খেলতে দেখলে রিংকুকে মারতেন বাবা, যেভাবে বদলে যায় তার চিন্তাধারা

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মাঝেই বাবা হারালেন ভারতীয় তারকা রিংকু সিং। এর আগে একফাঁকে লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবার কাছে হাসপাতালেও ছুটে গিয়েছিলেন, পুনরায় দলে যোগ দেওয়ার পর পেলেন অনাকাঙ্ক্ষিত শোক সংবাদ। যা শোকার্ত করে তুলেছে ভারতীয় দলের ড্রেসিংরুমও। একসময় সন্তানদের ক্রিকেট খেলতে দেখলে মারতেন বাবা খানচাঁদ সিং, পরবর্তীতে তার সেই ধারণা বদলায়। তবে ছেলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও নিজের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তিনি সিলিন্ডার বিলির কাজ চালিয়ে গেছেন।
রিংকুর বাবা খানচাঁদ সিং আজ (শুক্রবার) সকালে মারা গেছেন। গ্রেটার নয়ডার যথার্থ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। সম্প্রতি লিভার ক্যান্সারের চতুর্থ ধাপে পৌঁছে যাওয়া খানচাঁদের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। একপর্যায়ে ভেন্টিলেটর সাপোর্টেও রাখা হয় তাকে। সেখান থেকে তার যাত্রা হলো না ফেরার দেশে। প্রথমে ছেলের ক্রিকেট খেলা পছন্দ না হলেও রিংকুর পেশাদার ক্যারিয়ারে রয়েছে বাবার অসামান্য অবদান।
ভারতীয় ক্রিকেটের বিরাট সমর্থক খানচাঁদ এলপিজি সিলিন্ডার ডেলিভারিম্যানের কাজ করতেন উত্তরপ্রদেশের আলীগড়ে। আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ছেলেকে বড় ক্রিকেটার বানাতে তিনি সর্বোচ্চটা নিংড়ে দিয়েছেন। কিন্তু শুরুর দিকে তার চিন্তাভাবনা ছিল ভিন্ন। এক সাক্ষাৎকারে রিংকু বলেছিলেন, ‘বাবা যখনই কোথাও আমাদের ক্রিকেট খেলার কথা জানতেন, আমাদের মারতেন। তবে মায়ের সমর্থন ছিল।’ এমনকি রিংকু যাতে কানপুরে স্থানীয় টুর্নামেন্ট খেলতে যেতে পারেন, সেলক্ষ্যে প্রতিবেশী দোকানদারের কাছ থেকে ১০০০ রুপি ধার করে আনেন তার মা।
খানচাঁদ সিং এলপিজি গ্যাস ডেলিভারি করে মাসে ১২০০০ রুপি পারিশ্রমিক পেতেন। বিপরীতে রিংকুর মা বিনা দেবী ছিলেন গৃহিনী। অনেক বছর ধরে সিলিন্ডার কোম্পানির স্টকইয়ার্ডের দুটি কক্ষে কোনোমতে থাকত তার পরিবার। যখন তাদের আর্থিক সংকট ছিল প্রবল, তখন অবিরাম কাজ করে যেতেন খানচাঁদ। কখনও বাড়তি রোজগারের আশায় নির্ধারিত কাজের অতিরিক্ত সিলিন্ডারও বিলি করতেন তিনি। নিজের কাজকে এত ভালোবাসতেন, রিংকু ভারত জাতীয় দলে ক্যারিয়ার শুরুর পরও সেটি ছাড়েননি তার বাবা।
যা নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম আউটলুককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে খানচাঁদ বলেন, ‘তার অন্তত সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে এবং সে কিছু করার জন্য মরিয়া। তবে আমি অবশ্য রিংকুকে ক্রিকেটে মগ্ন থাকতে দেখে খুশি হতাম না, কিন্তু যখন দেখি সে খেলার বিনিময়ে টাকা পাচ্ছে তারপর ভাবলাম– এটা গুরুতর বিষয়।’ রিংকু তখন স্কুল টুর্নামেন্ট খেলতেন। সেখানকার এক ফাইনালে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়ার পর মোটরসাইকেল পান পুরষ্কার হিসেবে। সেই স্মৃতি জানিয়ে ভারতীয় এই তারকা জানান, ‘বাবা ফাইনাল খেলা দেখতে এসেছিলেন। যা দেখে নিশ্চয়ই তার নতুন উপলব্ধি হয় এবং এরপর আর কখনও আমাকে খেলার জন্য মারেননি।’
গত বছর রিংকু তার বাবাকে লাখো রুপি মূল্যের একটি কাওয়াসাকি নিঞ্জা ৪০০ স্পোর্টস বাইক উপহার দিয়ে খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন। তার বাবা খানচাঁদ সেই মোটরসাইকেল চালানোর একটি ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অনলাইনে, আর প্রশংসা কুড়ান রিংকু। সেই সময়কার কর্মস্থলের একটি মিশ্র অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হন খানচাঁদ, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে– সে (রিংকু) আমাদের জন্য আত্মসম্মান নিয়ে এসেছে। আগে আমার সঙ্গে গ্যাস এজেন্সির বস দুর্ব্যবহার করতেন, অশ্লীল গালিসহ লাঞ্ছিত করতেন অন্য শ্রমিকদের মতো। তিনি এখন আমার সঙ্গে সম্মান দিয়ে কথা বলেন এবং “সাহেব” বলে ডাকেন।’
জাতীয় দলের পাশাপাশি আইপিএলে পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়ে তারকা ব্যাটার বনে গেছেন রিংকু। আর্থিকভাবেও তার জীবন এখন বেশ উন্নত, তবে নতুন বাড়ি কিনলেও পার্শ্ববর্তী পুরোনো বাড়িতে থাকেন তার বাবা-মা। সেই প্রসঙ্গে খানচাঁদ বলেছিলেন, ‘রিংকু আমাকে চাকরি ছেড়ে তার সঙ্গে নতুন বাড়িতে চলে যেতে বলে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে– আমি এই কাজ ছেড়ে দেওয়ার পর কী করব? আমি তো বেকার হয়ে যাব। সৌভাগ্যবশত আমাদের অনেক টাকা ও আয়েশের সুযোগ আছে। কিন্তু দিনশেষে কি করে ভুলি আমরা কোথায় থেকে এসেছি?’
এএইচএস