নোটিশ ছাড়াই সংযোগ বিচ্ছিন্নের অভিযোগ নেসকো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে
নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম। ফাইল ছবি
সংযোগ দেওয়ার সাত দিনের মাথায় কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের ঘটনা ঘটেছে। পরে গ্রাহকের সঙ্গে অসদাচরণ ও হয়রানির অভিযোগে নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো), ঠাকুরগাঁও বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে লিগ্যাল এইড অফিসে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এক গ্রাহক।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারী ফিরোজ জামান ঠাকুরগাঁও পৌরসভার হাজিপাড়া এলাকার বাসিন্দা।
বিজ্ঞাপন
জানা গেছে, নিজ বসতবাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে ২০২৫ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে নেসকোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগে আবেদন করেন ফিরোজ জামান। হোল্ডিং নম্বর, টিন সনদ, জমির দলিল, খারিজ খাজনাসহ সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইয়ের পর নেসকো কর্তৃপক্ষ পরপর দুই দফা সার্ভে সম্পন্ন করে। এরপর গত ৬ নভেম্বর ভুক্তভোগী ফিরোজ জামানের বাসায় প্রিপেইড মিটারে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়। ওই সংযোগে মিটার নম্বর ৩২০৫১০২২০১০ ও কনজুমার নম্বর ৯৪৯০০৬৭৯ বরাদ্দ দেওয়া হয়। সংযোগ পাওয়ার পর গ্রাহক একবার রিচার্জও করেন। কিন্তু সংযোগ দেওয়া মাত্র সাত দিনের মাথায় এক রাতে কোনো কারণ দর্শানো নোটিশ ছাড়াই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এতে ফিরোজ জামান ও তার পরিবার পুরো রাত অন্ধকারে কাটাতে বাধ্য হন।
বিদ্যুৎ না থাকায় তার ফ্রিজে সংরক্ষিত খাদ্যসামগ্রী নষ্ট হয়ে যায়। পরদিন সকালে সংযোগ বিচ্ছিন্নের কারণ জানতে ঠাকুরগাঁও নেসকো অফিসে গেলে নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে তার কথা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী সেখানে গ্রাহকের সঙ্গে অসদাচরণ করা হয় এবং তাকে মামলা করার হুমকিও দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘদিন পরিবার নিয়ে অন্ধকারে থাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে এবং সংযোগ পুনর্বহালের আশায় তিনি একাধিকবার নেসকো অফিসে যোগাযোগ করলেও কোনো সমাধান পাননি। পরে গত ২৩ নভেম্বর নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে তিনি একটি উকিল নোটিশ পাঠান। উকিল নোটিশ দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তুলে একটি নোটিশ দেওয়া হয় এবং সেখানেও মামলার হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি গত ২৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় একজন নারী কর্মকর্তাসহ নেসকোর একটি সার্ভে টিম আবারও তার বাড়িতে গিয়ে সার্ভে করে। পরবর্তীতে কোনো উপায় না পেয়ে ন্যায় বিচার পেতে নেসকোর নিবার্হী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে লিগ্যাল এইড অফিসে লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগ করে ফিরোজ জামান বলেন, আমি বিদ্যুৎ অফিসে সংযোগ পেতে হোল্ডিং, টিন সনদ, জমির দলিল-খারিজ খাজনা যা যা চেয়েছে তা সবই দিয়েছি। এমনকি জোর করে একটি অঙ্গীকারনামাও লিখিয়ে নেওয়া হয়েছে। সব যাচাই-বাছাই শেষে প্রিপেড মিটারে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার পর হঠাৎ সাত দিনের মাথায় কেটে দেওয়া হলো। যদি সমস্যা থেকেই থাকে, তাহলে সংযোগই বা দেওয়া হলো কেন?
তিনি আরও বলেন, বারবার অনুরোধ করেও সংযোগ পুনরায় না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত গত ২৯ ডিসেম্বর আমি লিগ্যাল এইড অফিসে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনর্বহাল ও হয়রানি থেকে মুক্তি পেতে অভিযোগ দায়ের করি।
স্থানীয় রুবেল, হুমায়ন, মমিন ও নাজমূল নামে কয়েকজন বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সব কাগজপত্র যাচাই করে দুইবার সার্ভে করে সংযোগ দেওয়ার পর হঠাৎ বিদ্যুৎ কেটে দেওয়া হলে সেটাকে ভুল বলা যায় না, এটা স্পষ্ট ক্ষমতার অপব্যবহার। উকিল নোটিশ দেওয়ার পর যদি একজন নাগরিককে হয়রানির শিকার হতে হয়, তাহলে ন্যায়বিচার চাওয়াটাই কি এখন অপরাধ? বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া মানে একটি পরিবারকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। শিশু, নারী ও বয়স্কদের নিয়ে একটি পরিবার যদি দিনের পর দিন বিদ্যুৎহীন থাকে, তার দায় কে নেবে? নেসকোর কর্মকর্তারা কি এসব ভোগান্তির দায় এড়াতে পারেন?
তারা আরও বলেন, আমরা দেখতে চাই আইন সবার জন্য সমান কি না। একজন সাধারণ গ্রাহকের সঙ্গে যদি এভাবে আচরণ করা হয় এবং তার কোনো জবাবদিহি না থাকে, তাহলে মানুষ রাষ্ট্রীয় সেবার ওপর আস্থা হারাবে। এই ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না হলে সাধারণ মানুষ আর নিরাপদ বোধ করবে না। আমরা শুধু একটি বিদ্যুৎ সংযোগের সমাধান চাই না, আমরা চাই দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত। যাতে ভবিষ্যতে কোনো কর্মকর্তা সাধারণ মানুষের সঙ্গে এমন আচরণ করার সাহস না পায়।
ঠাকুরগাঁওয়ের সিনিয়র সাংবাদিক ফজলে ইমাম বুলবুল বলেন, নোটিশ ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা কোনোভাবেই সাধারণ প্রশাসনিক ভুল নয়, এটি সরাসরি ক্ষমতার অপব্যবহার। বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আর তা খেয়ালখুশিমতো কেটে দেওয়া নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। একজন সাধারণ মানুষ যদি ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে এই রাষ্ট্রে আইনের আশ্রয় নেবে কে? এ ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহি ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়বে।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা সুজনের সভাপতি মো. আব্দুল লতিফ বলেন, নোটিশ ছাড়া একজন গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, তা শুধু আইন লঙ্ঘনই নয়, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারও বটে। বিদ্যুৎ আজ মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। যাচাই-বাছাই শেষে সংযোগ দিয়ে আবার হঠাৎ কেটে দেওয়া মানে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখা। একজন সাধারণ নাগরিক ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে যদি হয়রানির শিকার হন, তাহলে সেটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের ঘটনায় দায়ী কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় না আনা হলে ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় সেবার ওপর আস্থা হারাবে। আমরা এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, অবিলম্বে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনর্বহাল এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
ঠাকুরগাঁও আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমান জিলানী বলেন, কোনো অবস্থাতেই একজন গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ পূর্ব নোটিশ ছাড়া হঠাৎ বিচ্ছিন্ন করা যায় না। এটি বিদ্যুৎ আইন ও ভোক্তা অধিকার-সংক্রান্ত বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আগে গ্রাহককে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া আইনগত বাধ্যবাধকতা। সরকারি সংস্থা হলেও নেসকো এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।
অভিযোগ প্রসঙ্গে নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ফিরোজ জামানের বোনেরা বিদ্যুৎ সংযোগ না দেওয়ার জন্য লিখিত অভিযোগ করেছেন। সে কারণেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
তবে সার্ভে শেষে জমিতে বসবাস নিশ্চিত হওয়ার পরও কেন নোটিশ ছাড়াই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
এ ব্যাপারে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সিভিল জজ) মজনু মিয়া বলেন, অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আইন অনুযায়ী বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হবে।
রেদওয়ান মিলন/এএমকে