বিজ্ঞাপন

দুই দশকের শিরোপা খরা: কেন বিশ্বমঞ্চে ফুটবলীয় আধিপত্য হারিয়েছে ব্রাজিল?

অ+
অ-
দুই দশকের শিরোপা খরা: কেন বিশ্বমঞ্চে ফুটবলীয় আধিপত্য হারিয়েছে ব্রাজিল?

বিশ্ব ফুটবল মানেই একসময় ছিল হলুদ জার্সির দাপট। কিন্তু আধুনিক ফুটবলের ট্যাকটিক্যাল বিবর্তনে কোথাও যেন খেই হারিয়ে ফেলেছে জোগো বনিতোর কারিগররা। ২০০২ সালের পর থেকে বিশ্বকাপের ট্রফিটা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছে, আর ব্রাজিল আটকে আছে কেবলই ফেভারিট তকমাতেই। মাঠের ফুটবলে জাদুকরী ড্রিবলিং আছে, কিন্তু নেই সেই খুনে মেজাজ। কেন সাম্বার ছন্দ আজ বেসুরো? ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে কার্লো আনচেলত্তির হাত ধরে কি ফিরবে সেই হারানো সাম্রাজ্য?

বিজ্ঞাপন

 

বারবারই বিশ্বমানের প্রতিভা আবিষ্কার করে ব্রাজিল। বর্তমান দলেও ভিনিসিয়াস জুনিয়র, রদ্রিগো বা রাফিনিয়াদের মতো তারকারা আছেন। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে এই ব্যক্তিগত দক্ষতাকে একটি সুসংগত অ্যাটাকিং সিস্টেমে রূপান্তর করা। গোল্ডেন এরাগুলোতে (যেমন ১৯৫৮-৭০ বা ১৯৯৪-২০০২) ব্রাজিলের ব্যক্তিগত জাদুর পাশাপাশি একটি শক্ত ট্যাকটিক্যাল কাঠামো ছিল, যা বর্তমান দলটিতে প্রায়ই অনুপস্থিত।

আধুনিক ফুটবলে ম্যাচ জেতা হয় মাঝমাঠে। ব্রাজিলের সাম্প্রতিক ব্যর্থতাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ক্যাসেমিরোর মতো অভিজ্ঞ বা ব্রুনো গুইমারেসের মতো সৃজনশীল মিডফিল্ডার থাকা সত্ত্বেও আক্রমণ ও রক্ষণের মাঝে গ্যাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের কাউন্টার অ্যাটাক সামলাতে গিয়ে মাঝমাঠের যে ফিল্টার প্রয়োজন, সেখানে ব্রাজিল বারবার ধরাশায়ী।

বিজ্ঞাপন

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে হারের পর কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন নেইমার।

 

অ্যালিসন বেকারের মতো বিশ্বসেরা গোলরক্ষক এবং গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েসের মতো ডিফেন্ডার থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল হজম করা ব্রাজিলের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বলিভিয়া বা জাপানের বিপক্ষে হার সেই মানসিক অস্থিরতাকেই ফুটিয়ে তোলে। ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও ৩ গোল হজম করে ম্যাচ হারা প্রমাণ করে যে, নক-আউট পর্বের বা বড় ম্যাচের প্রচণ্ড স্নায়ুচাপ নিতে দলটির বর্তমান প্রজন্ম হিমশিম খাচ্ছে।

 

গত দুই দশকে ইউরোপীয় দলগুলো (যেমন ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন) শারীরিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলায় অনেক এগিয়ে গেছে। ব্রাজিলের জোগো বনিতো বা সুন্দর ফুটবল এখন ইউরোপের ডাটা ড্রিভেন এবং কঠোর ডিফেন্সিভ ব্লকের সামনে বারবার থমকে যাচ্ছে। ইউরোপীয় লিগগুলোতে অধিকাংশ ব্রাজিলিয়ান তারকা খেললেও জাতীয় দলের জার্সিতে সেই ট্যাকটিক্যাল সমন্বয় আনতে ব্যর্থ হচ্ছেন কোচরা।

বিজ্ঞাপন

ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন (সিবিএফ) এবার দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কার্লো আনচেলত্তিকে কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। রিয়াল মাদ্রিদে বড় বড় তারকাদের ইগো সামলানো এবং ট্যাকটিক্যাল ব্যালেন্স বজায় রাখায় তিনি ওস্তাদ। আনচেলত্তির প্রধান কাজ হবে ব্রাজিলের চিরাচরিত আক্রমণাত্মক সৌন্দর্যের সাথে ইউরোপীয় ঘরানার রক্ষণাত্মক কাঠামোর সংমিশ্রণ ঘটানো।

কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল দল।

 

একনজরে ব্রাজিলের গত দুই দশকের বিশ্বকাপ যাত্রা:

২০০৬: কোয়ার্টার ফাইনাল (ফ্রান্সের কাছে হার)।

 

২০১০: কোয়ার্টার ফাইনাল (নেদারল্যান্ডসের কাছে হার)।

 

২০১৪: সেমিফাইনাল (জার্মানির কাছে ৭-১ বিপর্যয়)।

 

২০১৮: কোয়ার্টার ফাইনাল (বেলজিয়ামের কাছে হার)।

 

২০২২: কোয়ার্টার ফাইনাল (ক্রোয়েশিয়ার কাছে পেনাল্টিতে হার)।

 

ব্রাজিল মানেই কেবল রেকর্ড নয়, ব্রাজিল মানেই ফুটবলের আবেগ। তবে সেই আবেগ দিয়ে আর শিরোপা জেতা সম্ভব নয়। ২০২৬ সালে মেক্সিকো, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে যদি ব্রাজিল তাদের হারানো গৌরব ফিরে পেতে চায়, তবে তাদের জোগো বনিতোর সাথে আধুনিক ফুটবলের ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলার মিলন ঘটাতে হবে। অন্যথায়, ষষ্ঠ শিরোপার অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হতে পারে।

এমএমএম/