মসজিদ শুধু নামাজ পড়ার স্থান নয় বরং মুসলিমদের সামাজিক কেন্দ্র। আধুনিক পরিভাষায় বলতে গেলে, মসজিদ হলো একটি পূর্ণাঙ্গ কমিউনিটি সেন্টার বা সামাজিক কেন্দ্র। বর্তমান সময়ে মুসলিম উম্মাহর যে স্থবিরতা, তা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হলে মসজিদের প্রকৃত ভূমিকা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি।
বিজ্ঞাপন
কোন কাজটি মসজিদের ভূমিকার অন্তর্ভুক্ত আর কোনটি নয়, তা বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগের আদর্শ ও ঐতিহ্যের দিকে তাকানো। নবুয়তের সেই সোনালী সময়ে মসজিদে নববীর কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে মসজিদের সাতটি প্রধান ভূমিকা প্রকাশ পায়।
১. সবার জন্য নামাজের অবারিত স্থান
নবীজির যুগে মুসলিমদের প্রতিদিন পাঁচবার একত্রিত হওয়ার প্রধান কেন্দ্র ছিল মদিনার মসজিদে নববী। বর্তমানে সারা বিশ্বের মসজিদগুলো শুধু এই একটি ভূমিকাই পালন করছে। তবে বর্তমানের সাথে তখনকার একটি বড় পার্থক্য ছিল। মহানবী (সা.)-এর মসজিদ ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত—সেখানে পুরুষ, নারী, বৃদ্ধ, শিশু এবং আরব-অনারব সবার সমান অধিকার ছিল।
বিজ্ঞাপন
সহিহ বুখারি ও মুসলিমের একাধিক হাদিস এর প্রমাণ দেয়। অথচ বর্তমানে অধিকাংশ মসজিদে নারীদের প্রবেশের অনুমতি নেই। এমনকি কোথাও নামাজের জায়গা থাকলেও তা পুরুষদের তুলনায় বেশ অবহেলিত থাকে। কিন্তু নবীজির আমলে দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন। পর্দার বিধান মেনে নারীরা মসজিদে যেতেন।
রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের কয়েক দশক পর নারীদের মসজিদে আসা বন্ধ করা হয়, যদিও অনেক সাহাবী আল্লাহর দাসীদের আল্লাহর ঘরে আসতে বাধা না দেওয়ার হাদিস বর্ণনা করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
২. সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র
বিজ্ঞাপন
নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও হৃদ্যতা তৈরির জায়গা ছিল মসজিদ। কোনো সাহাবী একদিন বা দুই দিন মসজিদে না এলে নবীজি (সা.) তার খোঁজ নিতেন। কেউ অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যেতেন এবং অভাবগ্রস্ত হলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন।
৩. দাওয়াত বা ইসলাম প্রচারের স্থান
রাসুল (সা.)-এর সময়ে যারা ইসলাম সম্পর্কে জানতে চাইতেন, তাদের জন্য মসজিদই ছিল প্রথম গন্তব্য। অমুসলিমদের মসজিদে প্রবেশে কোনো বাধা ছিল না। অথচ বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে অমুসলিমদের মসজিদে আসার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা হয়।
৪. আনন্দ ও উৎসবের স্থান
মহানবী (সা.) বিয়ের খবর প্রচার করতে এবং মসজিদের মতো পবিত্র জায়গায় বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করার পরামর্শ দিতেন। এছাড়া ঈদের দিনে মসজিদে আনন্দ উৎসবের আমেজ থাকত। আম্মাজান আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, আবিসিনিয়ার কিছু মানুষ মসজিদে বর্শা নিয়ে কসরত বা খেলাধুলা করত এবং তিনি নিজে রাসুল (সা.)-এর পাশে দাঁড়িয়ে তা উপভোগ করতেন।
৫. সভা ও পরামর্শের কেন্দ্র
গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বা সামাজিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহাবীদের মসজিদে একত্র করতেন মহানবী (সা.)। সেখানে সবার সাথে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হতো।
৬. চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র
ইসলামী সভ্যতায় আধুনিক হাসপাতাল গড়ে ওঠার অনেক আগে যুদ্ধের আহত বা অসুস্থদের চিকিৎসার আশ্রয়স্থল ছিল মসজিদ। মসজিদে নববীতে তাঁবু খাটিয়ে আহতদের সেবা দেওয়ার নজির রয়েছে।
৭. শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র
যাদের অক্ষরজ্ঞান ছিল না, তারা মসজিদে নববীতে পড়তে ও লিখতে শিখতেন। মূলত মসজিদের এই শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেই মুসলিম সভ্যতা বিশ্বজুড়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো ছড়িয়েছিল।
মসজিদের ভেতর নীতিবহির্ভূত কাজ ছাড়াও ব্যবসা-বাণিজ্য বা কেনাবেচা করা নিষিদ্ধ ছিল। কারণ রাসুল (সা.) চেয়েছিলেন আল্লাহর ঘর যেন পার্থিব লাভের মাধ্যম না হয়। এছাড়া অন্য সব ইতিবাচক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য মসজিদ ছিল এক প্রাণবন্ত কেন্দ্র। মসজিদের সেই হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।
এনটি
