অনুমোদন ছাড়াই শাখা খুলে ব্যবসা করছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত বিমা কোম্পানি প্রগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। ২০১৫ সাল থেকে এ কোম্পানি অনুমোদন ছাড়াই ১৫০টি শাখা খুলে ব্যবসা করেছে। একই সময়ে অবৈধ ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও লাইসেন্সবিহীন এজেন্টকে কমিশনও দিয়েছে। তাতেও ক্ষান্ত হয়নি প্রতিষ্ঠানটি। অনৈতিকভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাতা প্রদান ও প্রশিক্ষণের নামে ব্যয় বেশি দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এসব অনিয়মের মাধ্যমে একদিকে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, অন্যদিকে গ্রাহকদের টাকা বিভিন্ন অজুহাতে লুটপাট করেছে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। এতে নেতৃত্ব দিয়েছেন কোম্পানির মুখ্য নির্বাহীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

সর্বশেষ ত্রিপক্ষীয় শুনানি শেষে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় মুখ্য নির্বাহীসহ প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করেছে আইডিআরএ। 

বিমা বিশ্লেষকরা বলছেন, বিমা কোম্পানিগুলোর অনিয়ম দিনদিন বেড়ে চলছে। বিমা আইনে যে শাস্তির বিধান রয়েছে সেগুলোর পরিবর্তন করতে হবে। কোম্পানিগুলো যাতে অনিয়ম করতে ভয় পায় সে ধরনের আইন প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। না হলে বিমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা উঠে যাবে।

প্রগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্সের ২০১৫, ২০১৬ ও ২০১৭ সালের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য আইডিআরএ নিরীক্ষা ফার্ম মেসার্স একনাবিনকে দিয়ে বিশেষ নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। ফার্মটি নিরীক্ষা শেষে ২১টি বিষয়ে অনিয়ম দেখতে পায়।

এ বিষয়ে আইডিআরএ’র নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শাকিল আখতার বলেন, ব্যবস্থাপনা ব্যয়সহ কোম্পানির সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করতে বিমা আইন ২০১০ এর ২৯ ধারা মোতাবেক বিশেষ নিরীক্ষার জন্য মেসার্স একনাবিনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফার্মের দেওয়া নিরীক্ষায় ২১টি বিষয় পর্যবেক্ষণ করে পাঁচটি বিষয়ে অনিয়মের জন্য কোম্পানিকে ১৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া বেশকিছু বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

প্রগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্সের অনিয়মগুলো হচ্ছে- 

কমিশন ও ভাতা

কোম্পানিটি আইডিআরএ বিধি লঙ্ঘন করে ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিন বছরে কমিশন ও উন্নয়নভাতা, মোবাইল ব্যয় এবং প্রণোদনা বাবদ নগদ অর্থ দিয়েছে। নিয়ম অনুসারে এগুলো অ্যাকাউন্টপেয়ি চেকের মাধ্যমে করতে হয়। শুধু তা-ই নয়, লাইসেন্সবিহীন এজেন্টকে কোম্পানিটি এজেন্ট কমিশনও দিয়েছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে বিমা আইন লঙ্ঘন হয়েছে।

নগদ কমিশন বা ভাতা নিয়ে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জারি করা আইডিআরএ প্রজ্ঞাপন লঙ্ঘন করেছে প্রগ্রেসিভ লাইফ। এজন্য বিমা আইন ২০১০ এর ১৩০ ধারা অনুসারে কোম্পানিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

বিষয়টি স্বীকার করে প্রগ্রেসিভ লাইফ বলেছে, প্রগ্রোসিভ লাইফের উন্নয়ন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কমিশন দেওয়া, রিলিজ, ইনসেনটিভ বোনাস, উন্নয়ন বিভাগের বেতন-ভাতা অ্যাকাউন্টপেয়ি চেকের মাধ্যমে দেওয়া হবে। এছাড়া প্রগ্রেসিভ লাইফ আইডিআরএ’র সার্কুলার মেনে চলবে।

লাইসেন্সবিহীন ব্যক্তিকে কমিশন দিয়ে বিমা আইন ২০১০ এর ৫৮ ধারা লঙ্ঘন করেছে প্রগ্রেসিভ লাইফ। এজন্য ২০১৫-১৭ সাল পর্যন্ত সময়ের সিইওকে বিমা আইন ২০১০ সালের ১৩৪ ধারা অনুসারে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি এ অপরাধ এখনও অব্যাহত থাকায় কোম্পানির সিইওকে ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালের জন্য আরও এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তবে কোম্পানি বলছে, লাইসেন্সবিহীন এজেন্টদের ফাইল নবায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

প্রশিক্ষণ ব্যয়

নিরীক্ষা ফার্ম মেসার্স একনাবিন বলছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ‘অ্যাপ্রুভড বাই’ ও ‘পোস্টেড বাই’ এর স্বাক্ষরের স্থান শূন্য ছিল। আর্থিক বিবরণীতে প্রশিক্ষণ ব্যয় ও ভাতা ট্রায়াল ব্যালেন্সের তুলনায় কম দেখানো হয়েছে। এ অনিয়মের কারণে কোম্পানির তৎকালীন সিএফওকে বিমা আইন ২০১০ এর ১৩৪ ধারা অনুসারে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে যথাসময়ে স্বাক্ষর ও হিসাব রাখার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে কোম্পানির বক্তব্য হলো, প্রশিক্ষণ ব্যয় বার্ষিক আর্থিক বিবরণীতে ট্রায়াল ব্যালেন্সের সঙ্গে মিল রয়েছে। এটি একনাবিনের স্পেশাল অডিট টিম ও প্রগ্রেসিভ লাইফের ম্যানেজমেন্টের মধ্যে চার্টার্ড অব অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত ধারণাগত পার্থক্য।

প্রশাসনিক খরচ

আইডিআরএ’র নিয়ম অনুসারে বিমা কোম্পানির কোনো শাখা, সার্ভিস কিংবা এজেন্সি অফিস খোলার আগে আইডিআরএ’র অনুমোদন নিতে হয়। প্রগ্রেসিভ লাইফ আইডিআরএ’র অনুমোদন ছাড়াই শাখা অফিস খুলে ব্যবসা পরিচালনা করছে। যা বিমা আইন ২০১০ এর ১৪ (১) এর লঙ্ঘন। 

বিষয়টি স্বীকার করেছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। তারা বলছে, ১৫০টি শাখা অফিসের অনুমোদনের জন্য আইডিআরএ’র কাছে আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তবে ফাইলগুলো হারিয়ে গেছে। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুসারে ফাইলগুলো আবার জমা দেওয়া হয়েছে।

বিমা আইন ২০১০ এর ১৪ (১) ধারা লঙ্ঘনের দায়ে কোম্পানিকে পাঁচ লাখ এবং ১৩৪ ধারা অনুসারে কোম্পানির তৎকালীন মুখ্য নির্বাহীকে প্রতি বছরের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেছে আইডিআরএ। একই সঙ্গে শাখা অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত কোম্পানির নাম ব্যবহার করে সাইনবোর্ড টানিয়ে কোনো অফিস খোলা যাবে না। যেসব জায়গায় সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে, আগামী তিন মাসের মধ্যে তার অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে। এ নির্দেশনার পরও অনিয়ম করলে কোম্পানির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।  

একনাবিনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রগ্রেসিভ লাইফের দুজন কর্মচারীকে অস্বাভাবিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কোম্পানি বলছে, নিয়ম মেনেই ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়েছে। আইডিআরএ তাদের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে।

অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়

কোম্পানির তথ্য অনুসারে, ২০১৮ সালে কোম্পানিটি নিয়ম ভেঙে অতিরিক্ত আট কোটি টাকা ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখিয়েছে। এর আগের বছরগুলোতে তা আরও বেশি দেখানো হয়। যা বিমা আইনের লঙ্ঘন। ২০১৫ থেকে ২০১৭, এ তিন বছর কোম্পানি অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের মাধ্যমে বিমা আইন ২০১০ এর ১৪ (২) ও ১৯৫৮ সালের বিধি ৩৯-এর লঙ্ঘন করেছে। এ কারণে বিমা আইনের ১৩০ ধারায় কোম্পানিটিকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

ব্যবসা উন্নয়ন ও ভ্রমণ খরচ

ব্যবসা উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থ সম্পূর্ণ নগদ প্রদান করা হয়েছিল যা আইডিআরএ’র নিয়মের লঙ্ঘন। কোম্পানি বলছে, প্রগ্রেসিভ লাইফের ব্যবসা বাড়ানোর জন্য এ অর্থ খরচ হয়েছে। ভবিষ্যতে নিয়ম মেনে চলা হবে।

কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে ৫৩ লাখ পাঁচ হাজার ৪১২ টাকার ভ্রমণ খরচ দেখানো হয়েছে। কিন্তু ট্রায়েল ব্যালান্সে দেখানো হয়েছে, এক কোটি ৬৪ লাখ ৯৩ হাজার ৬৯ টাকা। এছাড়া টিএ-ডিএ ভাতা নগদ দেওয়া হয়েছে। বেশির ভাগ শিটে ভাতা গ্রহণকারীর স্বাক্ষর নেই।

ব্যবসা উন্নয়ন ও ভ্রমণ ব্যয় দুটোতে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ আইডিআরএ’র নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে। চেকের পরিবর্তে নগদে টাকা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এ নিয়ম মেনে চলা হয় সেজন্য সতর্ক করা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান ড. মোশাররফ হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিশেষ নিরীক্ষা সুপারিশের আলোকে ত্রিপক্ষীয় শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নিয়ম ভেঙে চেকে পেমেন্টের পরিবর্তে নগদে কমিশন ও ভাতা প্রদান, প্রশিক্ষণ ব্যয় হিসাবে গরমিল, শাখার অনুমোদন ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা ও অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের প্রমাণ মিলেছে। এসব অনিয়মের কারণে কোম্পানি ও কোম্পানির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মোট ১৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

বিমা কোম্পানিটির সচিব জহির উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, এজেন্ট লাইসেন্স ও শাখা অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছি। এগুলো প্রক্রিয়াধীন আছে। শাখা অনুমোদনের জন্য আমরা তিনবার আবেদন করি। কিছু পেয়েছি, কিছু প্রক্রিয়াধীন আছে। এজেন্ট লাইসেন্সের বিষয়টিও একই অবস্থায় আছে। এছাড়া অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় আইনটি পাকিস্তান আমলের। ফলে আগের বাসা ভাড়া আর বর্তমান বাসা ভাড়া এক নয়। একইভাবে সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু ব্যবস্থাপনা ব্যয় আইনের মধ্যে থেকেই করতে হচ্ছে। এ কারণে বাস্তবে তা মেলাতে পারছে বিমা কোম্পানিগুলো।

তিনি আরও বলেন, আইডিআরএ’র কাছে জরিমানার বিষয়ে রিভিউ আবেদন করেছি। আশা করছি আইডিআরএ জরিমানা মওকুফ করবে।

এমআই/ওএফ/এমএআর/