মেহেরপুরে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে ব্রয়লার মুরগির দাম। নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে তা। মুরগির দামের লাগাম টেনে ধরতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ক্রেতারা। মুরগির খাবার ও বাচ্চার দাম বৃদ্ধি এবং বাচ্চার কৃত্রিম সংকটের কারণে ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও খামারিরা।

মেহেরপুরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে জানা গেছে, কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এতে  খামারি, ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা কেউ খুশি নন। দাম বৃদ্ধির জন্য একে অপরকে দোষারোপ করছেন তারা। খাবার ও বাচ্চার দাম বেড়ে যাওয়ায় মুরগির দাম বাড়লেও লাভবান হচ্ছে না কেউ। তবে বাচ্চা উৎপাদনে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বেশি দাম নেওয়ায় লাভবান হচ্ছেন বাচ্চা উদপাদনকারী হ্যাচারি মালিক ও বিক্রেতারা।

ব্রয়লার মুরগির ওজন অনুপাতে দাম নেওয়া হচ্ছে। দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের ব্রয়লার মুরগির দাম নেওয়া হচ্ছে কেজি প্রতি ২৫০ টাকা। ওজন আরও বেশি হলে তার দাম ২৮০ টাকা থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। লেয়ার ও কক মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকায়। দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত।

কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এতে  খামারি, ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা কেউ খুশি নন। দাম বৃদ্ধির জন্য একে অপরকে দোষারোপ করছেন তারা। খাবার ও বাচ্চার দাম বেড়ে যাওয়ায় মুরগির দাম বাড়লেও লাভবান হচ্ছে না কেউ। তবে বাচ্চা উৎপাদনে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বেশি দাম নেওয়ায় লাভবান হচ্ছেন বাচ্চা উদপাদনকারী হ্যাচারি মালিক ও বিক্রেতারা

গাংনী উপজেলার মালশাদাহ গ্রামের নাজ পোল্ট্রি খামারের মালিক মুক্তার আলী জানান, মুরগি পালনে তার ছয়টি শেড রয়েছে। হঠাৎ বাচ্চা সংকট ও দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনটি শেড বন্ধ রেখেছেন। বাকি তিনটি শেডে সাড়ে ৩ হাজার ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা নিয়েছেন ২৫ দিন আগে। আর ১০ দিন পর তিনি মুরগি বিক্রি শুরু করবেন। উৎপাদনকারী ফার্ম থেকে অনলাইনে অর্ডার করে আনেন তিনি। দুই মাস আগে যে বাচ্চা কিনতেন ১০ থেকে ১২ টাকায়। সেই বাচ্চার দাম বেড়ে হয়েছে ৬৫ টাকা। দাম দিলেও চাহিদা অনুযায়ী বাচ্চা পাননি।

তিনি আরও জানান, এর আগে মোটা অংকের টাকা লোকসান হয়েছে। মুরগির দাম বেড়েছে বলে এবার কিছু লাভের আশা করছেন। বাচ্চা সংকট ও দাম কমলে বন্ধ শেডগুলোতেও মুরগি পালন করার ইচ্চা রয়েছে তার।

প্রাণিসম্পদ বিভাগ কোনো সহায়তা করে না অভিযোগ করে মুক্তার আলী বলেন, প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে আমাদের কোনো খোঁজ নেয় না। ওষুধপত্র ঠিকমতো পাওয়া যায় না। যা পাওয়া যায় তা হয়তো মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিম্নমানের। এ সকল ভ্যাকসিন বা মেডিসিন প্রয়োগ করলে মুরগি মারা যায় এবং অসুস্থ হয়। তাই বাইরে থেকে মেডিসিন কিনে ব্যবহার করি। বর্তমানে মেডিসিনের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। এভাবে চলতে থাকলে মেহেরপুরের পোল্ট্রি খামারিরা পথে বসবে।

গাড়াডোব গ্রামের পোল্ট্রি খামারি গিল্টু মিয়া বলেন, এখন অনেকেই মনে করছেন মুরগির দাম বেড়েছে। আসলে বাচ্চা, খাবার ও মেডিসিনের দাম হিসেব করলে মুরগির দাম কম। তবে ব্রয়লারের ক্রেতারা বেশি দামের কারণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এটা সত্য। আমরা যারা খামারি রয়েছি তারা লাভটা পাচ্ছি না। পাচ্ছে বাচ্চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। বাচ্চার চাহিদা দিলে বাচ্চা নেই বলে দাম বেশি চাচ্ছেন অনেক হ্যাচারির ডিলাররা।

এ বিষয়ে মুরগির বাচ্চা বিক্রেতা কয়েকজন ডিলাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তারা কথা বলতে চাননি।

মেহেরপুর শহরের মুরগি ব্যবসায়ী ছানোয়ার হোসেন বলেন, যে মুরগি পাইকারি কিনতাম ৯০ থেকে ১০০ টাকা। সেই ব্রয়লার মুরগি এখন পাইকারি ২৩০ থেকে ২৩৫ টাকায় কিনে ২৫০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। মুরগির দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাও কমে গেছে। যারা সপ্তাহে দুদিন মুরগি কিনতে আসতেন তারা এক দিনও আসছেন না। যারা আসছেন তারা কম করে কিনছেন। দাম কম হলে সারাদিন ক্রেতা লেগেই থাকত। এখন বাজার প্রায় ক্রেতাশূন্য।

ব্যবসায়ী মুন্টু মিয়া বলেন, মুরগির দাম বেশি এটা মানুষের চোখে পড়ছে। কিন্তু একটি মুরগিতে কয় কেজি খাবার খায়, খাবারের দাম কত, বাচ্চার দাম কত এসব হিসেব করা হলে মুরগির দাম তুলনামূলক কম। তবে মুরগির দাম বেড়েছে এটা ঠিক। দাম বাড়ার কারণে ক্রেতাও কমেছে। আমাদের বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে। খাবার ও মুরগির বাচ্চার দাম নিয়ন্ত্রণ করা হলে মুরগির দাম এমনিতেই কমে যাবে। কারণ ছোট বড় সকল খামারি তখন মুরগি পালন করতে আগ্রহ দেখাবে। মুরগির উৎপাদন বাড়লে চাহিদা পূরণ হবে।

ব্রয়লার মুরগির ক্রেতা রেহেনা খাতুন বলেন, গরু ও খাসির মাংসের অনেক দাম। কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নেই এবং তা দিয়ে আতিথেয়তা ও মেহমানদারি করা যায় না। খুব সহজেই মেহমানদারি করা যেত ব্রয়লার মুরগি দিয়ে। এখন আর সেই সুযোগও থাকছে না। ১ কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ২৫০ টাকা। অর্থাৎ ৫০০ টাকার নিচে মুরগি হচ্ছে না। আমরা গরিব ও দিনজমুর মানুষ। এতো দামের ব্রয়লার খাওয়া খুবই কষ্টের।

শুধু রেহেনা খাতুনই নয়, ব্রয়লার মুরগির দোকানে কথা হয় জাব্বারুল ও আব্দুল মতিনের সঙ্গে। তারা জানান, ১০০ থেকে ১২০ টাকার ব্রয়লার মুরগি হঠাৎ ২৫০ টাকা কেজি হয়ে গেছে। আত্মীয়দের আপ্যায়ন ও পরিবারের চাহিদা মেটাতে ব্রয়লারের বাজারে গেলে  বুক ফেটে যাচ্ছে। এটা দেখার দায়িত্ব সরকারসহ সংশ্লিষ্ঠদের। তা না হলে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে , সেই সঙ্গে ক্রেতা সাধারণ দিশেহারা হয়ে পড়বে।

মুরগির খাবারের ব্যবসায়ী শিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা যেভাবে খাবার কিনছি, সেভাবে বিক্রি করছি। তবে খাবারের দাম কেজি প্রতি তিন থেকে চার টাকা বেড়েছে। অনেকেই এমন সুযোগ নিয়ে বেশি দামে মুরগি বিক্রি করছে।

মেহেরপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমান বলেন, মেহেরপুর জেলায় ছোট বড় ৬৮২টি ব্রয়লার মুরগির খামার রয়েছে। ব্রয়লার মুরগি পালনে বিভিন্নভাবে সব ধরনের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ব্রয়লার উৎপাদনে প্রণোদনার মাধ্যমেও খামারিদের সহায়তা ও উৎসাহিত করা হচ্ছে। তবে বিভিন্ন সংকটে কতগুলো খামার বন্ধ রয়েছে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই জেলা অফিসে।

মুরগির দাম বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান বাচ্চা উৎপাদন করে থাকে। বাচ্চা উৎপাদনকারী হ্যাচারিগুলো ঢাকায়। বিভিন্ন ডিলারের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় বাচ্চা বিক্রি করে। বাচ্চা উৎপাদনকারী হ্যাচারিগুলো দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের কিছুই করার নেই। ব্রয়লার মুরগির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম বেড়েছে সারাদেশে। তবে বাচ্চা ও খাবারের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি তদারকি করা হচ্ছে। আমরা আমাদের দপ্তর থেকে যে পদক্ষেপ নেওয়ার বিধান রয়েছে সে মোতাবেক পদক্ষেপ গ্রহণ করব।

আরএআর