জিজিনহো: ব্রাজিলের ফুটবল পরিচয়ের নেপথ্যের কারিগর

ফুটবলবিশ্বে পেলে আসার আগেই ব্রাজিল দল পেয়েছিল তার প্রথম শিল্পী। নাম জিজিনহো। মাঠে নান্দনিকতা, বুদ্ধি আর আবেগের মেলবন্ধনে যিনি গড়ে দিয়েছিলেন ব্রাজিলের খেলাধুলার নিজস্ব ভাষা। ফুটবল ক্যারিয়ার ছেড়ে কোচ হিসেবেও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ছুঁয়ে গেছে তার প্রভাব।
১৯৫৭ সালের নভেম্বরে সান্তোসের ভিলা বেলমিরো স্টেডিয়ামে সময় যেন থমকে গিয়েছিল। এক পাশে ১৭ বছরের পেলে, যিনি দিচ্ছিলেন ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। অন্য পাশে ৩৬ বছরের জিজিনহো—বিদায়ের প্রস্তুতিতে থাকা এক কিংবদন্তি। সেদিন সাও পাওলো ৬–২ গোলে জিতলেও ফলাফলের চেয়েও স্মরণীয় হয়ে থাকে তরুণ পেলেকে ঘিরে জিজিনহোর উত্তরাধিকার।
পেলে কখনোই জিজিনহোর মুগ্ধতা লুকাননি। এই ফুটবল কিংবদন্তি বহুবার বলেছেন, “আমি যত খেলোয়াড় দেখেছি, তাদের মধ্যে জিজিনহোই সেরা।” পেলের ভাষায়, জিজিনহো ছিলেন ‘কমপ্লিট প্যাকেজ।’ মিডফিল্ড বা আক্রমণ, ড্রিবলিং, সুযোগ তৈরি, প্রতিপক্ষ সামলানো, সবই ছিল তার আয়ত্তে। সমালোচনাও তাকে থামাতে পারেনি।

জিজিনহোর পুরো নাম থমাস সোয়ারেস দ্য সিলভা। তার জন্ম রিও ডি জেনেইরোর সাও গনসালোতে। ব্রাজিলিয়ান ক্লাব ফ্লামেঙ্গোর জার্সিতে তার উত্থান। এই দলের জার্সিতেই খেলেছেন ১৯৩৯ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত। সময়ের পরিক্রমায় বাঙ্গু, সাও পাওলো, উবেরাবা ও চিলির অডাক্স ইতালিয়ানোর হয়েও মাঠ মাতিয়েছেন তিনি। ফ্লামেঙ্গোর হয়ে টানা তিনবার রাজ্য শিরোপা জেতেন জিজিনহো। আর সাও পাওলোর হয়ে ১৯৫৭ সালে জেতেন আরও একটি শিরোপা। আর সেবারই তার মুখোমুখি হন পেলে।
বিশ্বকাপ খেলেছেন একবারই ছেলেছেন জিজিনহো। ১৯৫০ সালে বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল ব্রাজিলই। মারাকানাজোর বেদনা সত্ত্বেও জিজিনহো ছিলেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়দের একজন। যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচে তার পারফরম্যান্স আজও ব্রাজিলের সেরা স্মৃতির তালিকায় আছে। আর ফাইনালের ক্ষত আজীবন বয়ে বেড়ালেও জিজিনহোর অবদান অস্বীকার করতে পারবেন না কেউই। ৫৩ ম্যাচে ৩০ গোলের বাইরেও ছিল তার নেতৃত্ব, কৌশল আর নৈতিকতা।
দ্রুত ড্রিবল আর নিখুঁত পাসে নিজেকে আলাদা করে রেখেছেন জিজিনহো। আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হলেও প্রয়োজন হলে নিচে নেমে বল আয়ত্ব করা, আবার সুযোগ পেলে দুর্দান্ত ফিনিশিং—সবই মিলতো তার কাছ থেকে।

বুট জোড়া তুলে রেখে কোচিংয়ে এসেও প্রভাব কমেনি তার। ‘মেস্ত্রে জিজা’ নামে পরিচিত এই গুরু প্রভাব ফেলেছেন জারসন, জিকোর মতো কিংবদন্তির ওপর। জারসনের ভাষায়, “বল পেলে চারপাশটা দেখো—এটাই ছিল তার শিক্ষা।” আর জিকো পেয়েছিলেন জীবনের এক অনন্য পরামর্শ, ফ্লামেঙ্গোর জার্সি গায়ে লড়াই করার শিক্ষা, ব্যাজের গর্ব বুকে ধারণ করার দীক্ষা।
ট্রফি আর পরিসংখ্যানের বাইরে জিজিনহো রেখে গেছেন এক দর্শন। পেলের আগে পথ দেখানো সেই মাস্টারই ব্রাজিলের ফুটবলকে শিখিয়েছিলেন, খেলা কেবল জেতার নয়, খেলাটাকে অনুভব করারও।
এমএমএম/