সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ইসলামিক স্কলারদের একজন মুফতি ইসমাইল মেঙ্ক। বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম ও অমুসলিমের কাছে সমানভাবে সমাদৃত তিনি। ধর্মীয় জ্ঞান, রসবোধ ও সম্প্রীতির বার্তার জন্য পরিচিত ৫১ বছর বয়সী এই স্কলার বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অনুসারীর সংখ্যা ৯০ লাখেরও বেশি। তিনি বর্তমানে জিম্বাবুয়ের প্রধান মুফতি।
জন্ম ও শৈশব
১৯৭৫ সালের ২৭ জুন জিম্বাবুয়ের হারারে শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাবা শেখ মুসা মেঙ্কের নয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন অষ্টম। তার বাবা হারারে সিটি সেন্টারের প্রধান মসজিদের অন্যতম সিনিয়র ইমাম ছিলেন। বাবার পথ অনুসরণ করে খুব ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষা সমানতালে শুরু করেন মুফতি মেঙ্ক। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবার কাছে অন্য শিশুদের পবিত্র কোরআন পড়া শেখা দেখে কোরআন শিক্ষার প্রতি তার গভীর আগ্রহ তৈরি হয়।

শিক্ষাজীবন
হারারের বেলভেডিয়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৯৮১ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন তিনি। এর পাশাপাশি ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত লিবিয়ান পিপলস ব্যুরো অনুমোদিত একটি বিশেষায়িত স্কুলে বিকেলের শিফটে আরবি ভাষা শেখেন, যেখানে মূলত আরব কূটনীতিকদের সন্তানেরা পড়াশোনা করত। সেই আরবি স্কুলে তিনি প্রতি বছরই সেরা ছাত্রের পুরস্কার পেতেন। সাধারণ শিক্ষাতেও তিনি বেশ মেধাবী ছিলেন এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় জুড়ে প্রতি শ্রেণিতেই শীর্ষ তিনজনের মধ্যে থাকতেন।
কোরআন হিফজ
পড়াশোনার পাশাপাশি ১৯৮৫ সালে বুলাওয়েতে অনুষ্ঠিত জিম্বাবুয়ে জাতীয় কোরআন তিলাওয়াত ও বক্তব্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজের চেয়ে বয়সে বড় প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। ১৯৮৭ সালে ভালো ফলের স্বীকৃতিস্বরূপ স্কুলের প্রিফেক্ট মনোনীত হন এবং একই বছর বাবা শেখ মুসা মেঙ্কের তত্ত্বাবধানে পবিত্র কোরআনের হিফজ সম্পন্ন করেন।
খেলাধুলার সঙ্গে সংযোগ
প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি হারারের অন্যতম সেরা বেসরকারি খ্রিস্টান কলেজ সেন্ট জোনস কলেজে ভর্তি হন। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি রাগবি, হকি, ক্রিকেট, বাস্কেটবল, ভলিবল, সাঁতার ও অ্যাথলেটিকসের মতো বিভিন্ন খেলায় পারদর্শিতা দেখান।
সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ
কৈশোর থেকেই সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক সহজাত মানসিকতা ছিল মুফতি মেঙ্কের। কলেজের কমিউনিটি অ্যাওয়ারনেস ক্লাবের হয়ে তিনি আর্তমানবতার সেবায় নিজের অবসর সময় ব্যয় করতে শুরু করেন।
১৯৯১ সালে তিনি কেমব্রিজ জিসিএসই ও-লেভেল সম্পন্ন করেন। ১৯৯২ সালে জিম্বাবুয়ের ইমাম কাউন্সিলের অধীনে জাতীয় খরা ত্রাণ কর্মসূচিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দিয়ে গ্রামীণ অঞ্চলে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের কাজ করেন তিনি, যা তাঁর জীবনের অন্যতম সন্তোষজনক অভিজ্ঞতা ছিল।
বাবার আগ্রহে ১৯৯২ সালে মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা কোর্সে ভর্তি হন তিনি। ১৯৯৩ সালে আরবি মাধ্যমে সেকেন্ডারি সার্টিফিকেট লাভ করেন এবং মদিনা মুনাওয়ারায় অনুষ্ঠিত আন্তঃনগর কোরআন হিফজ প্রতিযোগিতায় নিজের ক্যাটাগরিতে দ্বিতীয় স্থান পান। ১৯৯৪ সালে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়াহ অনুষদে ভর্তি হয়ে ১৯৯৮ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
১৯৯৮ সালে মক্কায় অনুষ্ঠিত বিখ্যাত বাদশাহ আব্দুল আজিজ কোরআন প্রতিযোগিতায় পূর্ণ কুরআন হিফজ ও তাজবিদ বিভাগে চতুর্থ স্থান অধিকার করেন। এরপর ১৯৯৯ সালে ভারতের গুজরাটের দারুল উলুম থেকে হানাফি ফিকহের ওপর উচ্চতর শিক্ষা অর্জন করেন এবং ফতোয়া ও নির্দেশনা বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে কোর্স শেষ করেন।
স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ও গ্র্যান্ড মুফতি পদে অভিষেক
২০০০ সালে জিম্বাবুয়েতে ফিরে তিনি দেশের একমাত্র জাতীয় ইমাম কাউন্সিল মজলিসুল উলামা জিম্বাবুয়েতে যোগ দেন। একই বছর বার্ষিক সাধারণ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তিনি এই কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং ফতোয়া ও নির্দেশনা বিভাগের প্রধান হিসেবে জিম্বাবুয়ের গ্র্যান্ড মুফতি নিযুক্ত হন। এরপর থেকে হারারে শহরের বিভিন্ন মসজিদে নিয়মিত জুমার খুতবা ও ধর্মীয় বক্তব্য দিতে শুরু করেন এবং ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশের বৃহত্তম মসজিদের ইমাম হিসেবে স্বেচ্ছাসেবা দেন।
নারীদের ধর্মীয় ও সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ
নারীদের ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষমতায়নের জন্য তিনি ইমাম কাউন্সিলের অধীনে সাপ্তাহিক সিস্টার্স লার্নিং প্রোগ্রাম চালু করেন। এছাড়া মাগরিবের নামাজের আগে হারারের দুটি মসজিদে তিন মিনিটের নির্দেশনামূলক সংক্ষিপ্ত আলোচনার সূত্রপাত করেন।
বেশ কয়েক বছর তিনি জিম্বাবুয়ের জাতীয় হালাল পরিদর্শককে হালাল সনদ ও প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধে সহায়তা করেন। ২০০০ সাল থেকে তিনি মজলিসুল উলামা জিম্বাবুয়ে কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা শুরু করেন এবং তরুণদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের কারণে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
দেশ-বিদেশে দ্বীনি দাওয়াত
শিক্ষা জীবন শেষ করার পর প্রথম বছরগুলোতে তিনি ওমরাহ যাত্রীদের গাইড হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান সফর করেন এবং জিম্বাবুয়ের হাজিদের জন্য বার্ষিক হজ্জ প্রশিক্ষণ ক্লাসের আয়োজন করেন। ২০০০ ও ২০০১ সালে হারারের ইসলামিক কালচারাল ইনস্টিটিউটে শিশুদের কোরআন শিক্ষা দেন এবং পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কমিটিতে ছয় বছর দায়িত্ব পালন করেন। সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে গ্রামীণ এলাকায় ইসলামিক ডে প্রোগ্রাম এর মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা দিতে শুরু করেন।
২০০১ সালে সৌদি আরবের আফ্রিকা দাওয়াহ কমিটিতে ইসলামী দাওয়াহর ওপর গণমাধ্যমের প্রভাব শীর্ষক আরবি গবেষণা উপস্থাপন করে প্রথম পুরস্কার পান। ২০০২ সালে জোহানেসবার্গে নেলসন ম্যান্ডেলা কর্তৃক উদ্বোধন হওয়া কিং ফাহাদ সিম্পোজিয়ামে আফ্রিকায় দাওয়াহর প্রতিবন্ধকতা ও সমাধান বিষয়ক গবেষণা উপস্থাপন করেন।
রমজানের তারাবি ও আলোচনা সিরিজ
১৪ বছর বয়স থেকেই রমজানে তারাবির নামাজ পড়ানো শুরু করেন মুফতি মেঙ্ক। ২০০২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের মসজিদ আশরাফে তারাবি পড়ানোর জন্য আমন্ত্রিত হন, যা রেডিও ইসলাম ইন্টারন্যাশনালে সম্প্রচারিত হতো। ২০০৩ সালে জোহানেসবার্গের নূরুল ইসলাম মসজিদে পবিত্র কোরআনের তাফসির নিয়ে তার ২৯ পর্বের পূর্ণাঙ্গ ধারাবাহিক আলোচনা চ্যানেল ইসলাম ইন্টারন্যাশনাল ও রেডিও ইসলাম ইন্টারন্যাশনালে সম্প্রচারিত হয় এবং পরবর্তীতে সিডি আকারে প্রকাশিত হয়।
উগ্রবাদ বিরোধী অবস্থান ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
মুফতি মেঙ্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও পরমতসহিষ্ণুতার বার্তা ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। তিনি প্রকাশ্যে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের নিন্দা জানিয়েছেন এবং আইএসআইএস ও বোকো হারামের মতো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন। আইএসের ওপর দেওয়া তার সাক্ষাৎকারটি ব্যাপক সাড়া ফেলে।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে কেউ মুসলিম দাবি করতে পারে না, কারণ কোরআনে বলা হয়েছে, একজন মানুষকে হত্যা করা মানে পুরো মানবজাতিকে হত্যা করা। তিনি তরুণদের উগ্রপন্থার দিকে ধাবিত করার পেছনে সহিংস ভিডিও গেম ও ইন্টারনেটের অপব্যবহারকে দায়ী করেন এবং মুসলিমদের নিজেদের মধ্যে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বন্ধ করার আহ্বান জানান। পাকিস্তানের সাবেক গায়ক জুনাইদ জামশেদের ওপর হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার তাগিদ দেন।
বর্তমানে ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবে তার অনুসারীর সংখ্যা কোটি ছাড়িয়েছে। মুসলিম সেন্ট্রাল প্ল্যাটফর্ম তার অডিও-ভিডিও লেকচারের জন্য বিশেষ অ্যাপ তৈরি করেছে যা লাখ লাখ মানুষ ডাউনলোড করেছেন। মুফতি মেঙ্ক তার কোনো ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক আলোচনার জন্য কোনো প্রকার পারিশ্রমিক বা রয়্যালটি নেন না এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শান্তির বার্তা প্রচার করেন।
আন্তর্জাতিক সফর
তিনি যুক্তরাজ্য, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব, কেনিয়া ও ভারতসহ বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশে আন্তর্জাতিক সফর করেছেন। মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে তিনি জিম্বাবুয়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
সমাজসেবা ও ধর্মীয় নির্দেশনায় অবদানের জন্য দুবাই, কাতারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে তিনি অসংখ্য পুরস্কার ও স্বীকৃতি পেয়েছেন। জর্ডানের রয়্যাল ইসলামিক স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার কর্তৃক টানা ছয় বছর ধরে বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ প্রভাবশালী মুসলিমের তালিকায় স্থান পেয়ে আসছেন মুফতি ইসমাইল মেঙ্ক। তিনি সবসময় প্রতিটি দেশের সরকারকে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা এবং বিশ্বব্যাপী শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
সূত্র : কোচিন হেরাল্ড
এনটি
