করোনায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে ক্যাম্পাস। ক্যাম্পাস খুলে দেওয়ার পর থেকে ভেতরের সড়কগুলোতে শুরু হয় ভারী যানবাহনের অবাধ চলাচল। ক্যাম্পাসে বেড়েছে ভবঘুরে ও বহিরাগতদের আসা-যাওয়া। এতে শিক্ষার পরিবেশ ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে বলে মনে করেছেন শিক্ষার্থীরা।

সম্প্রতি ট্রাকের ধাক্কায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী আহত ও ভবঘুরের দ্বারা এক ছাত্রী লাঞ্ছিত হন। ঘটনা দুটির পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানাভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আসছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্যাম্পাসে ভারী যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি ভবঘুরে ও বহিরাগতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। 

ঢাবি ক্যাম্পাসে ভারী যান

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি গেট, মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ, ভিসি চত্বর, দোয়েল চত্বর, কার্জন হল, রোকেয়া হল ও গ্রন্থাগার গেটের সামনের এলাকা, রাজু ভাস্কর্য ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশপাশ শিক্ষার্থীদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। একটু সতর্ক না হলেই শিক্ষার্থীদের পড়তে হচ্ছে ভারী যানবাহনের কবলে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কার্জন হল, শামসুন নাহার হল, রোকেয়া হল, সুফিয়া কামাল হল, ডাস চত্বর, গুরুদুয়ারা নানকশাহী এবং শহীদ মিনার এলাকায় ভবঘুরে ও মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। মেয়ে শিক্ষার্থী দেখলেই তারা বিভিন্ন ভাবভঙ্গির মাধ্যমে হয়রানির চেষ্টা করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী আশরেফা খানম তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, শামসুন নাহার হল থেকে টিএসসির রাস্তাটা পার হওয়া যেন হাইওয়ে পার হওয়ার সমান। আমাদের একদম গা ঘেঁষে  সেদিন বড় একটি ট্রাক দ্রুতগতিতে চলে গেল, এক সেকেন্ড দেরি হলে চাপা পড়তাম। আর বহিরাগত, ভিক্ষুক, বাচ্চাদের জন্য তো দাঁড়ানো যায় না। এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না।

 সড়কে গাড়ির সারি

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত তাবাসসুম ফেসবুক পোস্টে লেখেন, কোনোদিন ভাবিনি ক্যাম্পাসের মধ্যে এভাবে কেউ হয়রানি করবে। টিএসসিতে হঠাৎ কেউ একজন আমার পিঠে, কাঁধে হাত দিয়ে যায়। পেছন ফিরে দেখি একজন ভবঘুরে লোক। প্রক্টোরিয়াল টিমের কাজটা আসলে কী? আমাদের নিরাপত্তা কারা দেবে? যেকোনো মূল্যে ক্যাম্পাসের পরিবেশ ঠিক করা জরুরি।

এসব বিষয়ে ছাত্র অধিকার পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আকরাম হোসাইন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ক্যাম্পাস খোলার পর থেকেই শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ভূমিকা রাখছে না। আমরা দ্রুত এসবের সমাধান চাই, নিরাপদ ক্যাম্পাস চাই। 

নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবি জানিয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ক্যাম্পাসে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ হওয়া দরকার। তবে সাধারণ যানবাহনের জন্য ক্যাম্পাস উন্মুক্ত থাকবে। ক্যাম্পাসকে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ হিসেবে গড়ে তোলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অন্যতম দায়িত্ব।

ক্যাম্পাসে বাড়ছে বহিরাগতদের আনাগোনা

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানী ঢাকা পোস্টকে বলেন, করোনাকালে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকা অবস্থায় আমরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিলাম। এখন সারা ঢাকা শহর খুলে দেওয়া হয়েছে, যার সুযোগ নিচ্ছে এক শ্রেণির মানুষ। তারা অহেতুক ক্যাম্পাসে এসে বসে থাকে, পরিবেশ নষ্ট করে। আমরা মাইকিং এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় তুলে দিচ্ছি, তারা আবারো আসছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি, এটি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। যেহেতু এটি ওপেন ক্যাম্পাস, সেহেতু সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে ছাত্র-শিক্ষক-প্রশাসন সবার সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।

ভারী যানবাহন চলাচলের বিষয়ে প্রক্টর বলেন, ভারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণের জন্য আমরা ইতোমধ্যে ডিএমপি কমিশনারকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। আমাদের কোনো কিছু একদমই বন্ধ করার সুযোগ নেই, যেহেতু সব রাস্তা খোলা থাকে। সবকিছু সীমিত করার জন্য আমরা ফরমালি চিঠি দিয়েছি। আশা করছি দ্রুত এর সমাধান হবে।

বহিরাগতদের বিষয়ে তিনি বলেন, করোনার কারণে অনেক মানুষ স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছে, তাদের অনেকেই এখন ক্যাম্পাসে ভিড় করছে। বিষয়টি আমরা দেখব, যতটা সম্ভব, দ্রুত কমিয়ে আনার চেষ্টা করব। শিক্ষার্থীরা যখনই কোনো সমস্যার মুখোমুখি হবে, ফিল করবে, আমাদের জানাবে। তাদের জন্যই তো এই ক্যাম্পাস, তাদের নিরাপদ রাখার জন্য আমরা আছি।

এইচআর/আরএইচ