মাদ্রিদের সঙ্গে মিশে আছে ইসলামী ঐতিহ্যের যে অজানা ইতিহাস

অনেকেই জানেন না স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের অতীত ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে ইসলামী ইতিহাস ও ঐতিহ্য। স্থানীয় এক তরুণ ও সামাজিক কর্মী হাচিম উলাদ মুহাম্মাদ একদিন প্রাচীন ইতিহাসের নিয়ে লেখা একটি আরবি বই পড়তে গিয়ে জানতে পারেন, মাদ্রিদের গোড়াপত্তনই হয়েছিল মুসলিম শাসনামলে।
এই তথ্য তাকে বিস্মিত ও ইতিহাস জানতে আগ্রহী করে। বিস্তাররিত জানতে তিনি অনুসন্ধানে নামেন। অনুসন্ধানে যে তথ্য জানতে পারেন তা তাকে গর্বিত ও কিছুটা বেদনাহত করে।
৩৬ বছর বয়সী এই সামাজিক কর্মী বলেন, ‘মাদ্রিদের ইতিহাসে ইসলাম কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, স্পেনের মানুষ আসলে তা জানেই না।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের অতীত শুধু সংঘাত ও রক্তপাতের নয়। আমাদের অতীত ছিল পারস্পরিক সহাবস্থান, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির এমন এক মেলবন্ধন, যা আজকের স্প্যানিশ সমাজে প্রায় অনুপস্থিত।’
মায়রিত : ইসলামী মাদ্রিদের বিস্মৃত নাম
খ্রিষ্টীয় ৭১১ থেকে ১৪৯২ সাল পর্যন্ত মুসলিম শাসনের অধীনে থাকা আল-আন্দালুস ছিল ইউরোপের এক অনন্য সভ্যতার নগরী। বর্তমান স্পেন ও পর্তুগালের বেশিরভাগ অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত ছিল।
খ্রিষ্টীয় ৮৬৫ সালের দিকে উমাইয়া আমির মুহাম্মাদ প্রথম ‘মায়রিত’ নামে একটি দুর্গনগর প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই পরবর্তীতে মাদ্রিদ নামে পরিচিত হয়। আরবি মাইয়া শব্দ থেকে শহরের নাম রাখা হয়, যার অর্থ, ভূগর্ভস্থ পানিপথ।
আরও পড়ুন
১১শ শতাব্দীর শেষ দিকে খ্রিষ্টানরা মায়রিত দখল করে। এরপরও ১৬০৯ সালে স্পেন থেকে মুসলিম নির্বাসন শুরুর আগ পর্যন্ত এখানে মুসলমানরা বসবাস করতেন।
প্লাজা দে লা ভিলায় একটি মুদেজার খিলান
সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসনের ফলে স্পেনে মুসলিম জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ লাখে। যাদের বড় অংশ মরক্কো থেকে আগত, বাকিরা আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া, সেনেগাল ও পাকিস্তান থেকে এসেছেন। বর্তমানে শুধু মাদ্রিদেই বসবাস করছেন প্রায় তিন লাখ মুসলমান।
এখনো টিকে আছে ইসলামী স্থাপত্যের ছাপ
মাদ্রিদের প্রাচীনতম স্কয়ার প্লাজা দে লা ভিলা-তে এখনো টিকে আছে ‘মুদেখার’ শৈলীর কয়েকটি ভবন। এই মুদেখার ধারা মূলত ইউরোপীয় স্থাপত্যে ইসলামী নকশা ও সৌন্দর্য যুক্ত করার মাধ্যম ছিল।
এক সময় মুসলমানদের নির্মিত ‘আলকাসার’ দুর্গের ওপর ছিল শহরের রাজপ্রাসাদ (রয়্যাল প্যালেস)। এটি ১৭৩৪ সালে আগুনে ধ্বংস হয়।
ইতিহাস পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাদ্রিদের ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে স্পেনের ইসলামিক কালচার ফাউন্ডেশন। সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এনকার্না গুতিয়েরেজ বলেন, স্পেনকে তার বহুমাত্রিক ঐতিহ্য স্বীকার করতে হবে, আর শিক্ষার মাধ্যমেই তা সম্ভব।
তারা ২০১৭ সালে মাদ্রিদের কমপলুতেন্সে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মিলে গড়ে তোলেন ইসলামিক মাদ্রিদ গবেষণা কেন্দ্র। এখানে ইসলামী যুগের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করা হয়।
এই কেন্দ্রটি শহরের এমন সব ইসলামী স্থাপনা অনুসন্ধানের চেষ্টা করে যেখানে দৃশ্যমান কোনো স্থাপনা না থাকলেও এখনো লুকিয়ে আছে ইতিহাসের গন্ধ।
মিথের মাঝে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের খোঁজ
গবেষকদের মতে, মাদ্রিদের ইসলামী ইতিহাস হারিয়ে যাওয়ার দুটি কারণ আছে। প্রথমত, ১৫৬১ সালে রাজা ফিলিপ দ্বিতীয় যখন মাদ্রিদকে স্পেনের রাজধানী ঘোষণা করেন, তখন ইউরোপীয় খ্রিষ্টান সাম্রাজ্যের প্রতীকী রাজধানী গড়ার লক্ষ্যে শহরের মুসলিম ঐতিহ্য মুছে ফেলা হয়।
তখন ইসলামী অধ্যায়কে বাদ দিয়ে নানা বীরত্বগাথা তৈরি করা হয়। এর ফলে পরবর্তী প্রজন্ম ভুলে যায় মাদ্রিদের আল-আন্দালুস অধ্যায়।
দ্বিতীয় কারণ, দৃশ্যমান নিদর্শনের অভাব। দক্ষিণের কর্ডোভা ও গ্রানাডায় যেমন ইসলামী স্থাপত্য চোখে পড়ে, মাদ্রিদে তা প্রায় বিলুপ্ত। তাই ইতিহাস জানতে হলে গল্পের ভেতর দিয়েই খুঁজে নিতে হয় সেই অতীত।
পরিবর্তন আসছে ধীরে ধীরে
২০১৫ সালের নির্বাচনে বামপন্থী জোট শহরে ক্ষমতায় আসার পর ইসলামিক ঐতিহ্যের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে। এখন মাদ্রিদে ইসলামিক হেরিটেজ ট্যুর, হালাল পর্যটন ও নানা গবেষণা কার্যক্রম চলছে।
২০১৪ সালে সাংবাদিক রাফায়েল মার্তিনেজ ‘ইসলামিক মাদ্রিদ’ ঘিরে ট্যুর চালু করেন। তার মতে, মানুষ এখন তাদের শহরের মূল শেকড় সম্পর্কে জানতে চায়।
এছাড়া স্থানীয় প্রতিষ্ঠান নুর অ্যান্ড দুহা ট্রাভেলস এখন মুসলিম পর্যটকদের জন্য মাদ্রিদের ইসলামী ঐতিহ্যভিত্তিক ভ্রমণ আয়োজন করছে।
‘অতীতকে আপন করে নিতে হবে’
স্পেনের ইসলামিক কালচার ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক গুতিয়েরেজ বলেন, বিশ্বজুড়ে যেভাবে ইসলাম ফোবিয়া ছড়িয়ে পড়ছে, স্পেনেও এর প্রভাব পড়ছে। তাই এই ইতিহাস পুনরুদ্ধারের সময় এখনই।
গবেষক ড্যানিয়েল গিল-বেনুমেয়া বলেন, ইসলামী ঐতিহ্য আমাদেরই ইতিহাসের অংশ, তাই একে ‘অন্য’ কিছু হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে।
মাদ্রিদের মুসলিম অধিবাসী অরোরা আলির চোখে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতের আশার প্রতীক। তিনি বলেন, মানুষ যেন তাদের শেকড় সম্পর্কে জানতে পারে, তাই আমরা সত্যটা জানাতে চাই। একদিন হয়তো এই ইতিহাসকে ‘বিদেশি’ মনে না করে আমাদের এই শহরেরই অংশ হিসেবে মনে করা হবে।
সূত্র : মিডল ইস্ট মনিটর
এনটি
