নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে বাবা–ছেলে দুজনই প্রার্থী হওয়ায় নির্বাচনী মাঠে তৈরি হয়েছে ভিন্নমাত্রার আলোচনা। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ ও তার বাবা আমিরুল ইসলাম মোহাম্মদ আবদুল মালেক পৃথক দল থেকে একই আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। দুজনের দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বাবার তুলনায় হান্নান মাসউদের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৮ গুণ বেশি।

জেলা রিটার্নিং কার্যালয়ে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, হান্নান মাসউদের হাতে বর্তমানে নগদ রয়েছে ৩৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে তার বাবা আমিরুল ইসলাম মোহাম্মদ আবদুল মালেকের কাছে নগদ টাকার পরিমাণ ১ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। সে হিসেবে ছেলের কাছে বাবার তুলনায় ১৮ গুণের বেশি নগদ অর্থ রয়েছে।

হলফনামায় হান্নান মাসউদ নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতায় তিনি আলিম (উচ্চমাধ্যমিক সমমান) পাস। তিনি ঢাকার ‘ডিজিল্যান্ট গ্লোবাল’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক বলে উল্লেখ করেছেন। তার বাৎসরিক আয় দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এ ছাড়া, তার নামে বন্ড ও ঋণপত্রে রয়েছে এক লাখ টাকা, স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু ৮ লাখ টাকা, ইলেকট্রনিক সামগ্রী এক লাখ টাকা এবং আসবাবপত্র এক লাখ টাকার।

অন্যদিকে বাবা আমিরুল ইসলাম মোহাম্মদ আবদুল মালেকের আয়ের প্রধান খাত কৃষি। হলফনামা অনুযায়ী, তার ইলেকট্রিক সামগ্রীর মূল্য ২৫ হাজার টাকা এবং আসবাবপত্রের মূল্য ৭৫ হাজার টাকা।

হলফনামার তথ্যমতে, হান্নান মাসউদের বয়স ২৫ বছর এবং তার বাবার বয়স ৬৫ বছর। বাবা–ছেলে দুজনই হাতিয়া উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের উত্তর সাগরিয়া গ্রামের একই বাড়িতে বসবাস করেন। সেখানে টিনশেড ঘর ভেঙে একটি আধাপাকা ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। বাড়ির সামনে ও পেছনে দুটি পুকুর রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাবা–ছেলে একই আসনে প্রার্থী হওয়াটা যেমন কৌতূহলের বিষয়, তেমনি সম্পদের বড় পার্থক্য অনেক প্রশ্নও তুলছে। একদিকে হান্নান মাসউদ তরুণ ও রাজনীতিতে সক্রিয়— এটা ইতিবাচকভাবে দেখছেন অনেকে। আবার অল্প বয়সে এত সম্পদের বিষয়টি নিয়ে কিছু ভোটারের মধ্যে সন্দেহও আছে। ভোটাররা এখন প্রার্থীদের ব্যক্তিগত সম্পদের চেয়ে তাদের সততা, অতীত কর্মকাণ্ড ও এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা কী হবে— সেটাই বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন বলে মনে করি।

হলফনামায় উল্লেখিত সম্পদের বিষয়ে জানতে চাইলে আমিরুল ইসলাম মোহাম্মদ আবদুল মালেক বলেন, আমার মোট সম্পত্তির বিবরণ হলফনামায় উল্লেখ করেছি। যা সত্য তাই তুলেছি। বাড়িয়ে কিংবা কমিয়ে কিছু লেখা হয়নি। এ বিষয়ে এর বেশি কিছু বলতে চাই না।

এ বিষয়ে আব্দুল হান্নান মাসউদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ছাত্র অবস্থায় টিউশনি এবং পরবর্তীতে ব্যবসা থেকে আমার আয় হয়েছে। টকশোসহ বিভিন্ন মাধ্যমে মাসে গড়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় হয়েছে, যা হিসাব করলে গত এক বছরে মোট আয় দাঁড়ায় ৬ লাখ টাকা— এ তথ্য হলফনামায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। বিয়ে ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে পাওয়া উপহারও আয়ের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

তিনি বলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার ক্ষেত্রে বাৎসরিক আয়ের বদলে সম্পদের বিবরণকে সামনে এনে মুখরোচক সংবাদ করা হচ্ছে। দুঃখজনকভাবে বলা হচ্ছে আমার সম্পদ ৯৮ লাখ টাকা—যা সম্পূর্ণ ভুল। হলফনামায় আমার ব্যক্তিগত সম্পদ দেখানোই হয়নি; সেখানে শুধু ব্যাংকে ২ হাজার ৫৫ টাকা জমা এবং ব্যবসার লাইসেন্সের বিপরীতে কিছু অর্থের উল্লেখ আছে। হলফনামা না পড়েই সামাজিক মাধ্যমে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যা সত্য নয়।

প্রসঙ্গত, নোয়াখালী–৬ (হাতিয়া) আসনে এবারের নির্বাচনে মোট ১৪ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এ নির্বাচনে আব্দুল হান্নান মাসউদ এনসিপির হয়ে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে এবং তার বাবা আমিরুল ইসলাম মোহাম্মদ আবদুল মালেক বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) হয়ে ‘একতারা’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

হাসিব আল আমিন/এমজে