রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, ভঙ্গুর অর্থনীতিসহ দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সংকটে বিপর্যস্ত ছিল ইরাকের ফুটবলও। ফলে দীর্ঘ ৪০ বছর তারা ফিফা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। কঠিন সেই সময় পেরিয়ে ১৯৮৬ সালের পর আরেকবার মেগা টুর্নামেন্টটি খেলতে যাচ্ছে ইরাক। অবশ্য এবারও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের মাঝে অনুশীলনে ব্যাঘাত, ভিসা জটিলতাসহ তাদের কঠিন সব বাধা পেরোতে হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
মেক্সিকোর মন্টেরেতে আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফের ফাইনালে ইরাক ২-১ গোলে হারায় লাতিন দেশ বলিভিয়াকে। এর আগে গত কয়েক দশক ধরে যুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় নাজুক পরিস্থিতি ছিল ইরাকে। চলমান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে দেশটি সরাসরি জড়িত নয়, তবুও এর প্রভাব পড়ে তাদের বিশ্বকাপ যাত্রায়। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলতে দলটি আদৌ ভেন্যুতে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা নিয়েও ছিল সংশয়। দলীয় কর্মকর্তারা ফিফার কাছে ম্যাচটি পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন, তবে তা প্রত্যাখ্যাত হয়।
ইরাকের জন্য মেক্সিকোর বিমান ধরার আগে পুরো পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন। আঞ্চলিক যুদ্ধের কারণে ইরাকের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের সড়কপথে জর্ডানে যেতে হয়, যেখানে তাদের প্রায় ২০ ঘণ্টার ভ্রমণ করতে হয়। কোচ গ্রাহাম আর্নল্ডের চাপে শেষ পর্যন্ত ফিফা একটি চার্টার্ড ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে। জর্ডান থেকে পর্তুগালের লিসবন হয়ে মেক্সিকোর মন্টেরেতে পৌঁছায় ইরাক ফুটবল দল। এ ছাড়া তাদের অস্ট্রেলিয়ান কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড নিজেও ভোগান্তিতে পড়েন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ শহরে তিনি আটকে পড়ার কয়েকদিন পরে দুবাই হয়ে যোগ দেন মেক্সিকোয় থাকা দলের সঙ্গে। কোচের বিলম্বের কারণে হিউস্টনে নির্ধারিত অনুশীলন ক্যাম্পও বাতিল করতে হয়।

এর বাইরে ইরাকে মেক্সিকোর দূতাবাস না থাকায় ফুটবলারদের ভিসা পাওয়াও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে সৌদি আরব ও কাতারে অবস্থিত মেক্সিকান দূতাবাসের মাধ্যমে তাদের ভ্রমণ নথি সংগ্রহ করতে হয়। এসব ভোগান্তি অবশ্য স্মরণ করতে চাইলেন না ইরাকের কোচ আর্নল্ড, ‘পরিস্থিতি খুবই কঠিন ছিল। আমি চাই না এসব নিয়ে বেশি কথা বলতে। আমি চেষ্টা করেছি খেলোয়াড়দের মন থেকে এসব চাপ দূর রাখতে, কারণ মধ্যপ্রাচ্যে অনেক কিছুই ঘটছে।’ তবে চেক ক্লাব ভিক্টোরিয়া প্লজেনের হয়ে খেলা ইরাকের ডিফেন্ডার মেরচাস দোস্কি জানান, ‘আমি ইউরোপ থেকে সরাসরি মন্টেরেতে এসেছি, কিন্তু স্থানীয় লিগে খেলা অন্যদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।’
বিজ্ঞাপন
এশিয়ান অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাই থেকে সরাসরি বিশ্বকাপে ওঠার সুযোগ হাতছাড়া করেছিল ইরাক। তবে প্লে-অফ নিশ্চিত করেই উৎসবে মাতে দেশটি। সেই সময় বাগদাদে মানুষের উদযাপন দেখে অবাক হয়েছিলেন কোচ আর্নল্ড, কারণ তিনি জানতেই তাদের সামনে প্লে-অফ ফাইনালের মতো বড় ম্যাচ বাকি। বিশ্বকাপ নিশ্চিতের পর ইরাকের খেলোয়াড়রা কোচ আর্নল্ডকে কাঁধে তুলে নিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করেন, তার গায়ে জড়ানো ছিল ইরাকের পতাকা। পুরো কৃতিত্ব শিষ্যদের দিয়েছেন আর্নল্ড, ‘এই জয়ের কৃতিত্ব খেলোয়াড়দের। তাদের পরিশ্রম, লড়াইয়ের মানসিকতা এবং আত্মত্যাগই আমাদের জিতিয়েছে। আমি খুবই আনন্দিত যে আমরা ৪ কোটি ৬০ লাখ মানুষকে খুশি করতে পেরেছি, বিশেষ করে এই কঠিন সময়ে।’
বিশ্বকাপের খেলার স্বপ্ন সত্যি করার পথে মাঠের লড়াইয়েও ইরাককে দীর্ঘ ও কঠিন বাছাইপর্ব অতিক্রম করতে হয়েছে। চারটি ধাপে মোট ২১টি ম্যাচ খেলে তারা প্লে-অফে পৌঁছায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে দুই লেগের এশিয়ান প্লে-অফ খেলতে হয় ইরাককে। প্রথম লেগে আবুধাবিতে ১-১ ড্র করার পর বসরায় দ্বিতীয় লেগে অতিরিক্ত সময়ের ১৭তম মিনিটে আমির আল-আম্মারির পেনাল্টিতে ২-১ ব্যবধানে জয় পায় তারা। এদিকে, ইরাকের একমাত্র পূর্ববর্তী বিশ্বকাপ অংশগ্রহণও ছিল ১৯৮৬ সালে, সেটিও হয়েছিল মেক্সিকোতে। এবারও যুক্তরাষ্ট্র, কানাডার পাশাপাশি ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক মেক্সিকো।
বিজ্ঞাপন
আগামী ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর বিশ্বকাপ চলবে উত্তর আমেরিকায়। ইরাক টুর্নামেন্টের মূলপর্বে উত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের গ্রুপিং ও খেলার সূচিও নিশ্চিত হয়ে গেছে। ‘আই’ গ্রুপে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স ছাড়াও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নরওয়ে ও সেনেগাল। ১৬ জুন ফক্সবোরোতে ইরাক প্রথম ম্যাচ খেলবে নরওয়ের সঙ্গে।
এএইচএস
