সুইজারল্যান্ডের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নেসলের উৎপাদিত খাদ্যপণ্য ও পানীয় স্বাস্থ্যকর বা বাংলাদেশের খাদ্যমান অনুযায়ী সঠিক মান না থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেবে দেশের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই)।  

বিশ্বের বৃহত্তম খাদ্যদ্রব্য প্রক্রিয়াজাতকারী কোম্পানির উৎপাদিত ৬০ শতাংশের বেশি খাদ্য ও পানীয় ‌‘সু-স্বাস্থ্যের স্বীকৃত সংজ্ঞা’র মানদণ্ড পূরণ করে না। নেসলে তাদের একটি গোপন নথিতে বিষয়টি স্বীকার করেছে। এ নিয়ে বিশ্ব জুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। আলোচনা-সমালোচনা থেমে নেই বাংলাদেশেও। কারণ দেশেও প্রতিষ্ঠানটির শিশুখাদ্য, দুগ্ধজাত পণ্য, কফি, চকলেট, হিমায়িত খাবারসহ বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী তৈরি ও বাজারজাত করছে।

নেসলে নিজেই স্বীকার করেছে তাদের পণ্যের মান সু-স্বাস্থ্যের স্বীকৃত সংজ্ঞার মানদণ্ড সঠিকভাবে পালন করছে না। এমন পরিস্থিতিতে নেসলের অন্যতম বাজার বাংলাদেশের মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিএসটিআই বিষয়টি নিয়ে কী ভাবছে জানতে চাইলে সংস্থাটির উপ-পরিচালক রিয়াজুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাংলাদেশে উৎপাদন ও বাজারজাত করতে এখন পর্যন্ত নেসলে বিএসটিআই থেকে যেসব পণ্যের লাইসেন্স নিয়েছে তা মান নিশ্চিত করে দেওয়া হয়েছে। এখন যদি কোনো পণ্যের মান ঠিক নেই এমন ‍অভিযোগ আসে তাহলে বাজার থেকে পণ্য সংগ্রহ করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করব। বাংলাদেশ মান বিষয়ে কোনো অসংগতি পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।

তিনি বলেন, বিশ্ব গণমাধ্যমে সু-স্বাস্থ্যের স্বীকৃত সংজ্ঞার মানদণ্ড ও পুষ্টিগুণ সঠিক নয় এমন তথ্য জানিয়েছে। এখানে কিছু বলা হয়নি। এর আগে ভারতে তাদের উৎপাদিত ‘ম্যাগি’ নুডলসে সিসার উপস্থিতি পায়। কিন্তু আমাদের দেশে উৎপাদিত ম্যাগি নুডলস আমরা পরীক্ষা করে দেখেছিলাম; ওই ধরনের কিছু পাইনি। একেক দামের পণ্যের মান একেক রকম হয়। এখন সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পেলে বিষয়টি আমরা দেখব।

এদিকে প্রস্তুতকৃত পণ্যের সুস্বাস্থ্যের স্বীকৃত মানদণ্ড পূরণ করে না— এমন সমালোচনার জেরে অবশেষে নতুন পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে নেসলে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গকে ১ জুন একটি ইমেইল বার্তা দিয়ে নেসলের উৎপাদিত খাদ্যপণ্য কিটক্যাটের প্রস্তুতকারক বিভাগ। 

কোম্পানির বরাতে জানানো হয়েছে, এখন থেকে উৎপাদিত প্রতিটি পণ্যের পুষ্টিমান পর্যালোচনা করবে কর্তৃপক্ষ। যদি কোনো উৎপাদিত খাদ্যপণ্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পুষ্টিমানের চেয়ে পিছিয়ে থাকে সেক্ষেত্রে সেগুলোর মান যথাযথভাবে উন্নত করে তবেই বাজারে ছাড়া হবে। পাশাপাশি গ্রাহকের সুবিধা ও জ্ঞাতার্থে খাদ্যপণ্যের মোড়কের গায়ে ওই পণ্যের পুষ্টিমান ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রাপ্ত পয়েন্ট লিপিবদ্ধ থাকবে।

এর আগে ৩১ মে ব্রিটিশ দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল টাইমস তাদের পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি নেসলের একটি অভ্যন্তরীণ গোপন নথি সম্প্রতি তাদের হাতে এসেছে। যেখানে কোম্পানির তরফ থেকে স্বীকার করা হয়েছে যে তাদের মোট উৎপাদিত খাদ্যপণ্য ও পানীয়ের ৬০ শতাংশই সুস্বাস্থ্যের স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অস্ট্রেলিয়ার হেলথ স্টার রেটিং সিস্টেম অনুযায়ী, পোষ্যপ্রাণীর ও বিশেষায়িত পুষ্টিকর মেডিকেল খাবার ছাড়া নেসলের অন্যান্য মোট উৎপাদিত খাদ্য ও পানীয় সামগ্রীর মাত্র ৩৭ শতাংশ পণ্য ৩ দশমিক ৫-এর ওপরে রেটিং পেয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার এই রেটিং সিস্টেমে স্বাস্থ্যকর খাবারের মানদণ্ড নির্ধারণে ৫ এর মধ্যে স্কোর দেওয়া হয়। অ্যাকসেস টু নিউট্রিশন ফাউন্ডেশনের মতো আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও পানীয়র গবেষণা কাজে অস্ট্রেলিয়ার এই রেটিং ব্যবহার করে।

খাদ্য ও পানীয়র পোর্টফোলিওতে নেসলের প্রায় ৭০ শতাংশ খাদ্যপণ্য ওই প্রান্তিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে নথিতে বলা হয়েছে। খাঁটি কফি ছাড়া ৯৬ শতাংশ পানীয়, ৯৯ শতাংশ মিষ্টিজাতীয় খাবার ও আইসক্রিম এই মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি।

তবে কোম্পানির পানি ও দুগ্ধজাত খাদ্যপণ্য অন্যান্য পণ্যের তুলনায় ভালো স্কোর পেয়েছে। নেসলের পানির ৮২ শতাংশ ও দুগ্ধজাত খাদ্যপণ্যের ৬০ শতাংশ সু-স্বাস্থ্যের স্বীকৃত সংজ্ঞার মানদণ্ড উতরে গেছে।

বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস ও স্থূলতার হার বাড়তে থাকায় প্রতিবছরই চাপ বাড়ছে নেসলে, পেপসিকো, ম্যাকডোনাল্ডসের মতো খাদ্যপণ্য ও পানীয় প্রস্তুতকারী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ওপর। এক সমীক্ষায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউিএইচও) জানিয়েছে ১৯৭৫ সালের তুলনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক স্থূলতা বেড়েছে তিনগুণ।

পৃথিবীজুড়ে এই স্থূলতাবৃদ্ধির জন্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রস্তুত করা মুখরোচক কিন্তু পুষ্টিগত দিক থেকে নিম্নমানের খাদ্যপণ্য ও পানীয় অনেকাংশে দায়ী বলে উল্লেখ করেছে ডব্লিউেএইচও।  

এসআই/ওএফ