ফাইল ছবি

তালেবানরা যখন গত মাসে কাবুলে প্রবেশ করে বিনা যুদ্ধে আফগানিস্তানের রাজধানীর দখল নেয়, তখন পশ্চিমা-সমর্থিত এবং প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর পতনের তীব্র গতি বিশ্বকে অবাক করে দেয়।

কিন্তু আফগান প্রশাসনের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলেছেন, ঝড়ো গতির সেই বিজয় একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল না। প্রশাসনের মূল নেতৃত্বের ব্যর্থতা, ব্যাপক দুর্নীতি, তালেবানের তীক্ষ্ণ প্রচার এবং মার্কিন-নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক বাহিনীর তড়িঘড়ি প্রত্যাহারের মতো চরম বিশ্বাসঘাতকতা এই পরিণতির জন্য দায়ী।

আফগানিস্তানের পুরো শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শীর্ষ একজন কর্মকর্তা বলেন, ‌গত ১৫ আগস্ট রাজধানী কাবুলে তালেবানের প্রবেশের মাত্র দু’দিন আগে জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী, সেনা ও গোয়েন্দা প্রধানদের সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির জরুরি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তিনি।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বলা হয়েছিল যে, দুই বছর ধরে কাবুল নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আমাদের কাছে যথেষ্ট অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং অর্থ-সম্পদ আছে।’ কাবুলকে নিরাপদ রাখার জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলার দরকার বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু এই প্রশাসন কাবুলকে দু’দিনও রক্ষা করতে পারেনি।

মিথ্যাচার

শাস্তির আশঙ্কায় আফগান প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা এএফপির সঙ্গে কথা বললেও পরিচয় প্রকাশে রাজি হননি। তালেবানের হাতে রাজধানী কাবুলসহ সারাদেশের পতনে তিনি অবাক হননি বলে মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেন, ‘মন্ত্রীরা গনির কাছে মিথ্যাচার করেছেন। তাকে বলেছেন, সবকিছু ঠিক আছে। যাতে তাদের চাকরি টিকে থাকে এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ঠিকঠাকভাবে পান। তালেবানরা যখন দেশজুড়ে ছুটে চলেছিল, তখন ক্ষমতা কাঠামোর অভ্যন্তরীণ এই চক্র নীতিগত সংস্কার নিয়ে বিতর্ক শুরু করে।’

‘আমরা আমাদের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারিনি। যখন একের পর এক শহরের পতন ঘটতে শুরু হলো, তখন নিয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়ে কথা বলার জন্য জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ বৈঠক ডাকলো।’

মাত্র দুই সপ্তাহে তালেবান পুরো দেশ দখল করে নেয়। এমনকি একটি গুলি না ছুড়েও প্রাদেশিক রাজধানীগুলো তারা দখল করে।

দেশটির ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আরেক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘শীর্ষ কর্মকর্তাদের কেউই নেতৃত্ব দেননি। তাদের কেউই আমাদের লোকজনকে আশ্বস্ত করার জন্য গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেননি। তাদের কেউই মাঠে যাননি।’

গনিও কৌশলগত কিছু মৌলিক ভুল করে বসেন— বলেন আফগান প্রেসিডেন্টের সাবেক এই ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আমি দেশের দক্ষিণাঞ্চল ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলাম। কারণ এই অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদে রক্ষার জন্য আমাদের পর্যাপ্ত জনবল ছিল না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট আমার এই প্রস্তাবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, পুরো আফগানিস্তানই সরকারের।’

দুর্নীতি

আফগান সেনাবাহিনীর জন্য তালেবানের বিরুদ্ধে সর্বত্র অবস্থান ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন সামরিক বাহিনীর কোটি কোটি ডলারের সহায়তা, সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষণ সত্ত্বেও দুর্নীতির কারণে আফগান সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বছরের পর বছর অন্তঃসারশূন্য থেকে গেছে।

জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা যা পেরেছেন সবকিছু লুণ্ঠন করেছেন। অধঃস্তন কর্মকর্তাদের বেতন চুরি করেছেন, জ্বালানি ও গোলাবারুদ বিক্রি করেছেন। সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তালেবানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের চুক্তিতে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি আরও দ্রুত খারাপ হয়ে যায়।

তালেবানবিরোধী সাহসিকতার জন্য পরিচিত জেনারেল সামি সাদাত। যাকে আফগানিস্তানের পতনের কিছুদিন আগে কাবুলে বিশেষ বাহিনীর নেতৃত্বে আনা হয়েছিল; তিনি বলেন, আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ছাড়া এবং সাবেক আফগান সরকারের বিমানবাহিনীর বহর রক্ষণাবেক্ষণকারী বিদেশি ঠিকাদারদের ওয়াশিংটন সরিয়ে নেওয়ার পর সেনাবাহিনী তার কৌশলগত সুবিধা হারিয়ে ফেলে।

পরাবাস্তব

মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমসে লেখা এক নিবন্ধে জেনারেল সাদাত বলেন, ‘তালেবানরা ক্ষমতা দখলে উৎসাহ পেয়েছিল। তারা বিজয় অনুভব করতে শুরু করেছিল... যদিও চুক্তির আগে পর্যন্ত আফগান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কোনও উল্লেখযোগ্য লড়াইয়ে জয়ী হতে পারেনি তালেবান। কিন্তু চুক্তির পর কি হলো? আমরা প্রত্যেকদিন কয়েক ডজন করে সৈন্য হারাতে শুরু করলাম।’

তিনি বলেন, লড়াইয়ের শেষ দিনগুলো ছিল একেবারে ‘পরাবাস্তব।’ সাদাত লিখেছেন, ‘আমরা তালেবানের বিরুদ্ধে তীব্র স্থল লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়লাম। তখন মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো আগন্তুকের মতো আমাদের মাথার ওপর চক্কর দিতে শুরু করল।’

‘আফগানরা যুদ্ধের চেষ্টা না করেই ভেঙে পড়েছে’ বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যে দাবি করেছেন, তা প্রত্যাখ্যান করেছেন জেনারেল সাদাত। তিনি বলেন, ‘আমরা শেষ পর্যন্ত সাহসিকতার সাথে লড়াই করেছি। গত ২০ বছরে আমরা ৬৬ হাজার সৈন্য হারিয়েছি; যা আমাদের যুদ্ধ শক্তির প্রায় এক পঞ্চমাংশ।’

‘সম্মুখসারির যোদ্ধারা যখন দেখলেন যে, শীর্ষ কর্মকর্তারা পালিয়ে যাচ্ছেন; তখন তাদের সামনে মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়ার সামান্য কারণই অবশিষ্ট ছিল।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আফগানিস্তানের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘তালেবানরা যখন কাবুলের মূল ফটকে ঢুকে পড়ল, তখন সৈন্যরা ধরেই নিয়েছিলেন যে, প্রেসিডেন্ট পালিয়ে যাচ্ছেন— এজন্য তারা যুদ্ধ করেননি।’

একই সময়ে তালেবানরা সেনাদের আত্মসমর্পণে রাজি করানোর জন্য গণমাধ্যমের বার্তাকে বুদ্ধিদ্বীপ্তভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে; যা সৈন্যদের মনোবল আরও দুর্বল করে তোলে। তিনি বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুদ্ধে হেরে যাই।’

‘তালেবান সৈন্যদের বলতে শুরু করে যে, তারা অযথাই যুদ্ধ করছে। কারণ ইতোমধ্যে উচ্চ পর্যায়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।’

ততক্ষণে পরিশ্রান্ত এবং পরিত্যক্ত সৈন্যরা লড়াইয়ের শেষ আশাটুকুও হারিয়ে ফেলেন।

সূত্র: এএফপি।

এসএস