মডেল : তানভীন আশা, ছবি : ঢাকাপোস্ট

আগামীকাল ১৯ মার্চ বসছে ৪১তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার আসর। এই পর্ব থেকেই ছিটকে পড়ে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী। তুমুল প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে কেবল ভালো প্রস্তুতি থাকলেই চলে না; পরীক্ষার হলে কৌশলই তৈরি করে দেয় ব্যবধান! ভালো করার উপায় বাতলে দিয়েছেন 'বিসিএসে বাজিমাত'সহ ক্যারিয়ার বিষয়ক বহু গ্রন্থ প্রণেতা ও ক্যারিয়ার বিশেষজ্ঞ আরাফাত শাহরিয়ার

দুজনের গল্প দিয়ে শুরু করা যাক! লাইব্রেরিতে ছোটাছুটি, নিয়ম করে পড়াশোনা—সবই ঠিক ছিল আবীরের। বাদ সাধল সময়। পরীক্ষার হলে ঘড়ির কাঁটায় চোখ রাখতেই মাথায় হাত পড়ল! অর্ধেক প্রশ্নের উত্তর করতে না করতেই যে দুই ঘণ্টার সিংহভাগ শেষ! তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে অনেক জানা প্রশ্নের উত্তরও হয়ে গেল ভুল। বাদ পড়ল বিসিএসের আসর থেকে। নওরীনের বিষয়টা অবশ্য একটু আলাদা। প্রিলিমিনারির পরীক্ষায় বসে জানা প্রশ্নের উত্তর শেষে বাকি প্রশ্নগুলোর উত্তরের ঘর ভরাট করল কতকগুলো অনুমানের ওপর, কতকগুলো একদম না জেনেই! যদি লেগে যায়! প্রচলিত এ ধারণা তার জন্য ডেকে আনল সর্বনাশ। নেগেটিভ মার্কিংয়ের কারণে কাটা গেল অনেক নম্বর, ছিটকে পড়ল প্রতিযোগিতার প্রথম পর্ব থেকেই। এ রকম অনেক কারণেই সারা বছরের পরিশ্রম যেতে পারে জলে! বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কৌশল গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, এটিই তৈরি করে দিতে পারে ব্যবধান!

ডেডলাইন ১৯ মার্চ

১৯ মার্চ ৪১তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি)। দেশের ৮টি বিভাগীয় শহরে এ পরীক্ষা নেয়া হবে। এরই মধ্যে নির্ধারিত কেন্দ্রের তথ্য নিশ্চয়ই জেনে গেছেন। হাতে একদম সময় নেই, এ সময়ে নতুন করে তেমন কিছু পড়ার নেই। বড়জোর কঠিন মনে হয় এমন বিষয়গুলোর ওপর একবার চোখ বোলাতে পারেন। এবারই প্রথম বিসিএস পরীক্ষা হচ্ছে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে হবে। গুছিয়ে রাখতে হবে প্রবেশপত্র, কলম, পেনসিলসহ দরকারি সবকিছু।

এ আর এমন কী!

২০০ নম্বরের এমসিকিউ (মাল্টিপল চয়েস কোশ্চেন) পরীক্ষায় প্রশ্নও থাকবে মোট ২০০টি। সময় দুই ঘণ্টা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ৩৫ নম্বর, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে ৩৫, বাংলাদেশ বিষয়ে ৩০, আন্তর্জাতিক বিষয়ে ২০, ভূগোল, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ১০, সাধারণ বিজ্ঞানে ১৫, কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তিতে ১৫, গাণিতিক যুক্তিতে ১৫, মানসিক দক্ষতায় ১৫ নম্বর এবং নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসনে থাকবে ১০ নম্বর। প্রার্থী প্রতিটি সঠিক উত্তরের জন্য ১ নম্বর পাবেন, তবে প্রতিটি ভুল উত্তরে কাটা যাবে ০.৫ নম্বর। মাত্র ২০০ নম্বরের পরীক্ষা, তাও এমসিকিউ। এ আর এমন কী! আপাতদৃষ্টিতে এমনটিই মনে হতে পারে। তবে এ ধারণাকে একটু জটিল করে তুলেছে তুমুল প্রতিযোগিতা। এত বেশি প্রতিযোগিতা হয় এখানে, টিকে থাকাই দায়! তাই পরীক্ষায় ভালো করার কোনো বিকল্প নেই। মাথা ঠাণ্ডা রেখে পরীক্ষা দিতে হবে।

পরীক্ষার আগের রাত

পরীক্ষার আগের রাতে পরীক্ষাকেন্দ্রের নিকটবর্তী কোনো স্থানে থাকার চেষ্টা করুন। রাত জাগবেন না। হয়তো দেখা গেল, পরদিন সকালে পরীক্ষা, এই টেনশনে ঘুম আসছে না। টেনশন করলে আপনারই ক্ষতি। পরীক্ষাকে যত সহজভাবে নিতে পারেন ততই ভালো। সম্ভব হলে এ সময় নিজের মুঠোফোন বন্ধ রাখুন। কারণ প্রিলিমিনারি পরীক্ষার আগের রাত অনেকটাই গুজবের রাতে পরিণত হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে, ফটোকপি পাওয়া যাচ্ছে—এ ধরনের গুজব বাতাসে ভাসতে পারে। বন্ধুবান্ধবসহ পরিচিতজনরা ফোন করতে পারেন।  গুজবে কান দেবেন না। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। দেখা গেল, গুজবের পেছনে ছুটতে গিয়ে সারা রাত নির্ঘুম কাটালেন। আর এই না ঘুমানোই পরীক্ষা হলে আপনার জন্য ডেকে আনতে পারে বিপর্যয়।

পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার আগে ও পরে

বাসা থেকে বেরোতে হবে দূরত্ব বুঝে, মাথায় রাখতে হবে যানজটের বিষয়টি। পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার আগে প্রবেশপত্র, কলম, পেনসিল সঙ্গে নিয়েছেন কি না দেখে নিন। পিএসসি'র নির্দেশনা অনুযায়ী, মোবাইল ফোন, হাতঘড়ি, পকেটঘড়ি, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, বই-পুস্তক, ক্যালকুলেটর, ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসব সামগ্রী পাওয়া গেলে বিধিমালা বিধি ভঙ্গের কারণে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর পরীক্ষা বাতিলসহ ভবিষ্যতে কমিশন গৃহীত সব নিয়োগ পরীক্ষার জন্য তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হতে পারে। পিএসসি জানিয়েছে, সময় জানার জন্য পরীক্ষা কক্ষে দেয়ালঘড়ির ব্যবস্থা থাকবে। পরীক্ষার হলে প্রার্থীরা কানে কোনো আবরণ রাখতে পারবেন না, কান খোলা রাখতে হবে। অলঙ্কারজাতীয় কিছু ব্যবহার করতে পারবেন না। সঙ্গে ক্রেডিট কার্ড বা ব্যাংক কার্ডসদৃশ কোনো কিছু বহন করা যাবে না।

উত্তর করার সময় সতর্কতা

আসন গ্রহণ শেষে ওএমআর শিট দেওয়া হলে তাতে প্রয়োজনীয় সব তথ্য পূরণ করতে হবে। প্রশ্নপত্র পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরপত্রে প্রশ্নের সেট নম্বর লিখে সংশ্লিষ্ট বৃত্ত ভরাট করতে হবে। উত্তরপত্রে কালো কালির বল পয়েন্ট কলম দিয়ে সঠিক উত্তরের বৃত্ত ভরাট করতে হবে। উত্তরপত্র (ওএমআর ফরম) পরীক্ষা করা হবে একটি যন্ত্র দিয়ে। সঠিক উত্তর ও প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘর ভরাট ছাড়া উত্তরপত্রে কোনো রকম দাগ দেওয়া যাবে না। এটাকে ভাঁজ করা যাবে না, মোচড়ানো যাবে না, কোণা ভাঙা যাবে না এবং ছেঁড়া বা অন্য কোনোভাবে বিকৃত করা যাবে না। ঘষামাজা বা কলমের দাগ লেপটানোও যাবে না। কোনো রকম বিকৃতি ফরমটিকে মূল্যায়নের অযোগ্য করে তুলবে। নিজের স্বার্থেই উত্তরপত্রটি যত্নসহকারে ব্যবহার করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, বৃত্তটির অভ্যন্তরের সম্পূর্ণ অংশটি যাতে ঘন কালো হয়ে ভরাট হয়।

সাবধান, নেগেটিভ মার্কিং!

প্রতিটি শুদ্ধ উত্তরের জন্য পাওয়া যাবে এক নম্বর। আর প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য কাটা যাবে ০.৫০ নম্বর। এই আধা নম্বর কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়! ভালোভাবে জানা আছে- এমন প্রশ্নের উত্তর বেছে বেছে উত্তর করাটাই হবে সঠিক সিদ্ধান্ত। ধরা যাক, আপনি ১৫০টির সঠিক উত্তর করলেন, অনুমানে উত্তর করতে গিয়ে ভুল উত্তর করলেন ৪০টি। এ ক্ষেত্রে ২০ নম্বর কেটে আপনার প্রাপ্ত নম্বর দাঁড়াবে ১৩০। যদি আন্দাজে বৃত্ত ভরাটের ঝুঁকিটা না নিতেন, আপনার প্রাপ্ত নম্বর হতো ১৫০। তাই প্রশ্ন ছেড়ে আসাটা আপাতদৃষ্টিতে বোকামি মনে হলেও সেটাই হতে পারে পরীক্ষায় টিকে থাকার একটি কৌশল। মাথায় রাখতে হবে, অনেকেই প্রিলিমিনারি থেকে বাদ পড়ে অনুমানের ওপর উত্তর করতে গিয়ে। উত্তর করার আগে পুরো প্রশ্নটি পড়ে নেওয়াটাও কিন্তু জরুরি। দেখা গেল, কোনো প্রশ্নের সঠিক উত্তর হবে ‘ওপরের সবগুলো’। আপনি প্রথম অপশনটি পড়েই সেটি সঠিক মনে করে বৃত্ত ভরাট করে ফেললেন। আপনার অজান্তেই কিন্তু ভুল হয়ে গেল!

সহজ বিষয় সবার আগে

সময় ব্যবস্থাপনা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রে যাওয়ার আগেই প্রতিটি বিষয়ের জন্য সময় ভাগ করে নিতে হবে। কোন বিষয়ের উত্তর আগে করবেন, কোনটির জন্য কত সময় বরাদ্দ রাখবেন—এসব বিষয়ে আগে থেকেই পরিকল্পনা করে নেওয়া ভালো। যে বিষয় সহজ মনে হয়, সেটি সবার আগে উত্তর করতে হবে। গণিতে ভালো হলে গাণিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতা অংশের উত্তর আগে করতে পারেন। গণিতে কিছুটা দুর্বল হলে সব শেষে গণিত অংশের উত্তর করুন। এ ক্ষেত্রে বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান, বিজ্ঞান কিংবা যেটি ভালো পারেন সে বিষয়ের উত্তর আগে করতে পারেন। উত্তর না করা প্রশ্নগুলো টিক, ক্রস বা পছন্দমতো বিশেষ কোনো চিহ্ন দিয়ে মার্ক করতে পারেন। প্রথমে জানা প্রশ্নগুলোর উত্তর করতে হবে। কঠিন কোনো প্রশ্ন নিয়ে সময় নষ্ট না করে কিংবা কোনো প্রশ্নের উত্তর মনে না এলে সময় নষ্ট না করে পরের প্রশ্নে চলে যান।

জিতে আসুন বিসিএস

প্রশ্ন সহজ হলে বেশি প্রশ্নের উত্তর করা যেতে পারে, প্রশ্ন কঠিন হলে বেশি উত্তর না করাই ভালো—বিগত বিসিএসের অভিজ্ঞতা তা-ই বলে। কোনো প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত জানা থাকলে সময় নষ্ট না করে বৃত্ত ভরাট করে ফেলুন। কিছু প্রশ্ন ভেবে উত্তর করতে হয়, তাই সময় বেশি লাগে। সহজ প্রশ্নগুলোর বেলায় সেই সময়টি আপনাকে বাঁচাতে হবে। আর একটি বিষয়, কোনো প্রশ্নের দুটি ভুল উত্তর শনাক্ত করতে পারলেও সঠিক উত্তর দেওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, ভুল উত্তরের জন্য আধা নম্বর কাটা যাবে। আশপাশে কারো সঙ্গে কথা বলতে যাবেন না, এতে বিভ্রান্ত হতে পারেন। যারা মাথা ঠাণ্ডা রেখে এই দুই ঘণ্টা পার করতে পারবেন, বিসিএসের প্রথম ধাপ তারাই অতিক্রম করতে পারবেন। চাকরিপ্রার্থীসংখ্যা অনেক বেশি দেখে ভয় পাবেন না। প্রস্তুতি তো আছেই। আত্মবিশ্বাস রাখুন, আপনি সফল হবেন।