ধর্মীয় শিক্ষা ও ইসলাম প্রচারের ঐতিহাসিক কেন্দ্রবিন্দু মরক্কোর শেফশাউন প্রদেশের শারাফাত গ্রামে অবস্থিত তারেক বিন জিয়াদ মসজিদ। তৎকালীন টাঙ্গিয়ারের গভর্নর ও প্রখ্যাত মুসলিম সেনাপতি তারেক বিন জিয়াদ ৮৫ হিজরি তথা ৭০৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন।
মরক্কোতে সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ এটিই যেখানে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে নিয়মিত নামাজ আদায় হয়ে আসছে। একই সাথে মহাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় নির্মিত মসজিদ এটিদ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই মসজিদ সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা থেকে অসংখ্য আলেম, ইসলামিক গবেষক ও দায়ী তৈরি হয়েছেন।
সাদা ও নীল রঙের মিনার এবং লাল টালির ছাদবিশিষ্ট এই মসজিদের স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত মনোরম। এর পাশেই রয়েছে কিছু প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ, যা সংস্কারের আগে মূল মসজিদের অংশ ছিল বলে ধারণা করা হয়। আন্দালুস বা স্পেন বিজয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার আগে তারেক বিন জিয়াদ যখন টাঙ্গিয়ার শাসনভার পরিচালনা করছিলেন, তখনকার খুব কম নিদর্শনই কালের আবর্তে টিকে আছে। তার মধ্যে এই মসজিদ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে এখানে সব বয়সের শিক্ষার্থীদের পবিত্র কোরআন হিফজ করানো হচ্ছে। বিশেষ করে স্প্যানিশ উপনিবেশ আমলে এই অঞ্চলে এর প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। তৎকালীন সময়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও খাবারের খরচ বহন করত স্থানীয় কিছু পরিবার, যা স্থানীয় ভাষায় মারুফ নামে পরিচিত ছিল। তারা পরকালে সওয়াব অর্জনের আশায় শিক্ষার্থীদের খাবারের ব্যবস্থা করত এবং শিক্ষার্থীরা মসজিদের ছাত্রাবাসেই থাকার সুবিধা পেত।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই মসজিদ শুধু শিক্ষার আলোই ছড়ায়নি, বরং স্প্যানিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে মরক্কোর স্বাধীনতা সংগ্রামে অসামান্য রাজনৈতিক ও সামরিক ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯২০-এর দশকে স্থানীয় স্বাধীনতাকামী মুজাহিদরা এই মসজিদের আঙিনায় বসে স্প্যানিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিকল্পনা করতেন। এখান থেকেই পরিচালিত হয়েছিল ঐতিহাসিক আল কুল্লা যুদ্ধ, যেখানে ঔপনিবেশিক বাহিনী বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছিল।
মারুফ প্রথার আওতায় শিক্ষার্থীদের ভরণপোষণ
মরক্কোতে ফরাসি উপনিবেশ চলাকালীন সময়ে তারেক বিন জিয়াদ মসজিদে শুধু উত্তরাঞ্চলের শিশু ও যুবকেরা আসত। স্পেনের অধীনে থাকা এই অঞ্চলটি তখন খলিফা শাসিত এলাকা নামে পরিচিত ছিল।
ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে যারা কোরআন হিফজ করতে চাইতেন, তাদের প্রধান কেন্দ্র ছিল এই মসজিদ। এখানকার প্রধান শিক্ষক তক্তায় কোরআনের আয়াত লিখে দিতেন এবং শিক্ষার্থীরা তা কোলে নিয়ে সমস্বরে তিলাওয়াত করতেন।
মসজিদের সাবেক শিক্ষার্থী মুহাম্মদ রাইয়ান বলেন, শিক্ষার্থীরা যখন এখানে ধর্মীয় জ্ঞান বা ইলম করতে আসতেন, তখন তাদের বেশিরভাগেরই পড়াশোনার খরচ চালানোর সামর্থ্য থাকত না। বিষয়টি তখন মসজিদের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক দেখতেন।
রাইয়ান আরও জানান, এমন পরিস্থিতিতে প্রধান শিক্ষক এমন কিছু পরিবারের তালিকা দেখতেন, যারা আগে থেকেই কোনো শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে রেখেছিল। এই ব্যবস্থাকেই স্থানীয়ভাবে মারুফ বলা হতো।
এই পরিবারগুলো সাধারণত আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা ছিল। সওয়াব অর্জনের উদ্দেশ্যে তারা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পুরো সময়টাতে খাবারের ব্যবস্থা করতেন, আর শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা হতো মসজিদেরই বিভিন্ন কক্ষে।
ইলম ও আলেমদের চারণভূমি তারেক বিন জিয়াদ মসজিদ
ইতিহাসে যাদের অগাধ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের কথা স্বীকৃত, এমন বহু প্রখ্যাত আলেম যুগে যুগে এই মসজিদের মিম্বরের দায়িত্ব সামলেছেন। ওই সময়ে শারাফাত গ্রামে ইলম অর্জনের জন্য একসঙ্গে ৪০ থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী ছুটে আসতেন।
মসজিদের ধর্মীয় ইনস্টিটিউটটি পবিত্র কোরআন, আরবি ভাষা, আকাইদের মূলনীতি, সুন্নাহ, ফিকহ, তাফসির, ব্যাকরণ, সুফি মতবাদ এবং তাজবিদ শিক্ষার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। সেই থেকে এই মসজিদ জ্ঞান ও আলো ছড়ানোর কাজ করে যাচ্ছে।
সাবেক এক শিক্ষার্থী বলেন, মসজিদের আঙিনায় শিক্ষামূলক নানা আসর বসত, যার প্রধান থাকতেন ফকিহ বা আলেম। সেখানে ইবনে মালিকের আলফিয়াহ, হাদিস বিশারদ ইবনে আসিরের বিভিন্ন গ্রন্থের মূল পাঠ ও এর ব্যাখ্যা পড়ানো হতো এবং সালকাহ সম্পন্ন করা হতো।
সালকাহ হলো মরক্কো ও আলজেরিয়ার মুসলিমদের একটি সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি। এর মূল কাজ হলো মসজিদ, খানকাহ বা বাড়িতে দলগতভাবে পুরো কোরআন শরীফ খণ্ড খণ্ড করে ভাগ করে নিয়ে সম্পূর্ণ খতম করা।
ধর্মীয় ও মানবিক বিদ্যায় এই মসজিদের ব্যাপক সুনামের কারণে দেশের সব প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে আসতে শুরু করেন। মরক্কোর স্বাধীনতার পর এই মসজিদ শুধু উত্তরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
সাবেক ওই শিক্ষার্থী আরও জানান, এই প্রাচীন মসজিদ থেকে এমন অনেক বিখ্যাত আলেম পড়াশোনা শেষ করেছেন, যারা পরবর্তী সময়ে শরিয়াহ, সাহিত্য ও বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের মধ্যে শায়খ আবদুস সালাম বিন মশিশ, ফকিহ আবদুল কাদির এবং অধ্যাপক উমর আল সাকাকির নাম উল্লেখযোগ্য।
তারেক বিন জিয়াদের নির্মিত মসজিদ
শারাফাত অঞ্চলের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝে আধ্যাত্মিক ও মানসিক প্রশান্তির জায়গা হিসেবে গড়ে ওঠা এই ঐতিহাসিক মসজিদ ও ধর্মীয়-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মরক্কোর ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এই মসজিদ স্বয়ং সেনাপতি তারেক বিন জিয়াদের হাতে নির্মিত হয়েছিল।
শেফশাউনের শারাফাত এলাকাটি কৌশলগতভাবে রিফ পর্বতমাালার দুটি পাহাড়ের মাঝে একটি প্রাকৃতিক দুর্গ হিসেবে অবস্থিত। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই এটি সামরিক কমান্ডার তারেক বিন জিয়াদের সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান সমাবেশস্থলে পরিণত হয়েছিল।
শরাফাতের এই সেনাশিবিরে অবস্থানকালে সৈন্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বিপুল সংখ্যা এবং তাদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর মসজিদের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ফলে তারেক বিন জিয়াদ নিজের সৈন্য ও স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে নিয়ে এই মসজিদ নির্মাণ করেন।
স্পেন বা আন্দালুস বিজয়ের পাশাপাশি উত্তর মরক্কোয় ইসলাম প্রচারে অসামান্য অবদান রাখা এই বীর সেনাপতিকে মুসা বিন নুসাইর টাঙ্গিয়ারের আশেপাশের ঘুমারা ও বারঘাওয়াতা বার্বার উপজাতিদের মধ্যে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
একইভাবে শরাফাত অঞ্চলের মানুষও কমান্ডার তারেক বিন জিয়াদের এই অবদানের প্রতিদান দিয়েছিলেন। আন্দালুসিয়ান শিক্ষা ও পাঠ্য সংশোধন বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ মিফতাহ উল্লেখ করেছেন, স্থানীয় অধিবাসীরা এই কমান্ডারের সাথে তার বিভিন্ন ইসলামিক বিজয়ে অংশ নিয়েছিলেন।
তেতুয়ান ফ্যাকাল্টি অব লেটারসের উচ্চশিক্ষা বিভাগের এই অধ্যাপক আরও স্পষ্ট করে বলেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে এই অঞ্চলের মানুষ আরবি ভাষা রপ্ত করার পর নতুন দ্বীনের প্রতি অত্যন্ত অনুরাগী হয়ে ওঠে এবং ইসলামের পতাকা তুলে ধরতে তারেক বিন জিয়াদের সেনাবাহিনীতে শামিল হয়।
জিহাদের মসজিদ
মরক্কোর তারেক বিন জিয়াদ মসজিদটি আন্দালুস বা স্পেন বিজয়ের অন্যতম একটি ঘাঁটি। তারা দ্বীনের দাওয়াতকে জিহাদে আকবর বা বড় জিহাদ এবং সশস্ত্র লড়াইকে জিহাদে আসগর বা ছোট জিহাদ মনে করতেন।
এই প্রসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা মুহাম্মদ রাইয়ান বলেন, মসজিদটি মালেকি মাজহাবকে সুপ্রতিষ্ঠিত ও তা টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি মসজিদের আধ্যাত্মিক ও জ্ঞানগত ভূমিকা বজায় রেখে এই দাওয়াতি কাজে এক অনন্য অবদান রেখেছিল।
উপনিবেশ বা ফরাসি-স্পেনীয় শাসন আমলে এই মসজিদ প্রতিরোধ সংগ্রামেও ভূমিকা পালন করে। তখন আল-মাজদাকি, আল-রাইয়ান, শুরাফা কাজুন, আল-বাককালি এবং আওলাদ আবদুল্লাহসহ বিভিন্ন স্থানীয় পরিবারের স্বাধীনতাকামী মুজাহিদেরা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এই মসজিদের আঙিনায় সমবেত হতেন।
রাইয়ানের দেওয়া তথ্যমতে, এই মসজিদ থেকেই ১৯২০-এর দশকে স্প্যানিশ দখলদারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযান শুরু হয়েছিল। যার ফলে কসরুল কবিরের কাছের আল-কুল্লা যুদ্ধে মুজাহিদেরা দখলদার বাহিনীর জনবল ও সামরিক সরঞ্জামের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম হয়েছিল।
এই প্রাচীন মসজিদ আজও জ্ঞান বিস্তারের মাধ্যমে সেই বড় জিহাদ বা দাওয়াতি কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও এর ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আগের সেই জৌলুস কিছুটা কমেছে, তবুও আজ পর্যন্ত প্রতি বছর এখান থেকে ছেলে ও মেয়ে উভয় শ্রেণির বহু শিক্ষার্থী পবিত্র কোরআন হিফজ সম্পন্ন করে বের হচ্ছে।
গৌরবময় ইতিহাস ও অবহেলিত বর্তমান
মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্বের প্রতীক হিসেবে উনিশ শতকের শেষের দিকে, অর্থাৎ ১৮৮৬ সালে মরক্কোর সুলতান মৌলে হাসান আল-আউয়াল এটি পরিদর্শন করেন। একইভাবে ১৯৬২ সালে দেশটির প্রয়াত রাজা দ্বিতীয় হাসানও এই মসজিদে এসেছিলেন।
এর আদি ও মূল স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ণ রেখে বিভিন্ন সময়ে মসজিদটির বেশ কিছু সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি এখানে ঐতিহ্যবাহী আল-কারাসি আল-ইলমিয়াহ বা উন্মুক্ত জ্ঞানচর্চার আসর পুনরায় চালু করা হয়। এসব আসরে আলেমদের তত্ত্বাবধানে শরিয়াহর শিক্ষার্থীদের আকাইদের মূলনীতি, সুন্নাহ, ফিকহ, তাফসির, ব্যাকরণ, সুফি মতবাদ ও তাজবিদ শিক্ষা দেওয়া হতো।
২০১৯ সালে মরক্কোর সংস্কৃতি ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় তারেক বিন জিয়াদ মসজিদকে জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করে। এর জ্যামিতিক নকশা, নির্মাণ সামগ্রী ও প্রযুক্তির কারণে একে পাহাড়ি অঞ্চলের ধর্মীয় স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে এই ইতিবাচক পদক্ষেপও ২০১৯ সালে মসজিদটির ধর্মীয় ইনস্টিটিউট বন্ধের সিদ্ধান্ত ঠেকাতে পারেনি। মরক্কোর ওয়াকফ ও ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার অজুহাতে এটি বন্ধ করে দেয়, যার ফলে প্রতিষ্ঠানটি তার চিরচেনা বৈজ্ঞানিক জৌলুস এবং শিক্ষামূলক কার্যক্রম হারায়।
ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও মানবিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মসজিদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক শিক্ষার্থী রাইয়ান। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এটি মরক্কো তথা মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সেরা ঐতিহ্য হিসেবে যেভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য ছিল, সেই অনুযায়ী মনোযোগ পায়নি; উল্টো এখান থেকে অনেক মূল্যবান প্রাচীন নিদর্শন সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং এর কিছু ঐতিহাসিক স্মারক ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
সূত্র : আরবি পোস্ট
এনটি
