কোরআন তিলাওয়াতের প্রকৃত অর্থ কী?

অনেকে মনে করেন কোরআন তিলাওয়াত মানে শুধু আরবি অক্ষর উচ্চারণ করে পড়া। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে তিলাওয়াতের অর্থ আরও গভীর, আরও ব্যাপক। এতে জড়িয়ে আছে বোঝা, কোরআনের নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার পাথেয় খোঁজা।
কোরআন পাঠকে তিলাওয়াত করা বলা হয়। তিলাওয়াতের মূল অর্থ হলো, ধারাবাহিকভাবে প্রবাহিত হওয়া, কোনো কিছুর অনুসরণ করা, পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করা, নেতা ও আদর্শ হিসেবে মানা, কর্তৃত্ব স্বীকার করা, কোনো উদ্দেশ্যের পক্ষে দাঁড়ানো, সে অনুযায়ী কাজ করা, সেই পথে চলা, একটি জীবনব্যবস্থা বাস্তব জীবনে চর্চা করা এবং চিন্তার ধারাকে অনুসরণ করা। সংক্ষেপে বললে, তিলাওয়াত মানে শুধু পড়া নয়, বরং অনুসরণ করা।
যারা কোরআনের প্রতি ঈমানের দাবি রাখে, কোরআনের সঙ্গে তিনটি স্তরে তাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১. কোরআন পড়া, ২. কোরআন বোঝা এবং ৩. কোরআনের অনুসরণ করা।
এরমধ্যে তিলাওয়াত এমন একটি ইবাদত, যেখানে মানুষের পুরো সত্তা অর্থাৎ, আত্মা, হৃদয়, মন, জিহ্বা ও দেহ সব অংশ নেয়। অন্য কথায়, মানুষের সম্পূর্ণ অস্তিত্ব এতে জড়িয়ে পড়ে। কোরআন পড়ার সময় মন ও শরীর, যুক্তি ও অনুভূতি আলাদা থাকে না; সব এক হয়ে যায়।
জিহ্বা যখন আয়াত উচ্চারণ করে, ঠোঁট দিয়ে শব্দ প্রবাহিত হয়, তখন মন চিন্তা করে, হৃদয় গভীরভাবে অনুভব করে, আত্মা গ্রহণ করে নেয়। চোখে পানি চলে আসে, হৃদয় কেঁপে ওঠে, শরীর শিহরিত হয়, মন নরম হয়ে যায়। তখন আর ভেতর-বাহিরের কোনো বিভাজন থাকে না। এমনকি শরীরের লোমও খাড়া হয়ে যেতে পারে। কোরআনে বলা হয়েছে, এটাই আল্লাহর নূর ও হেদায়েত, যার মাধ্যমে তিনি যাকে চান পথ দেখান।
এইভাবে কোরআন পড়া সহজ কোনো কাজ নয়, আবার অসম্ভবও নয়। যদি অসম্ভব হতো, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য কোরআন নাজিলই হতো না, আর এটি রহমত ও পথনির্দেশক গ্রন্থ হিসেবেও পরিচিত হতো না।
তবে এটি যে সহজ পথ নয়, সেটাও সত্য। এতে মন ও হৃদয়ের পরিশ্রম লাগে, আত্মা ও বিবেকের সাধনা লাগে, চিন্তা ও শরীরের প্রস্তুতি লাগে। কিছু শর্ত মানতে হয়। এরম্যধে কিছু র্শত ভেতরের, কিছু বাহিরের। কোরআনের মহিমান্বিত জগতে প্রবেশের আগে এগুলো জানা ও পালনের চেষ্টা করা জরুরি।
তবেই মানুষ কোরআনের বরকতের পূর্ণ ফল পেতে পারে। তখনই কোরআন তার দরজা খুলে দেয়। তখন কোরআন মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে এবং মানুষ কোরআনের ভেতরে বাস করতে শুরু করে।
এক ফোঁটা পানি থেকে একটি শিশুর পূর্ণ মানব হতে ৯ মাস সময় লাগে। মাতৃগর্ভে ৯ মাসে একটি শিশু শোনা, বোঝা ও দেখার ক্ষমতা লাভ করে। ঠিক তেমনি কোরআনের সঙ্গে গভীর হতে একজন মানুষের দীর্ঘ দিন সময় লাগে। এবং যখন সময় দিয়ে কোরআন তিলাওয়াত ও কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হবে তখন তা মানুষের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত করবে। এভাবে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারলে তা একজন মানুষকে এমন আদর্শবান হিসেবে পরিণত করবে যার সামনে ফেরেশতারাও গর্বের সঙ্গে মাথা নত করতে পারে।
কোরআনের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত মানুষকে উচ্চ থেকে উচ্চতর মর্যাদায় পৌঁছাতে থাকে। কোরআনের ভেতরে যে শক্তি ও সৌন্দর্য তা মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেন, কোরআনের সঙ্গীকে বলা হবে, পড়তে থাকো এবং ওপরে উঠতে থাকো। দুনিয়ায় যেভাবে সুন্দরভাবে পড়তে, সেভাবেই পড়ো। জান্নাতে তোমার চূড়ান্ত অবস্থান হবে সেই আয়াত পর্যন্ত, যেখানে তোমার তিলাওয়াত শেষ হবে।
এই হাদিসের মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে, তিলাওয়াত শুধু উচ্চারণ বা কণ্ঠে কোরআন পড়া নয় বরং জীবনের প্রতিটি ধাপে কোরআনকে সঙ্গী করে নেওয়ার নামই কোরআন তিলাওয়াত।
এনটি