মুসা (আ.)-এর জীবন থেকে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

কোরআনে নবীদের ঘটনা সাধারণত দুই উদ্দেশ্যে বর্ণিত হয়েছে। প্রথমত, ইতিহাসের ধারাবাহিকতা তুলে ধরা। যাতে বোঝা যায়, ইসলাম কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্ম নয়; বরং আদম ও হাওয়া আ.-এর সময় থেকে শুরু হওয়া আল্লাহর একত্ববাদের শেষ অধ্যায়।
দ্বিতীয়ত, নবীদের ব্যক্তিগত জীবন, সংগ্রাম ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে মানবজাতির জন্য নৈতিক শিক্ষা প্রদান।
হজরত মুসা (আ.) সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার সৌভাগ্য অর্জন করেন। ইহুদি ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতেও তিনি এক কেন্দ্রীয় চরিত্র। তার জীবনের বিভিন্ন ঘটনায় লুকিয়ে আছে সময়ের ঊর্ধ্বে থাকা কিছু শিক্ষা।
শিক্ষা এক : আপনজন ও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে জীবনের দীর্ঘ যাত্রা
হজরত মুসা আ.-এর জীবনের শুরুই ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। প্রাণনাশের আশঙ্কায় মা তাকে নদীতে ভাসিয়ে দেন। পরবর্তীতে তিনি আশ্রয় পান ফেরাউনের ঘরে। তাকে আশ্রয় দেওয়া ফেরাউন ভবিষ্যতে তার শত্রুতে পরিণত হয়। রাজপ্রাসাদের আরামে বড় হলেও তিনি কখনো নিজেকে পুরোপুরি সেখানে মানিয়ে নিতে পারেননি।
মাদইয়ানে গিয়ে নতুন জীবনের সূচনা হলে প্রথমবারের মতো তিনি আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করেন। কিন্তু সেই স্থায়িত্বও দীর্ঘ হয়নি। আল্লাহর নির্দেশে তাকে আবার ফেরাউনের সামনে তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে মিসরে ফিরতে হয়।
অবশেষে বনি ইসরাইলকে মুক্ত করে তিনি তার পরিবার ও জাতিকে খুঁজে পান।
এই ঘটনাগুলো আমাদের শেখায়, জীবনে কোথায় আপনি নিজের বলে কাউকে পাবেন, কোথায় আপনার হৃদয়ের ঠিকানা হবে, তা একদিনে ঠিক হয় না। কখনো দেশ, কখনো পরিবেশ, কখনো সম্পর্ক বদলাতে হয়। আপনজন খুঁজে পাওয়ার এই পথচলাই জীবনের বড় বাস্তবতা।
শিক্ষা দুই: সঠিক কাজ সব সময় সহজ হয় না
সুরা তাহা-তে বর্ণিত হজরত মুসা আ. ও ফেরাউনের কথোপকথন থেকে পাওয়া যায় দ্বিতীয় বড় শিক্ষা। ফেরাউন তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, তোমার প্রভু কে? উত্তরে মুসা আ. বলেছিলেন, তিনি সেই সত্তা, যিনি সবকিছুকে সৃষ্টি করে পথনির্দেশ দিয়েছেন।
ফেরাউন তর্কে নামেন, আগের প্রজন্মের পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তখন মুসা আ. দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, তাদের জ্ঞান আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত, তিনি ভুল করেন না, ভুলেও যান না।
পরবর্তীতে ফেরাউন জাদুকরদের দিয়ে শক্তি প্রদর্শন করলেও কোরআনে বলা হয়েছে, এক মুহূর্তের জন্য মুসা আ.-এর মনে ভয় এসেছিল। তখন আল্লাহ তাকে সান্ত্বনা দেন, ভয় পেয়ো না, জয় তোমারই হবে।
এখানেই লুকিয়ে আছে বড় শিক্ষা। সঠিক পথে চলা মানেই যে তা সহজ হবে, এমন নয়। এমনকি একজন নবীকেও সন্দেহ, ভয় ও চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। কিন্তু সত্য জানার পর সেই সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহসই মানুষকে আলাদা করে।
শিক্ষা তিন : জ্ঞানীদের ঊর্ধ্বেও আছেন আরও জ্ঞানী
হজরত মুসা আ.-এর জীবনের সবচেয়ে গভীর শিক্ষাগুলোর একটি আসে খিজির আ.-এর সঙ্গে সাক্ষাতের ঘটনায়। কোরআনে নাম উল্লেখ না থাকলেও তিনি আল্লাহর এক বিশেষ বান্দা হিসেবে পরিচিত।
এই সফরে মুসা আ. দেখেন, খিজির আ. একটি নৌকা ক্ষতিগ্রস্ত করছেন, একটি বালককে হত্যা করছেন এবং এক রূঢ় গ্রামে একটি দেয়াল মেরামত করছেন।প্রতিটি কাজই তার কাছে অন্যায় মনে হয়। কিন্তু শেষে খিজির আ. ব্যাখ্যা দেন, নৌকাটি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছিল গরিব মালিকদের রক্ষা করতে, বালকটি বড় হয়ে জালিম ও অবিশ্বাসী হতো, আর দেয়ালের নিচে ছিল এতিমদের ধনভাণ্ডার।
এখান থেকে বোঝা যায়, মানুষের জ্ঞান সীমিত। পরিস্থিতির সব দিক আমাদের জানা থাকে না। কোরআনের ভাষায়, প্রত্যেক জ্ঞানীর ওপর আছেন আরও জ্ঞানী।
এই শিক্ষা আমাদের বিনয়ী হতে শেখায়, সব বিষয়ে মন্তব্য করার আগে থামতে শেখায়। কখনো কখনো ‘আমি জানি না’ বলা সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞার পরিচয়।
হজরত মুসা আ.-এর জীবনের এই তিন শিক্ষা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
এনটি