দম্ভের পতন : নিজের গড়া ট্রাইব্যুনালে হাসিনার ফাঁসির রায়
শেষ হতে চলেছে ২০২৫ বর্ষপঞ্জি। এ বছর দেশের বিচারাঙ্গনে এক যুগান্তকারী অধ্যায় রচনা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দেশের ইতিহাসে প্রথমবার কোনো সরকারপ্রধানকে মৃত্যুদণ্ডের রায় শুনতে হয়েছে। চব্বিশের জুলাই গণহত্যা মামলায় এমনই দণ্ড পেয়েছেন দেড় দশকের ক্ষমতার দম্ভ চূর্ণ হওয়া দেশান্তরী শেখ হাসিনা। নিজের গড়া ট্রাইব্যুনালেই নির্ধারিত হলো সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর পরিণতি। একই অপরাধে ফাঁসির দণ্ড পেয়েছেন তার সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।
এখানেই শেষ নয়, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে সংঘটিত গুমের বিচারও শুরু হয়েছে ২০২৫ সালের শেষপ্রান্তে। এসব অপরাধের দায়ে প্রিজনভ্যানে চড়ে ট্রাইব্যুনালে হাজিরা দিতে হয়েছে সাবেক ও বর্তমান ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে। মানবতাবিরোধী অপরাধে সাধারণ বন্দির মতোই নিয়মিত হাজিরা দিয়েছেন একসময়ের ‘হেভিওয়েট’ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। এমনকি আদালত অবমাননার দায়ে নিস্তার পেতে বিএনপি নেতা ফজলুর রহমানকেও এই আদালতে এসে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
নিজের গড়া ট্রাইব্যুনালে বিচার
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। তখন ক্ষমতার মসনদে ছিলেন শেখ হাসিনা। তার টানা শাসনামলে বেশ কয়েকটি মামলার রায় এলেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ছয়জনের; যাদের পাঁচজনই ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর এবং একজন বিএনপির শীর্ষ নেতা। শেখ হাসিনার প্রায় ১৬ বছরের এই কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে। দেশজুড়ে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে পুনরায় গঠিত হয় ট্রাইব্যুনাল। আর এবারের প্রথম রায়টিই এলো হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে।
বিজ্ঞাপন
শেখ হাসিনার মামলার বিচার শেষ হতে লেগেছিল ৩৯৭ দিন। এ মামলায় হাসিনা ও কামালের সঙ্গে পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকেও আসামি করা হয়। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। ১৬ অক্টোবর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এবং পরদিন কামাল ও মামুনের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ গ্রেপ্তার হন সাবেক পুলিশপ্রধান মামুন। তদন্ত শেষে ১ জুন এই তিনজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে প্রসিকিউশন। ১০ জুলাই শুরু হয় আনুষ্ঠানিক বিচার।
একই দিন নিজের দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হন চৌধুরী মামুন। ৩ আগস্ট শুরু হয় প্রথম সাক্ষ্যগ্রহণ। মোট ২৮ কার্যদিবসে ৫৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা সম্পন্ন হয়। দীর্ঘ শুনানি ও যুক্তিতর্ক শেষে ১৭ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় হাসিনা ও কামালকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একইসঙ্গে তাদের সব সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত।
রাজসাক্ষী হওয়ায় চৌধুরী মামুনকে দেওয়া হয় পাঁচ বছরের সাজা। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। যদিও আদালত অবমাননার মামলায় একই ট্রাইব্যুনালে ছয় মাসের সাজা পেয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চলতি বছরের ২ জুলাই এ রায় ঘোষণা করা হয়।
ফজলুর রহমানের নিঃশর্ত ক্ষমা
বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফজলুর রহমান ট্রাইব্যুনাল নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। টেলিভিশন টকশোতে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নিয়ে চ্যালেঞ্জ করায় তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। ৮ ডিসেম্বর সশরীরে হাজির হয়ে তিনি ট্রাইব্যুনালের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চান। আদালত তাকে সতর্ক করে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন।
গুম ও নির্যাতনের বিচার
আওয়ামী লীগ শাসনামলে র্যাবের ‘টিএফআই’ সেল ও ‘জেআইসি’ সেলে বিরোধীদের ওপর চালানো নৃশংসতার বিচারও শুরু হয়েছে। গুম থেকে বেঁচে ফেরা ভুক্তভোগীদের অভিযোগে হওয়া দুটি মামলায় আসামি করা হয়েছে ৩০ জনকে, যার অধিকাংশই সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তা। এর মধ্যে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এসব মামলায় শেখ হাসিনা ও তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিককেও আসামি করা হয়েছে। গুমের মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
পলাতক জয় ও ইন্টারনেট বন্ধের মামলা
আইনের জালে ধরা পড়েছেন শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে গণহত্যায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে তিনি এখন ফেরারি আসামি। এই মামলার অপর আসামি সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। পলাতক জয়ের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী ৭ জানুয়ারি এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানি হবে।
সালমান-আনিসুলের বিচার
নৌকায় চড়ে পালানোর সময় গ্রেপ্তার হওয়া সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিচারও দ্রুত গতিতে এগুচ্ছে। জুলাই অভ্যুত্থান দমনে কারফিউ জারি ও উসকানির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে বিচার চলছে। প্রসিকিউশন আদালতে তাদের ষড়যন্ত্রের একটি ফোনালাপও প্রমাণ হিসেবে বাজিয়ে শুনিয়েছে। আগামী ৪ জানুয়ারি তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে এই দুজন ছিলেন অতি ক্ষমতাধর। আইনমন্ত্রী থাকাবস্থায় জুলাইয়ে সাড়ে চার লাখ ছাত্র-জনতার নামে ২৮৬টি মিথ্যা মামলা করা হয়েছিল আনিসুল হকের নির্দেশে। অন্যদিকে, আন্দোলন দমনে মরিয়া ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। নিরীহ ছাত্র-জনতাকে নির্মূলে শেখ হাসিনাকে কারফিউ জারিসহ নানা উসকানি আর প্ররোচনা দিয়েছিলেন এই দুই প্রতাপশালী। সালমান-আনিসুলের পরামর্শের এমন একটি ফোনালাপও ট্রাইব্যুনালে বাজিয়ে শুনিয়েছেন প্রসিকিউশন।
বছর শেষ হলেও মানবতাবিরোধী অপরাধের আরও ডজনখানেক মামলার বিচার এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এর মধ্যে চানখারপুল গণহত্যা, আবু সাঈদ হত্যা, আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের মামলা অন্যতম। যদিও শেখ হাসিনার পতনের দিন তথা চব্বিশের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখারপুলে ছয় হত্যা মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছে ২০ জানুয়ারি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৫ সাল বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
এমআরআর/