বিজ্ঞাপন

নরওয়ের মুসলিমদের সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করেছে যে ২ মসজিদ

নরওয়ের মুসলিমদের সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করেছে যে ২ মসজিদ

উত্তর মেরু বা সুমেরু বৃত্তের ঠিক দোরগোড়ায় অবস্থিত নরওয়ের ছোট্ট শহর ত্রোমসো। হিমশীতল আবহাওয়ার এই শহরেই গড়ে উঠেছে ‘আল-রহমা’ এবং ‘আন-নূর’ নামের দুটি মসজিদ। আকারে বেশ ছোট এবং ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে মেরু অঞ্চলের সবচেয়ে কাছের মসজিদ। মসজিদ দুটি স্থানীয়দের কাছে ইসলামকে পরিচিত করতে এবং সেখানে বসবাসরত মুসলিমদের এক সুতোয় বাঁধতে অনন্য ভূমিকা রাখছে।

প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসতি ত্রোমসো শহর। শহরের ক্রোনিকেতা সড়কে অবস্থিত সবুজ রঙের একটি দোতলা ভবন। বাইরে থেকে সাধারণ বাড়ি মনে হলেও এটিই আসলে ‘আল-রহমা’ মসজিদ। দুই দশক আগে একটি আবাসিক বাড়িকে মসজিদে রূপান্তর করা হয়। এর ভেতরের দেয়ালগুলো এখন পবিত্র কাবা শরিফ ও মসজিদে নববীর ছবি দিয়ে সাজানো।

শুধু নামাজ আদায় নয়, ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী যে কোনো ধর্মের মানুষের জন্য এই মসজিদের দরজা সবসময় খোলা থাকে। আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসীদের আনাগোনা এখানে সবচেয়ে বেশি। রমজান মাসে ইফতারের সময় বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের মিলনমেলায় পরিণত হয় মসজিদটি।

আল-রহমা মসজিদ থেকে মাত্র ৩০০ মিটার দূরেই অবস্থিত ‘আন-নূর’ মসজিদ। এই মসজিদও তৈরি করা হয়েছে একটি বাড়ি কিনে, তবে আকারে আগেরটির চেয়ে কিছুটা বড় এই মসজিদ। এখানে পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা নামাজের জায়গা রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় শিশুদের কোরআন শিক্ষা ও ইসলামের মৌলিক বিষয়ে পাঠদান করা হয় এই মসজিদে।

আন-নূর মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা আন্দ্রে উইনহাম জানান, ২০০৬ সালে তারা এই মসজিদ বা ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন। একবার সৌদি আরবের এক নাগরিক ত্রোমসো পরিদর্শনে এসে এখানকার মুসলিমদের অবস্থা দেখেন। তিনি এই সেন্টারের উদ্যোগে একটি বড় ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণের জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক অনুদানের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন, যেন মসজিদটি শহরের বুকে ইসলামের প্রতীক হয়ে থাবে। তবে স্থানীয় সরকারের কাছ থেকে অনুমতি না পাওয়ায় সেই বড় মসজিদ আর নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।

ইরিত্রিয়া থেকে নরওয়েতে আসা আবদুল্লাহ মুহাম্মদ আলী জানান, ত্রোমসো শহরে বর্তমানে সিরিয়া ও আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় এক হাজার মুসলিম বসবাস করছেন, যাদের বড় অংশই আছেন শরণার্থী শিবিরে। তাদের জন্য এই মসজিদের গুরুত্ব অপরিসীম।

ভৌগোলিক সংকটের কথা উল্লেখ করে আবদুল্লাহ বলেন, আমরা নরওয়ের সুদূর উত্তরে বাস করি, এখান থেকে উত্তর মেরু মাত্র ছয়-সাত ঘণ্টার দূরত্বে। এখানকার আবহাওয়া অত্যন্ত জটিল। গ্রীষ্মে বা রমজান মাসে সূর্য কখনোই ডোবে না, আবার শীতকালে সূর্যের দেখাই মেলে না, চারদিক শুধু অন্ধকারে ডুবে থাকে। এমন প্রতিকূল পরিবেশে আমাদের একতাবদ্ধ রাখতে এই মসজিদগুলো কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছে।

তিনি আরও জানান, নামাজ ছাড়াও বিয়ে, জানাজা ও ঈদের মতো ধর্মীয় ও সামাজিক আচার সম্পন্ন করতে সবাইকে সাহায্য করে এই ইসলামিক সেন্টার। তবে কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে বর্তমানে তাদের আর্থিক ও নৈতিক সহায়তার প্রয়োজন।

অবশ্য দূর প্রবাসে সব কিছু এত সহজ নয়। সোমালিয়া থেকে আসা তরুণ মুহাম্মদ ইউসুফ মোয়া শোনালেন তাদের নিত্যদিনের সংগ্রামের কথা। তিনি বলেন, কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নামাজ পড়তে গেলে আমাদের অনেক সময় বাধার মুখে পড়তে হয়। তারা চিৎকার করে আমাদের নিষেধ করে। কিন্তু কাজের ফাঁকে বা ক্লাসের বিরতিতে সবাই যখন যার যার মতো সময় কাটায়, আমরা তখন নামাজটুকু পড়তে চাই। শীতের দিনে বাইরে প্রচণ্ড বরফ থাকে, মাইনাস তাপমাত্রায় তো বাইরে নামাজ পড়া সম্ভব নয়। তাই শত প্রতিকূলতার মাঝেও এই মসজিদগুলোই আমাদের একমাত্র শান্তির আশ্রয়।

সূত্র : আনাদোলু এজেন্সি

এনটি