিনেও তারা কোনো সমাধান পাচ্ছেন না। উল্টো গত কয়েকদিন ধরে সংশ্লিষ্ট মানি ট্রান্সফার এজেন্সিটিতে তালা ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। এতে চরম দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন প্রবাসীরা।
অনেকেই পরিবারের একমাত্র ভরসা। দেশে থাকা মা-বাবার চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা, সংসারের নিত্য খরচ– সবই নির্ভর করে এই রেমিট্যান্সের ওপর। কিন্তু তাদের এই অর্থ আটকে থাকায় দেশে থাকা স্বজনরাও পড়েছেন বেকায়দায়।
ভুক্তভোগী প্রবাসী রফিক মিয়া জানান, ‘কষ্ট করে কাজ করি শুধু পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। দেশের বাড়িতে বাবা অসুস্থ, চিকিৎসার জন্য টাকা পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু দেড় মাস হয়ে গেল, টাকা পৌঁছায়নি। এখন ফোন করলে বাড়ির লোকের নানা কথা শুনতে হয়।’
আরেক প্রবাসী শরিফের ভাষায়, ‘আমরা কেউ বড় লোক না। মাস শেষে বেতন পাঠাই দেশে। সেই টাকাই যদি এভাবে আটকে যায়, তাহলে বিদেশে থাকার মানে কী? এজেন্সিতে গেলে দরজা বন্ধ, কারও কোনো খোঁজ নেই।’
প্রবাসী কবির মিয়ার অভিযোগ, শুরুতে বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হলেও এখন এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগই করা যাচ্ছে না। এতে অনেকের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, টাকা আদৌ ফেরত পাবেন কি না তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় আছেন তারা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে এনবিএল মানি ট্রান্সফার এজেন্সিতে গিয়ে দেখা যায় সেখানে তালা ঝুলছে। প্রতিষ্ঠানের ইনচার্জ এস এম রনির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে হোয়াটসঅ্যাপে এক বার্তায় তিনি জানান, ‘গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি নেই।’
এ ব্যাপারে গ্রিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছেন।
এদিকে সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে প্রবাসীদের হতাশা ও ক্ষোভ। তাদের দাবি, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে আটকে থাকা কষ্টার্জিত অর্থ উদ্ধার করা হোক, যাতে বিদেশের মাটিতে ঘাম ঝরানো মানুষগুলো অন্তত পরিবার নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে।
এসএসএইচ