ঘুমন্ত সিডনিতেও জাগ্রত ‘বাংলাদেশের’ লাকাম্বা

‘আর্লি টু বেড, আর্লি টু রাইজ’ প্রবাদটি অস্ট্রেলিয়ার সিডনির সঙ্গে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ। সন্ধ্যা ৭টা-৮টার পর সিডনির দোকানপাট পুরোপুরি বন্ধ। একেবারে ঘুমন্ত নগরী। শুধু ব্যতিক্রম লাকাম্বা। সিডনি ঘুমালেও ঘুমায় না লাকাম্বা, বরং ঘুমাতে দেয় না বাংলাদেশিরা।
রাত যত বাড়ে লাকাম্বার আড্ডা তত দীর্ঘ হয়। পেশাগত কাজ, পারিবারিক ব্যস্ততা শেষে সবাই এসে লাকাম্বায় প্রাণের আড্ডায় শামিল হয়। বাংলাদেশিদের পদচারণায় মুখর থাকে এই এলাকা। বিশেষ করে রমজান মাসে লাকাম্বা যেন আরও বর্ণিল। বৃহস্পতিবার-রোববার রাতকেও আনুষ্ঠানিকভাবে লাকাম্বা নাইট ঘোষণা। এসব রাতে লাকাম্বার কয়েকটি সড়কে যানবাহন চলাচল করে না।
ঘড়ির কাটায় রাত ৮টা পার হলে সিডনিতে রেস্টুরেন্ট খোলা পাওয়া খুব কঠিন। সেখানে লাকাম্বায় রোজার সময় দোকানে বেচা-কেনা চলে প্রায় সেহরি পর্যন্ত। অন্য মাসেও অন্তত রাত একটা থেকে দুইটা পর্যন্ত। শুধু সেহরি নয়, ইফতারের সময় লাকাম্বা বেশ প্রাণবন্ত থাকে। রাস্তাজুড়ে বসে ইফতারের সমাহার। লাকাম্বা বাংলাদেশিদের পাশাপাশি মুসলিমদেরও আবাস। আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক মুসলিম দেশের নাগরিকগণ লাকাম্বায় ইফতার সংগ্রহ করতে আসেন। তারাবির নামাজও আদায় করেন লাকাম্বার মসজিদে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রতি রাজ্যেই বাংলাদেশি রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি সিডনিতে। আর সেই সিডনির মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশির অবস্থান লাকাম্বায়। বাংলাদেশি খাবার, সেলুন থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় সকল জিনিসই রয়েছে। সেসবও আবার পুরোপুরি বাংলাদেশি স্বাদ। তাই লাকাম্বা যেন অস্ট্রেলিয়া ভূখণ্ডে একটুকরো ‘বাংলাদেশ’।
লাকাম্বা স্টেশনের সামনেই একটি বড় দোকান, যাতে বাংলায় লেখা ‘কাওরান বাজার’। ঢাকার অতি পরিচিত বাজারের নাম সিডনিতে। এই দোকানের মালিক কামরুল ইসলাম। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন প্রায় দুই দশক। দোকানের নাম কাওরান বাজার দেওয়ার কারণ সম্পর্কে বলেন, ‘প্রায় এক যুগ আগে এখানে দোকানের নাম কাওরান বাজার দিয়েছি। কাওরান বাজার ঢাকার সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ একটি বাজার। সেটা ধারণ করেই সিডনিতে (এই নাম) দেওয়া।’
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশি বা বাংলায় দোকানের নামের ব্যাপারে তেমন কোনো জটিলতা নেই। ফলে এখানে বৈশাখী, রাধুনি’র মতো রেস্টুরেন্টও রয়েছে। যেখানে রুই মাছ, শাক থেকে শুরু করে দেশীয় প্রায় সকল খাবারই পাওয়া যায়। দেশি ফল, শাকসবজিও আছে হাতের নাগালে। খাবার, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়াও সেলুন, মোবাইলসহ সবকিছুর সমাহারেই লাকাম্বায় রয়েছে বাংলাদেশের উপস্থিতি।
সিডনি বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল শহর। সিডনির অন্য অঞ্চলের চেয়ে লাকাম্বার ব্যয় খানিকটা কম। ধীরে ধীরে বাংলাদেশিদের আবাসস্থল হয়ে উঠে লাকাম্বা। সিডনির প্রায় মাঝামাঝি অবস্থান হওয়ায় খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে যেকোনো প্রান্তে যাওয়া যায়। ফলে বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে আসা সবাই অন্তত একপাক ঘুরে দেখেন লাকাম্বা।
সিডনিতে আসা বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি। তাদের প্রায় অনেকেই লাকাম্বায় অবস্থান করেন। তার নেপথ্য কারণ– শিক্ষার্থী অবস্থায় আয় সীমিত, দেশ ছাড়ার পর দেশীয় আবহে থাকা এবং স্বল্প ব্যয়ে জীবনযাপনের জন্য লাকাম্বা বেছে নেওয়া। প্রায় বছর পাঁচেক সিডনিতে অবস্থান করা বাংলাদেশি প্রবাসী অর্ক হাসান বলেন, ‘জীবনযাত্রার ব্যয়, যোগাযোগ, খাবার, দেশীয় বন্ধুত্ব নানা কারণেই লাকাম্বা কয়েক বছরের পরম্পরায় মিনি বাংলাদেশে পরিণত হয়েছে। সিডনির অন্য সব এলাকার চেয়ে লাকাম্বার স্বাতন্ত্র্যতা ভিন্ন।’
নারী এশিয়ান কাপ টুর্নামেন্ট কাভার করতে আসা বাংলাদেশি সাংবাদিক ইমরান হোসেন লাকাম্বায় বাংলাদেশিদের উপস্থিতিতে বেশ অভিভূত। তার প্রতিক্রিয়া, ‘লাকাম্বায় বাংলাদেশিদের নিয়ে গণমাধ্যমে নানা প্রতিবেদন দেখেছি। রোজার সময় নারী এশিয়ান কাপ কাভার করতে এসে নিজেই অভিজ্ঞতার স্বাক্ষী হলাম।’
এজেড/এএইচএস