জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে একটি প্রতারক চক্র ‘মেধা বৃত্তি’ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করার ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা অগ্রণী ব্যাংক একে অপরকে দোষারোপ করছে।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে ফিনান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী ফুতি রায় বলেন, গত ২০ ডিসেম্বর (শনিবার) রাত আনুমানিক ৯টার পর দুটি নম্বর থেকে ফোন করে একটি প্রতারক চক্র আমাকে জানায়, আমি নাকি একটি ‘বোর্ড বৃত্তি’ পেয়েছি, যার পরিমাণ প্রায় ১৮ হাজার টাকা। অথচ বাস্তবে আমি কোনো বোর্ড বৃত্তির আওতায় ছিলাম না। তারা দাবি করে, আগের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো যাচ্ছে না, তাই দ্রুত প্রাইম ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নম্বর অথবা এটিএম কার্ডের ১৬-ডিজিট নম্বর দিতে হবে, নইলে ওই রাতেই টাকা বাতিল হয়ে যাবে। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় আমি বুঝতে পারি, এটি একটি প্রতারণা এবং সঙ্গে সঙ্গে নম্বর দুটি ব্লক করে দিই। ব্লক করার পরও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কল আসতে থাকে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো প্রতারকরা আমার নাম, বিভাগ, ব্যাচ, মায়ের নাম, নমিনি-সংক্রান্ত তথ্য, মোবাইল নম্বর এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরসহ অত্যন্ত সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য জানত। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, কোথাও থেকে বড় পরিসরে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া, আবিদ নামে আরেক শিক্ষার্থী জানান, ২৬ ডিসেম্বর দুপুরে আমার বাবার নম্বরে কল দিয়ে প্রতারক চক্র আমার নাম থেকে শুরু করে এনআইডি নম্বরসহ সব তথ্য বলে। তারা জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেওয়া আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বৃত্তির টাকা যাচ্ছে না। তারা ডাচ-বাংলা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক বা ডেবিট কার্ডের নম্বর চায় এবং অ্যাকাউন্ট নম্বর না দিলে টাকা পাব না বলে জানায়। পরে বাবা আমার মামার ডেবিট কার্ডের নম্বর দিলে চক্রটি ই-মেইলে ওটিপি কোড পাঠায় এবং কার্ডে থাকা চার হাজার টাকা তাদের অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৫৪তম আবর্তনের শিক্ষার্থী সাজিয়া আফরিন ঢাকা পোস্টকে জানান, সম্প্রতি অচেনা একটি নম্বর থেকে ফোন আসে তার বাবার মোবাইলে। কলকারী নিজেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বলছে দাবি করে সাজিয়ার নাম, বিভাগ, বর্ষ সব তথ্য জানায়। এরপর জানানো হয়, তার মেধাবৃত্তির টাকা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সমাধানের জন্য প্রয়োজন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর ও ওটিপি। সন্তানের সঠিক তথ্য জানার কারণে সন্দেহ থাকলেও শেষ পর্যন্ত ওটিপি দেন সাজিয়ার বাবা। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার অ্যাকাউন্ট থেকে ১০ হাজার টাকা উধাও হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই ধারণা করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অনলাইন আবেদন ফর্ম, বৃত্তি-সংক্রান্ত তথ্যপত্র, অভ্যন্তরীণ ডেটাবেইস বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে থাকা অগ্রণী ব্যাংক থেকেই এসব তথ্য ফাঁস হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের উচ্চ শিক্ষা ও বৃত্তি শাখার ডেপুটি রেজিষ্ট্রার লুৎফর রহমান আরিফ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের অফিস থেকে এমন কিছু হওয়ার সুযোগ নেই। কারা বৃত্তি পেয়েছে, সেই তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। সেখান থেকেই প্রতারকরা তথ্য পেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ওয়েবসাইটে শুধু বৃত্তিপ্রাপ্তদের নাম থাকে। বাবা–মায়ের নাম বা ব্যাংক তথ্য সেখানে নেই। এসব তথ্য ভর্তি-সংক্রান্ত কাগজে শিক্ষা শাখায় জমা দেওয়া হয়।
ডেপুটি রেজিস্ট্রার (শিক্ষা) সৈয়দ মোহাম্মদ আলী রেজা বলেন, আমাদের এখান থেকে তথ্য লিক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সময় যে ফর্ম পূরণ করা হয়, সেখানে বাবা–মায়ের নাম, নমিনি ও ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া থাকে। সেখান থেকেই তথ্য বের হতে পারে।
জাবির ভর্তি, পরীক্ষা ও বৃত্তি-সংক্রান্ত সব আর্থিক লেনদেন অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে হয়। ব্যাংকের সার্ভারে শিক্ষার্থীদের ব্যাংকিং-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকে।
তবে অগ্রণী ব্যাংকের শাখা প্রধান ও সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. আব্দুর রহমান বলেন, আমাদের কাছে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য থাকে না। বৃত্তির টাকা প্রশাসন থেকে আমাদের ব্যাংকে আসে। আমাদের সার্ভার কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত। যদি এখান থেকে তথ্য লিক হতো, তাহলে সবার টাকাই চুরি হতো।
এ ব্যাপারে বিদ্যালয়ের উপউপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সোহেল আহমেদ বলেন, এটি অত্যন্ত সেনসিটিভ ইস্যু। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা স্টেপ নেব। পুলিশ প্রশাসনের সহায়তা চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। আগামী অ্যাকাডেমিক মিটিংয়ে আমরা এ নিয়ে আলোচনা করবো।
এএমকে