উত্তর কোরিয়ার জন্য ২০২২ সালটি ছিল রেকর্ড সৃষ্টিকারী বছর। দেশটি অন্যান্য যে কোনও বছরের তুলনায় ২০২২ সালে মাত্র এক বছরে সবচেয়ে বেশি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষামূলকভাবে আকাশে ছুড়েছে। বস্তুত উত্তর কোরিয়া যত ক্ষেপণাস্ত্র এযাবৎ ছুড়েছে, তার মধ্যে এক চতুর্থাংশই গত বছর আকাশ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।

আর গত বছরই কিম জং উন উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হয়ে উঠেছে এবং দেশটি তার অস্ত্রভাণ্ডারে পারমাণবিক অস্ত্র মজুত রাখবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

এর ফলে ২০১৭ সালের পর কোরীয় উপদ্বীপ এলাকায় উত্তেজনা সবচেয়ে চরমে পৌঁছেছে। সেসময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে ‘অস্ত্র দিয়ে জব্দ’ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।

পারমাণবিক অস্ত্র শক্তি অর্জন

উত্তর কোরিয়া ২০২২ সালে পরমাণু সক্ষমতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটিয়েছে। বছরের শুরুতে দেশটি ছোট পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করে, যে ক্ষেপণাস্ত্র দক্ষিণ কোরিয়ায় আঘাত হানার ক্ষমতা রাখে। এর পরই তারা জাপানকে টার্গেট করে মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে।

গত বছর শেষ হওয়ার আগেই উত্তর কোরিয়া এ যাবৎ উদ্ভূত তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হোয়াসং-১৭ সফলভাবে পরীক্ষা করে। এই ক্ষেপণাস্ত্র, তত্ত্বগতভাবে, আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের যে কোনও জায়গা পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম।

কিম এমনকী পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পেছনে দেশটির যুক্তিও বদলান। উত্তর কোরিয়া পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে যেখান থেকে তাকে আর ফেরানো যাবে না, গত সেপ্টেম্বর মাসে কিম এই ঘোষণা দেওয়ার পর আরও জানান, এসব পারমাণবিক অস্ত্র শুধু যুদ্ধ ঠেকানোর জন্য তৈরি করা হচ্ছে না, বরং অন্য পক্ষ আক্রমণ করার আগেই বা হামলা হলে পাল্টা-হামলা চালিয়ে যুদ্ধে জেতার জন্য ব্যবহার করা হবে।

বছর যখন শেষ হতে চলেছে, তখন কিম তার ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্যদের ডেকে পাঠিয়ে ওই সভায় ২০২৩ সালে উত্তর কোরিয়া লক্ষ্য কী হবে তা ব্যাখ্যা করেন।

তার তালিকার শীর্ষে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ‘ব্যাপকভাবে বাড়ানো।’ তিনি জানান, এর মধ্যে অবশ্যই থাকছে অপেক্ষাকৃত ছোট এবং কৌশলগত কারণে ব্যবহারের উপযোগী পরমাণু অস্ত্র, যেগুলো দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে লড়াইয়ে ব্যবহার করা যাবে।

এটা সবচেয়ে গুরুতর অগ্রগতি, বলছেন পারমাণবিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞ আঙ্কিত পাণ্ডা, যিনি কাজ করেন কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস নামে আমেরিকা-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক একটি গবেষণা সংস্থায়।

কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির আগে উত্তর কোরিয়াকে ক্ষুদ্র মাপের পরমাণু বোমা প্রস্তুত করত হবে, যেটি ছোট ক্ষেপণাস্ত্রের মাথায় বসানো যায়।

পিয়ংইয়ংয়ের এ ধরনের মিনিবোমা তৈরির সক্ষমতা আছে কিনা; সে প্রমাণ দেশটি এখনও বিশ্বকে দিতে পারেনি। ২০২২ সালে উত্তর কোরিয়া এ ধরনের কোন পরীক্ষা চালায় কিনা সেদিকে নজর রেখেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। কিন্তু সে ধরনের কোন পরীক্ষা এখনো দেখা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে সেটা ঘটতে পারে এ বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে।

নতুন বছরে কিমের উদ্ভাবন তালিকায় অন্যান্য যেসব সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে তার মধ্যে আছে গোয়েন্দা উপগ্রহ। তিনি দাবি করেছেন এ বছর বসন্তকাল নাগাদ এই উপগ্রহ পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো হবে। এছাড়াও আছে আরও শক্তপোক্ত জ্বালানি-নির্ভর আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা আমেরিকাকে লক্ষ্য করে ছাড়া হবে এবং যে মডেল আগের মডেলের তুলনায় কম সময়ের হুঁশিয়ারি দিয়ে আকাশে ছুটবে।

কাজেই আমরা বেশ স্পষ্ট ধারণা করতে পারি যে ২০২৩ সাল অনেকটাই ২০২২ সালের ধারা অনুসরণ করে এগোবে। অর্থাৎ পিয়ংইয়ং একটা আগ্রাসী লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে তাদের পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে যাবে এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তাদের পরমাণু অস্ত্রের ভাণ্ডার আরও সম্প্রসারিত এবং আরও উন্নত করবে।

কার্যত নতুন বছরে পা দেওয়ার তিন ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে উত্তর কোরিয়া এ বছরে তাদের প্রথম পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে।

তবে পাণ্ডা বলছেন, এই বছরে বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ হয়ত শুধু অস্ত্র পরীক্ষার জন্য হবে না। সেগুলো হয়ত সামরিক মহড়ার অংশ হবে, কারণ উত্তর কোরিয়া এখন সম্ভাব্য সংঘাতে তার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সংলাপের আশা?

এত ব্যাপক একটি লক্ষ্যমাত্রার তালিকা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়ার নেতা যে আমেরিকার সাথে এ বছর বৈঠকে বসার কথা চিন্তাভাবনা করছেন তেমনটা মনে হচ্ছে না। শেষ দফা পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ আলোচনা ভেঙে যায় ২০১৯ সালে। এর পর থেকে কিম আলোচনায় বসার ব্যাপারে কোনরকম আগ্রহ দেখাননি।

কিছু কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন কিম নিজের হাত আরও শক্ত করার অর্থাৎ দেশকে সক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইছেন।

তারা বলছেন, আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়াকে ঘায়েল করার মত যথেষ্ট ও সন্দেহাতীত সক্ষমতা গড়ে তোলার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পর তবেই কিম নিজের শর্তে আলোচনা করতে সংলাপের টেবিলে ফেরার কথা ভাববেন।

বরং গত বছর উত্তর কোরিয়া চীন আর রাশিয়ার আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এটা খুব সম্ভব যে উত্তর কোরিয়া সম্ভবত তাদের পররাষ্ট্র নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে- বলছেন রেচেল মিন ইয়ং, যিনি আমেরিকান সরকারের হয়ে বিশ বছর উত্তর কোরিয়া বিশ্লেষকের কাজ করেছেন এবং বর্তমানে কাজ করছেন ওপেন নিউক্লিয়ার নেটওয়ার্ক নামে একটি সংস্থায়।

‘উত্তর কোরিয়া যদি মনে করে যে, তাদের নিরাপত্তা এবং টিকে থাকার জন্য আমেরিকাকে তাদের আর প্রয়োজন নেই, তাহলে পারমাণবিক বিষয়াবলী নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার রূপরেখা এবং এর প্রভাব ব্যাপকভাবে বদলে যাবে।’

উপদ্বীপে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে

ইতোমধ্যে কোরীয় উপদ্বীপ এলাকায় একটা উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। উত্তর কোরিয়া প্রতিবার যখন পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়ে ‘উস্কানি’ দিচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়া এবং কখনও কখনও আমেরিকা তার বদলা নিচ্ছে।

এর শুরু ২০২২এর মে মাসে, যখন দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা হাতে নিয়ে বলেন তিনি উত্তর  কোরিয়ার প্রতি আরও কঠোর হবেন। প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইয়ল এই মতবাদে বিশ্বাসী যে, উত্তর কোরিয়াকে থামানোর সবচেয়ে ভাল পথ হল সামরিক শক্তি প্রয়োগ।

তিনি আমেরিকার সাথে মিলে বিশাল পরিমাপে যৌথ সামরিক মহড়া আবার চালু করেন। আর এর প্রতিবাদ জানায় উত্তর কোরিয়া এবং তারা আরও ক্ষেপণাস্ত্র  ছোঁড়ে। এর ফলে পাল্টাপাল্টি সামরিক তৎপরতা চলে কিছু দিন ধরে, যেখানে দু’পক্ষই তাদের সীমান্ত এলাকার কাছে জঙ্গি বিমান ওড়ায় এবং সমুদ্রে গোলাবর্ষণ করে।

গত সপ্তাহে উত্তর কোরিয়া অপ্রত্যাশিতভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার আকাশসীমায় পাঁচটি ড্রোন ওড়ানোর পর উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। দক্ষিণ কোরিয়া সেগুলো গুলি করে ভূপাতিত করতে ব্যর্থ হয়, যেটা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় দক্ষিণের দুর্বলতা দিকটি প্রকাশ করে দেয়। সাধারণ দক্ষিণ কোরীয়দের মধ্যে একটা উদ্বেগ তৈরি হয়, কারণ সাধারণত উত্তরের কার্যকলাপ তাদের তেমন একটা বিচলিত করে না।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রতিশ্রুতি দেন, দক্ষিণ প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেবে এবং উত্তরকে প্রতিবার উস্কানি সৃষ্টি করলেই তার জন্য শাস্তি দেবে।

কোরিয়া রিস্ক গ্রুপ নামে একটি গবেষণা সংস্থা, যারা উত্তর কোরিয়ার কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখে, তার প্রধান নির্বাহী চাদ ও’ক্যারল অনুমান করছেন, ২০২৩ সালে দুই কোরিয়ার মধ্যে প্রত্যক্ষ সংঘাতের একটা বড়ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে, যার ফলে মৃত্যু ঘটতে পারে।

‘উত্তর এবং দক্ষিণের জবাব পরিস্থিতিকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে প্রকৃত অর্থে আসল গোলাগুলি  বিনিময় হতে পারে- তা ইচ্ছে করেই হোক বা অন্য যে কোন কারণেই হোক,’ তিনি বলেন।

তিনি বলেন, সেখানে একটা ভুল বা হিসাব-নিকাশের একটা গরমিলের মাশুল হতে পারে ভয়াবহ – তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।   

উত্তর কোরিয়ার জনগণের জন্য ২০২৩ সালটা কেমন হবে? মহামারির কারণে কঠোর বিধিনিষেধের আওতায় গত তিন বছর ধরে সীমান্ত বন্ধ রয়েছে উত্তর কোরিয়ায়।

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে এমনকী বাণিজ্য স্থগিত রয়েছে। মানবিক ত্রাণ সংস্থাগুলো মনে করছে এর ফলে দেশটিতে খাদ্য ও ওষুধের চরম ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গত বছর কিম দেশটিতে ‘খাদ্য সংকটের’ কথা স্বীকার করেছেন যা বেশ বিরল।

এরপর, গত বছর মে মাসে প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণের কথা স্বীকার করে উত্তর কোরিয়া। কিন্তু মাত্র কয়েকমাসের মধ্যেই দেশটি দাবি করে যে তারা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলেছে। তাহলে, উত্তর কোরিয়া কি ২০২৩ সালে চীনের সাথে তার সীমান্ত খুলতে চলেছে, যাতে সরবরাহ আবার দেশে আসতে পারে?   

চীনের সাথে সীমান্ত খুললে সেটা উত্তর কোরিয়ার জন্য নতুন আশা বয়ে আনবে। উত্তর কোরিয়া এর প্রস্তুতি হিসাবে সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষজনকে টিকা দিতে শুরু করেছে। কিন্তু দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভঙ্গুর। তাই বিশ্লেষক লি বলছেন, এর প্রভাব কী হতে পারে সে বিষয়ে তিনি সন্দিহান।

‘দেশটির অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে। তাই জরুরি প্রয়োজন ছাড়া উত্তর কোরিয়া সীমান্ত পুরোপুরি খুলে দেবে বলে মনে হয় না- অন্তত যতদিন না মহামারি বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণে আসছে, বিশেষ করে প্রতিবেশি দেশ চীনে।’

আরেকটি বিষয়ের দিকে বিশ্বের নজর থাকবে ২০২৩ সালে। সেটি হল কিমের পর উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্ব কে দেবেন সে রহস্যের কোন সূত্র পাওয়া যায় কিনা!

তার উত্তরসুরি কে হবেন সে পরিকল্পনা জানা যায় না। তবে গত বছর প্রথমবারের মত কিম তার এক সন্তানকে জনগণের সামনে এনেছেন।

তার কন্যা যার নাম মনে করা হচ্ছে কিম চু-এ তিনটি সামরিক অনুষ্ঠানে তার ছবি দেখা গেছে। এ বছর নববর্ষের দিন তার আরও কিছু ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে আঁচ-অনুমান বাড়ছে যে উত্তরসুরি হিসাবে তাকেই বেছে নিয়েছেন কিম। তবে উত্তর কোরিয়ার ঘটনাবলী নিয়ে কিছু অনুমান করা একটা অসম্ভব ব্যাপার। ফলে ২০২২ সালের মত এবছর ২০২৩ সালও উত্তর কোরিয়ার জন্য একইরকম অনুমানের বাইরে থাকবে এবং একইরকম অস্থিতিশীল থাকবে বলেই ধারণা। বিবিসি বাংলা।

এসএস