মহানবীকে (সা.) বিজয়ের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছিল যে সুরায়

সুরা নাসর মাত্র তিন আয়াতের ছোট একটি সুরা। তবে এর ভেতর লুকিয়ে আছে ইসলামের ইতিহাসের এক যুগান্তকারী অধ্যায়, নবীজির (সা.) দাওয়াতি জীবনের পরিপূর্ণতা এবং বিজয়ের পর মানুষের করণীয় সম্পর্কে গভীর শিক্ষা। তাফসিরকারদের মতে, এই সুরা শুধু মক্কা বিজয়ের সুসংবাদই দেয়নি, ইঙ্গিত করেছে রাসুলুল্লাহর (সা.) দুনিয়ার মিশন সমাপ্তির দিকেও।
সুরা নাসর মদিনায় অবতীর্ণ হয়। ইমাম নাসাঈসহ অনেক আলেমের মতে, এটি নাজিল হওয়া শেষ সুরাগুলোর একটি। আয়াত সংখ্যা কম হলেও এর তাৎপর্য ব্যাপক। এতে একদিকে ইসলামের ভবিষ্যৎ বিজয়ের বার্তা রয়েছে, অন্যদিকে এমন একটি ‘সংকেত’-এর কথা বলা হয়েছে, যা দেখা মাত্র নবীজি (সা.) বুঝে নেবেন তার দায়িত্বের সময় প্রায় শেষ।
ইমাম ইবনে কাসির ও অধিকাংশ তাফসিরকার বলেন, সুরা নাসর মূলত রাসুলুল্লাহর (সা.) ইন্তেকালের নিকটবর্তী হওয়ার সংবাদ বহন করে। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে তার রাসুলকে জানিয়ে দেওয়া যে তার জীবনের শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে। বুখারিতে এ হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
আরেক বর্ণনায় এসেছে, জীবনের শেষ দিকে নবীজি (সা.) ঘন ঘন এই দোয়া পড়তেন, সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আমি তার কাছে ক্ষমা চাই এবং তার কাছেই তাওবা করি।
তিনি বলতেন, আমার প্রতিপালক আমাকে জানিয়েছেন, আমার উম্মতের মধ্যে আমি একটি নিদর্শন দেখতে পাব। আর যখন তা দেখব, তখন যেন আল্লাহর প্রশংসা করি, তার পবিত্রতা ঘোষণা করি এবং ক্ষমা চাই।
এরপর তিনি সূরা নাসরের আয়াতগুলো তিলাওয়াত করতেন, যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে, আর মানুষ দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করতে থাকবে, তখন তোমার প্রতিপালকের প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করো এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি তাওবা কবুলকারী।
মক্কা বিজয়ের পূর্বাভাস
আলেমদের মতে, এই সুরায় যে বিজয়ের কথা বলা হয়েছে, তা মূলত মক্কা বিজয়কেই নির্দেশ করে। আরবের অনেক গোত্র মক্কা বিজয়ের আগে ইসলাম গ্রহণে দ্বিধায় ছিল। তারা বলত, মুহাম্মদ (সা.) যদি নিজের কওমের ওপর বিজয়ী হন, তবে তিনি সত্য নবী।
অবশেষে যখন মক্কা বিজয় হলো, তখন দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। মাত্র দুই বছরের মধ্যেই পুরো আরব উপদ্বীপ ইসলামের পতাকাতলে আসে।
এভাবেই সুরা নাসর একদিকে বিশাল পরিবর্তনের সুসংবাদ দেয়, অন্যদিকে নবীজিকে (সা.) জানিয়ে দেয় তার দুনিয়ার দায়িত্ব প্রায় শেষের পথে।
বিজয়ের পর কী করতে হবে?
এই সুরায় নবীজিকে (সা.) একটি নির্দিষ্ট পথনির্দেশও দেওয়া হয়েছে, বিজয় এলে অহংকার নয়, বরং আল্লাহর প্রশংসা, তার পবিত্রতা ঘোষণা এবং ক্ষমা প্রার্থনা।
আয়াতে বলা হয়েছে, বিজয় ও সাহায্য একান্তই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। তিনি যখন চান, যেভাবে চান, যাকে দিয়ে চান, বিজয় দান করেন। নবীজি (সা.) ও মুমিনরা শুধু সেই কাজে মাধ্যম হওয়ার সম্মান লাভ করেন।
তাই বিজয়ের পর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা জরুরি। কারণ মানুষের মনে তখন অহংকার, আত্মতৃপ্তি কিংবা অন্যদের তুচ্ছ করার অনুভূতি জন্ম নিতে পারে। আবার দীর্ঘ সংগ্রামের সময় কেউ হতাশাও হয়ে পড়তে পারে। এসবের জন্যও ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত।
ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে মানুষ নিজের দুর্বলতা উপলব্ধি করে এবং মনে রাখে, সে নিখুঁত নয়, বরং সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছাতেই ঘটে।
নবীজি (সা.) এই শিক্ষা বাস্তবে দেখিয়েছেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি উটের পিঠে চড়ে নগরে প্রবেশ করেছিলেন মাথা নিচু করে, বিনয়ের সঙ্গে। শত্রুদের দীর্ঘ দিনের নির্যাতনের কথা ভুলে গিয়ে তিনি ব্যস্ত ছিলেন আল্লাহর প্রশংসা, তাসবিহ ও ইস্তেগফারে।
শেষ কথা
আল্লাহ যখন কাউকে বিজয় দেন, হোক তা কোনো সংকটে সাফল্য, অপবাদ থেকে মুক্তি, হারানো সম্মান ফিরে পাওয়া বা অন্যায়ের প্রতিকার, তখন কর্তব্য একটাই: আল্লাহর প্রশংসা করা, তার মহিমা ঘোষণা করা এবং নিজের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চাওয়া।
কারণ সবকিছুর মালিক আল্লাহ। তিনি যাকে চান সম্মান দেন, যাকে চান পরীক্ষায় ফেলেন এবং সব সৃষ্টিকে পরিচালনা করেন তাঁরই ইচ্ছায়।
বিজয়ে অহংকার নয়, বরং কৃতজ্ঞতা ও বিনয়—এই শিক্ষাই সুরা নাসরের মূল বার্তা।
এনটি