মেয়াদ বাড়ছেই টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের, টেকনিক্যাল প্ল্যান কবে

ফুটবলে গুরুত্বপূর্ণ পদ টেকনিক্যাল ডিরেক্টর। এই পদে থাকা ব্যক্তিই একটি দেশের ফুটবলের আগামীর পরিকল্পনা ও কৌশল নির্ধারণ করে থাকেন। বাফুফের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পদটি যেন শুধুই কোচিং কোর্স করানোর আর ফিফা-এএফসি সেমিনারে অংশগ্রহণ করার। কিন্তু ফুটবলের সুনির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপ বা টেকনিক্যাল প্ল্যান দৃশ্যমান হয় না।
সাবেক জাতীয় ফুটবলার ও কোচ সাইফুল বারী টিটুর টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়েছিল। সেই মেয়াদ আবার এক বছর বাড়িয়েছে বাফুফে। তাবিথ আউয়াল বাফুফে সভাপতি হওয়ার পর এ নিয়ে তৃতীয় দফায় টেকনিক্যাল ডিরেক্টর টিটুর মেয়াদ বাড়ল। প্রথম দুই দফা ছিল ছয় মাস করে। এখন সেটা বেড়ে এক বছর হয়েছে।
গত বছর জুনে আবার ছয় মাস মেয়াদ বৃদ্ধির সময় টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম হিলটন বলেছিলেন, ফেডারেশন টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে বিদেশি কাউকে খুঁজছে। ছয় মাস পর কোনো বিদেশিকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। উল্টো টিটুর এক বছরের জন্য মেয়াদ বাড়িয়েছে ফেডারেশন। এতে টেকনিক্যাল কমিটি কিংবা ফেডারেশনের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর নিয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা সেই প্রশ্ন উঠেছে জোরেশোরে।
বাফুফের সাবেক টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলি শুধু কোচিং কোর্স করানো আর নারী দলের কোচিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন। দুই মেয়াদে ছয় বছরের বেশি সময়ে তার পেছনে কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাংলাদেশের ফুটবল পায়নি কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বা পন্থা। তার স্থলাষিভিক্ত হয়েছেন সাবেক জাতীয় ফুটবলার ও কোচ টিটু। সালাউদ্দিন ও তাবিথ দুই আমল মিলিয়ে দুই বছর সময় পার করলেও টিটুর কাছ থেকেও দৃশ্যত ট্যাকনিক্যাল কোনো প্ল্যান দৃশ্যমান হয়নি। অনেক সময় কোচরা স্বল্প মেয়াদে দায়িত্ব পেলে স্থায়িত্বের অজুহাত দিলেও টিটু অবশ্য তা দেননি, ‘‘পরিকল্পনার সঙ্গে চুক্তির মেয়াদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমি পরিকল্পনা দেই, সেটা আমি থাকি বা না থাকি এটার উপর নির্ভরশীল করে নয়।’’

গত দুই বছরে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে কি পরিকল্পনা দিয়েছেন সেটা অবশ্য বলেননি তিনি। ফেডারেশন থেকেও জানা যায়নি তার প্ল্যান সম্পর্কে।
সাবেক তারকা ফুটবলার সৈয়দ রুম্মন বিন ওয়ালী ফয়সাল বাফুফের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা দেখতে পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘‘বর্তমান কমিটির এক বছরের বেশি সময় হয়ে গেল। এখনও পাইওনিয়ার ফুটবল মাঠে গড়ায়নি। চার-পাঁচ বছর পর আমরা ফুটবল কোথায় দেখতে চাই, সেই ভিশন বা মিশনও দৃশ্যমান নয়। হামজার আগমনে ফুটবলের নবজাগরণ উঠেছে। এখনই প্রকৃত সময় একটি টেকসই পরিকল্পনা করার।’’
বাফুফে নির্বাচনে সাধারণত সভাপতি কিংবা প্যানেল ভিত্তিক নির্বাচনে প্যানেলগুলো আলাদা আলাদা ইশতেহার দেয়। তাবিথ আউয়াল এবার খুব কৌশলী নির্বাচন করেছেন। কোনো প্যানেল না থাকায় সুনির্দিষ্ট কোনো ইশতেহার তিনি বা তেমন কেউ দেননি। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সিনিয়র সহ-সভাপতি হওয়া ইমরুল হাসান নির্বাচনের সময় ৩৬০ ডিগ্রির একটি ইশতেহার দিয়েছিলেন। এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেটার বাস্তবায়ন নেই।
টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের কর্মপরিধি ও আওতা ব্যাপক। ঘরোয়া ফুটবলে সার্ক অঞ্চলে ফুটবলাররা দেশি হিসেবে খেলছেন। আবার প্রথমবারের মতো নারী ফুটবল লিগে বিদেশি ফুটবলার খেলছে। এই দুটি বিষয় উন্নত ফুটবল বিশ্বে টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের মতামত বা রিপোর্টের ভিত্তিতে হতো। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কর্মকর্তারাই সিদ্ধান্ত নেন আর টেকনিক্যাল ডিরেক্টরও খানিকটা নিরাপদ দূরত্বেই থাকেন। বয়সভিত্তিক কিংবা জাতীয় দলে কোন অঞ্চল থেকে ফুটবলার বেশি আসছে, কোন বয়সের ফুটবলাররা ভালো পারফরম্যান্স করছে, কোন পথে ফুটবল আগানো উচিত এই সংক্রান্ত তেমন কোনো রিপোর্ট বাফুফের কোনো টেকনিক্যাল ডিরেক্টর থেকে পাওয়া যায়নি।
এসব রিপোর্ট করতে অনেক লোকবলও প্রয়োজন। টেকনিক্যাল বিভাগের এক এক্সিকিউটিভ ফুটসালে ব্যস্ত। আরেক এক্সিকিউটিভ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ব্যক্তিগত কাজ করেন। ফেডারেশনই যেন টেকনিক্যাল বিভাগ টেকনিক্যালি দুর্বল করে রেখেছে।
জাতীয় দলের কোচদের ফলাফলের ওপর ভালো-মন্দ নির্ভর করে। টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের কাজ রেজাল্ট ভিত্তিক নয়। বারবার মেয়াদ বৃদ্ধি পাওয়া টিটু এই এক বছর পর তার প্রাপ্তি হিসেবে দেখতে চান, ‘‘এই এক বছরে ফুটবলের কানেক্টিভিটি বাড়াতে চাই ব্যাপকভাবে। পঞ্চগড়ের একটি একাডেমি কি ট্রেনিং করছে এটা যেন বাফুফে জানতে পারে। এ রকম একটি সিস্টেম দাড় করাতে চাই।’’ আর টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যানের বক্তব্য, ‘‘আগামী এক বছর আমরা ৩২টি প্রোগ্রাম আয়োজনের পরিকল্পনা করেছি।’’
বাফুফের স্ট্যান্ডিং কমিটির মধ্যে শুধু টেকনিক্যাল কমিটিরই আয় রয়েছে। কারণ কোচিং কোর্সে সবাই রেজিস্ট্রেশন ফি প্রদান করে। তাই বাফুফে টেকনিক্যাল ডিরেক্টরকে ট্যাকনিক্যাল প্ল্যান কিংবা অন্য ট্যাকনিক্যাল গবেষণার চেয়ে কোচিং কোর্স করাতে দেখেই তৃপ্ত হয়। জাতীয় দলে কোচ হতে এখন প্রো লাইসেন্স প্রয়োজন। টিটু প্রো লাইসেন্স কোচিং কোর্স করাতে পারবেন না। ফলে এজন্য বিদেশি ইন্সট্রাকটর আনতেই হবে ফেডারেশনকে। এতেও বাড়তি খরচ।
উন্নত ফুটবল বিশ্বে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পদ অনেক পুরনো হলেও বাফুফেতে ২০০৯ সাল থেকে শুরু। জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক ও আমেরিকান প্রবাসী শহিদুর রহমান চৌধুরি সান্টুকে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর করেছিলেন তৎকালীন সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। বছর দেড়েক পর তিনি আবার আমেরিকায় ফিরে যান। এরপর বায়েজিদ জোবায়ের আলম নিপু প্রায় বছর পাঁচেক ছিলেন এই পদে। সবচেয়ে বেশি বেতন ও বেশি সময় ছিলেন ইংল্যান্ডের পল স্মলি। তিনি চলে যাওয়ার পর এই পদে বসেছেন সাইফুল বারী টিটু।
এজেড/এমএমএম