আইডেন্টিটি ক্রাইসিস : ফাঁদে পড়ে কৌশল বদলের চিন্তায় ভারত

বিশ্বকাপের বড় ম্যাচ হেরে আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম থেকে ফেরার অভিজ্ঞতা নতুন নয় সূর্যকুমার যাদবের জন্য। আড়াই বছর আগে (ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফাইনালে) ভারতীয় ক্রিকেটের এক দুঃসহ রাতে তিনি সেই হতাশা দেখেছিলেন খুব কাছ থেকে। গত রোববার আবারও তেমন এক হতাশার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি, তবে এবার দলের অধিনায়ক হিসেবে।
এবারের ম্যাচটি বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো বড় না হলেও এর প্রভাব কম নয়। সুপার এইটের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ৭৬ রানের বড় ব্যবধানে হেরে গেছে স্বাগতিক ভারত। সেই সঙ্গে সেমিফাইনালে উঠার অঙ্ক নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের।
প্রোটিয়াদের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে সূর্যকুমার বলছিলেন, “কখনো কখনো ভাবতে হয়—আপনি যদি ১৮০–১৮৫ রান তাড়া করেন, পাওয়ারপ্লেতে ম্যাচ জেতা সম্ভব নয়, কিন্তু ম্যাচ হারাটা সেখানেই হয়ে যেতে পারে।”
কয়েক সপ্তাহ আগেও ভারতের মতো ব্যাটিং শক্তির দলের ক্ষেত্রে এমন মন্তব্য কল্পনাই করা কঠিন ছিল। টুর্নামেন্টে নামার আগে বিশ্ব ক্রিকেটে সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাটিং লাইন-আপ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছিল ভারতকে। ২০২৪ থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপ চক্রে তাদের সাফল্যের মূল ভিত্তিই ছিল আগ্রাসী পাওয়ারপ্লে ব্যাটিং। এই সময়টায় পাওয়ারপ্লেতে ওভারপ্রতি গড়ে প্রায় ১০ রান তুলেছে ভারত। সুপার এইটের দলগুলোর মধ্যে কেবল ইংল্যান্ডই এ ক্ষেত্রে তাদের ছাড়িয়ে গেছে।
*বিশ্বকাপ চক্রে বিভিন্ন পর্যায়ে রানরেট (ভারতের গ্রুপের দলগুলো)
| দল | পাওয়ারপ্লে (০–৬) | মিডল ওভার (৭–১৫) | ডেথ ওভার (১৬–২০) |
| ভারত | ৯.৮৭ | ৯.৫৯ | ১০.৪২ |
| দক্ষিণ আফ্রিকা | ৭.৭৯ | ৮.৯১ | ৯.০৮ |
| জিম্বাবুয়ে | ৮.৩৬ | ৭.৮২ | ৯.৭৫ |
| ওয়েস্ট ইন্ডিজ | ৭.৯১ | ৮.২৪ | ৯.৯১ |
তবে সূর্যকুমারের সতর্ক ভাবনা হঠাৎ করে আসেনি। চলতি বিশ্বকাপের গল্পটাই যেন এমন—বিভিন্ন ভেন্যুর ধীর ও মন্থর উইকেটে শুরুতেই বিপদে পড়ছেন ভারতের ব্যাটসম্যানরা। দিল্লিতে নামিবিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে ভারতের সহকারী কোচ রায়ান টেন ডেসকাটে বলেছিলেন, মুম্বাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে যা ঘটেছে তারপর ভারতের বিকল্প ব্যাটিং পরিকল্পনা ভাবা উচিত। সেই ম্যাচে পাওয়ারপ্লেতেই ৪৬ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বসেছিল ভারত। অধিনায়কের ইনিংসেই শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি জিতে যায় তারা।

যদিও নামিবিয়ার বিপক্ষে আবার পুরোনো ছন্দে ফিরেছিল দল। ছয় ওভারে ছিল ১ উইকেটে ৮৬ রান। ম্যাচে ২৪ বলে ৬১ রান করা ইশান কিষান তখনও বলেছিলেন, শুরুতে উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য কঠিন ছিল। অন্যদিকে অর্ধশতক করা হার্দিক পাণ্ডিয়া মন্তব্য করেন, এখন পর্যন্ত যে দুই উইকেটে তারা খেলেছে তা ব্যাটিংয়ের জন্য খুব সহায়ক ছিল না। তিনি বলেন, দল সমতল উইকেটই বেশি পছন্দ করবে।
তবে সেই পছন্দ ভারতের ব্যাটিং গভীরতার সঙ্গে কিছুটা বেমানান বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, অনুকূল উইকেটে গত দুই বছরে পাওয়ারপ্লেতেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়াই ছিল তাদের কৌশল। শুরুতে দ্রুত রান তুলে প্রতিপক্ষকে পরিকল্পনা বদলাতে বাধ্য করত ভারত, এরপর বাকি দুই পর্যায়েও চাপ ধরে রাখত। কিন্তু পরিস্থিতি যখন সেই সুযোগ দিচ্ছে না, তখন দলটিকে বেশ একমাত্রিক দেখাচ্ছে। গ্রুপ পর্বে যুক্তরাষ্ট্র এবং সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে শুরুতেই ধাক্কা খেয়েছে তারা। অ্যাসোসিয়েট (সহযোগী সদস্য) দলের বিপক্ষে শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়ালেও সুপার এইটে ২০২৪ বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট দক্ষিণ আফ্রিকা ভারতের প্রথম ছয় ওভারে ৩১ রানে ৩ উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচ প্রায় নিজেদের করে নেয়। পরে আর বৃত্ত ভাঙতে পারেনি ভারত।
ভারতীয় কোচ টেন ডেসকাটে বলেন, “আমি আগেও বলেছি—আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন উইকেটে খেলার উপায় বের করা, যেগুলো আমাদের পরিচিত কন্ডিশনের মতো নয়।” অর্থাৎ ভারতের ব্যাটিং দর্শনে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে—এমন উইকেটে যেখানে বল ব্যাটে আসতে সময় নেয়, এবং শুরু থেকেই বড় শট খেলা সবসময় সম্ভব নয়।
তবে দুই বছর ধরে ভিন্ন ধরনের, তুলনামূলক সহজ উইকেটে যে স্টাইলে ব্যাটিং করে সাফল্য পেয়েছে দল, সেটি হঠাৎ বদলানো সহজ নয়। এই সময়টায় শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করার স্বাধীনতাই পেয়েছেন টপ অর্ডারের ব্যাটসম্যানরা। সেই দর্শনের ওপরই গড়ে উঠেছে এই দলের পরিচয়। এখন প্রশ্ন—প্রথম বল থেকেই বড় শট খেলতে অভ্যস্ত ব্যাটসম্যানদের পক্ষে কি এই মুহূর্তে কৌশল বদলানো সম্ভব?
এফআই