সবুজ পাসপোর্ট হাতে বিশ্বের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ১৩০ দেশে ভ্রমণ করেছেন বাংলাদেশি নারী কাজী আসমা আজমেরী। বিশ্ব পর্যটক হিসেবে শতাধিক দেশে বাংলাদেশের পতাকা উঁচিয়ে ধরার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি।

খুলনার মেয়ে কাজী আসমা আজমেরী ছোট বেলা থেকেই ঘোরাঘুরি পছন্দ করতেন। তার বেড়ে ওঠা খুলনা শহরে। কাজী গোলাম কিবরিয়া ও কাজী সাহিদা আহমেদ দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে আসমা বড়। খুলনা থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক করেন। একই বিষয়ে এমবিএ করেন ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ঘুরে বেড়ানোর শখ আর আগ্রহকে পুঁজি করে ২০০৯ সালে নেমে পড়েন বিশ্ব-ভ্রমণে। এরপর থেকে এক এক করে বিশ্বের ১৩০ দেশ ছুঁয়েছেন বাংলাদেশি সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে।

২০০৯ সাল থেকে শুরু করে ২০২২ সাল, এই তের বছরের পথপরিক্রমায় ১৩০ দেশ ভ্রমণের পর এখন বিশ্বের অন্য দেশগুলোতেও তার পদচিহ্ন এঁকে দিতে চান তিনি। চষে বেড়াতে চান বাকি দেশগুলোর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

একজন বাংলাদেশি সবুজ পাসপোর্টধারী হয়ে বিশ্বের এতগুলো দেশ ঘুরে বেড়ানো মোটেই সহজ বিষয় ছিল না তার জন্য। পদে পদে এসেছে বাধা, সৃষ্টি হয়েছে নানান প্রতিকূলতা, তবুও তিনি দমে যাননি। ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছেন বিশ্বকে দেখার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে, এই ইচ্ছাশক্তি তাকে পৌঁছে দিয়েছে ১৩০ দেশের মাটিতে।

বিশ্ব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, গল্প নিয়ে সম্প্রতি ঢাকা পোস্ট কার্যালয়ে আলাপ হয় কাজী আসমা আজমেরীর সঙ্গে। তার সঙ্গে আলাপচারিতার চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা পোস্টের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আবু সালেহ সায়াদাত।

ঢাকা পোস্ট : সর্বশেষ কোন দেশ ঘুরলেন? পরবর্তী লক্ষ্য কোন দিকে?

কাজী আসমা আজমেরী : সর্বশেষ গত মাসে ঘুরে এসেছি ক্যারিবীয় অঞ্চলের দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট লুসিয়া। এটিই ছিল আমার বিশ্ব ভ্রমণের ১৩০ তম দেশ। ১৩ বছরে ১৩০ দেশ ঘুরেছি বাংলাদেশি এই সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে। পরবর্তী লক্ষ্য বলতে, আগামী ২ বছরের মধ্যে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ ঘুরে দেখার ইচ্ছে রয়েছে।

ঢাকা পোস্ট : আপনার বিশ্ব ভ্রমণের গল্প কীভাবে শুরু হলো…?

কাজী আসমা আজমেরী : বাবা-মার সঙ্গে আগে বিদেশ ঘুরেছি। তবে ২০০৯ সালে প্রথমে একা একা নেপালে যাই, আর সেখান থেকেই শুরু হয় আমার বিশ্ব ভ্রমণের পরিকল্পনা। একজন নারী পর্যটক হিসেবে আমার অনেক অনেক স্ট্রাগল করতে হয়েছে। প্রতিবেশী স্বজনরা নানান কথা শুনিয়েছেন। বলেছে, একজন নারী হয়ে তুমি কীভাবে একা একা বিশ্ব ঘুরবে। মূলত এমন সব কথার কারণে আমার ভেতরে একটা জেদ সৃষ্টি হয়। এটাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। ভেবেছি বিশ্ব-ভ্রমণ করে আমাকে দেখাতেই হবে। এছাড়া ছোট বেলা থেকেই খুব দুরন্ত ছিলাম, প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল ঘুরে বেড়ানোর—বিশ্বকে দেখার। এমন মনোভাব থেকেই বিশ্ব-ভ্রমণ শুরু। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে নেপাল ভ্রমণের মাধ্যমে আমার বিশ্বযাত্রা শুরু। আস্তে আস্তে হয়ে উঠলাম একজন বিশ্ব পর্যটক।

ঢাকা পোস্ট : বিশ্ব ভ্রমণ করতে গিয়ে কী ধরনের বাধা-বিপত্তি পোহাতে হয়েছে?

কাজী আসমা আজমেরী : বিশ্ব ভ্রমণ আর পর্যটক হিসেবে যেমন অনেক কিছু জেনেছি, তেমনি অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছি। তবে ভিসা প্রাপ্তি থেকে শুরু করে পদে পদে অনেক বাধা এসেছে, পোহাতে হয়েছে বিড়ম্বনা। আমি ২০১০ সালে ভিয়েতনামে গিয়েছিলাম, তখন আমার রিটার্ন টিকিট, হোটেল বুকিং ছিল না। সেই সঙ্গে আমার বাংলাদেশি দুর্বল পাসপোর্ট। সব কিছু মিলিয়ে তারা আমাকে সন্দেহ করেছে, ভেবেছে পার্মানেন্ট কোনো দেশে থেকে যাব। এই অবস্থায় আমাকে তাদের ইমিগ্রেশন ২৩ ঘণ্টা জেলে আটকে রেখেছিল। এটা ছিল আমার জন্য তিক্ত অভিজ্ঞতা, আমি কান্না করেছি, খারাপ লেগেছে খুব। তখন আমার মধ্যে একটা জেদ কাজ করেছে। আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশি এই পাসপোর্টকে উচ্চ স্থানে নিয়ে যেতে হবে। সব দেশে ভ্রমণ করে এই পাসপোর্টকে সম্মানজনক স্থানে নিয়ে যেতে হবে। এরপর থেকেই আমি চ্যালেঞ্জ নিয়েছি এই বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়েই বিশ্ব-ভ্রমণের।

তিনি বলেন, বাংলাদেশি হিসেবে এত দেশ ভ্রমণের নজির তেমন নেই বললেই চলে। আমাদের দেশের মানুষ বেশিরভাগই শ্রমিক হিসেবে বিভিন্ন দেশে যায়। পর্যটক হিসেবে কিছু সংখ্যক মানুষ ঘুরতে যায়। তাই আমি বিশ্বের দরবারে একজন বিশ্ব পর্যটক হিসেবে আমার এই পাসপোর্টকে পরিচিত করাতে চাই। বিশ্বের অন্যরাও যেন উপলব্ধি করতে পারে বাংলাদেশিরাও বিশ্ব ভ্রমণে পিছিয়ে নেই।

ঢাকা পোস্ট: এতগুলো দেশ ঘুরেছেন, ভালো লাগার অভিজ্ঞতাগুলো একটু শুনতে চাই।

কাজী আসমা আজমেরী : প্রতিটি দেশরই রয়েছে আলাদা-আলাদা সৌন্দর্য রয়েছে, ভিন্ন ভিন্ন সব কালচার। যার প্রতিটিই আমাকে দোলা দিয়েছে। মরক্কো ভালো লেগেছে, ইবনে বতুতার বাড়ি দেখেছি। মিশরের পিরামিড, কিউবাও খুব ভালো লেগেছে। প্রতিটি দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাই ছিল অন্যরকম ভালো লাগার মতো। আমি পেরেছি বাংলাদেশের পতাকাকে বিশ্বের ১৩০ দেশে পৌঁছে দিতে। এটি শুধু আমার একার জয় না, এটা বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের জয়।

ঢাকা পোস্ট : আপনার পাসপোর্টে এতগুলো দেশের সিল পড়েছে, ভিসা পেতে কী ধরনের বিড়ম্বনা পেতে হয়?

কাজী আসমা আজমেরী : বাংলাদেশি পাসপোর্ট হিসেবে অনেক দেশের ভিসা পেতে নানা রকম ভোগান্তি পোহাতে হয়, দীর্ঘ দিন লেগে যায়। অনেক দেশের ভিসা পেতে খুব সমস্যা হয়ে যায়। সাউথ আফ্রিকার ভিসা পেতে বলতে গেলে আমার দশ বছর লেগে গেছে। প্রথম ২০১০ সালে যেতে চেয়েছি সাউথ আফ্রিকায়, তখন বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার জন্য যেতে চেয়েছিলাম। তখন বলা হয়েছিল শ্রীলঙ্কার কলম্বো থেকে নিতে হবে ভিসা। ২০১১ সালে কলম্বোতে যাই তখন আমাকে বলা হয় ইনভাইটেশন ছাড়া তারা আমাকে ভিসা দেবে না। আমি তাদের বললাম সেখানে তো আমি কাউকে চিনি না, আমি একজন বিশ্ব পর্যটক। তখন তারা আমাকে আমাদের হোম মিনিস্ট্রি থেকে লেটার নিয়ে যেতে বলে। কিন্তু সে সময় আর হয়ে ওঠেনি। আমি যখন নিউজিল্যান্ডে থাকি তখনও চেষ্টা করেছি, ভিসা পাইনি। সর্বশেষ দিল্লি থেকে ভিসা পেয়েছি। এমন নানান ঘটনা আছে, অনেক দেশ আছে যেগুলো ভিসা পেতে আমার খুব বিড়ম্বনা হয়েছে। জর্ডানের ভিসা পাচ্ছি না, আরও অনেক দেশ আছে যেখানে ভিসা পাওয়া অনেক সমস্যা হয়।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশিদের জন্য অনেক দেশের ভিসা পাওয়া অনেক খুবই কষ্টকর-দুর্লভ, বলতে গেলে পাওয়াই যায় না। সুইডিশ বা অন্য ভালো দেশের পাসপোর্ট হোল্ডার টিকিট কাটছে আর চলে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের এই বাংলাদেশি পাসপোর্টে আমরা অনেক দেশেই যেতে পারি না, ভিসা পাই না।

তিনি আরও বলেন, আমি জর্জিয়া থেকে আজারবাইজানের ভিসা করেছি, সেটা ছিল আমার ৯৬ তম দেশ ভ্রমণ। প্রথমে তো তারা ভিসা দিবেই না, তারা বলেছে দিল্লিতে যেতে হবে। আমি প্রতিদিন জর্ডানের অফিসে যেতাম, অনুরোধ করতাম ভিসা দেওয়ার জন্য। অনেক অনুরোধের পর তারা দিয়েছিল ৩ দিনের ভিসা। তারা দেখেছে আমি অনেক দেশ ঘুরেছি, এরপর দিয়েছে ভিসা।

ঢাকা পোস্ট : আপনি তো অন্য দেশে থাকেন, সেখান থেকেও তো নতুন করে পাসপোর্ট নিতে পারেন?

কাজী আসমা আজমেরী : আমি নিউজিল্যান্ডে বসবাস করি, চাকরির সুবাদে সেখানে থাকি। আমি ইচ্ছে করলে সেখানকার পাসপোর্ট নিতে পারতাম আর বিড়ম্বনা ছাড়া বিভিন্ন দেশের ভিসাও পেয়ে যেতাম। কিন্তু তা করিনি, সুযোগ থাকার পরেও আমি আমার বাংলাদেশি পাসপোর্ট বহন করে চলেছি। এটার জন্য আমি গর্বিত। বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বিশ্ব ভ্রমণ করে যাচ্ছি। এই পাসপোর্টেই ১৩০টি দেশ আমি ঘুরেছি। সুযোগ থাকার পরও আমি নেইনি। বিশ্বের যেখানেই যাই সেখানেই এই পাসপোর্ট হাতে নিয়েই ছবি তুলি। যে কারণে সবাই আমাকে ‘পাসপোর্ট গার্ল’ বলে ডাকে বা চিনে।

তিনি আরও বলেন, ছোটবেলা থেকেই চ্যালেঞ্জিং লাইফ লিড করতে ভালোবাসি। এই সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে আমাকে এমন আমি খুব ধৈর্য দেখিয়েছি। একটা ভিসা পেতে অনেক কষ্ট হওয়ার পর যখন ইমিগ্রেশন ক্রস করি তখন আমার আলাদা ধরনের তৃপ্তি লাগে। মনে হয় এক একটা যুদ্ধ আমি জয় করলাম। তবে যদি আমার নিউজিল্যান্ডের পাসপোর্ট থাকতো তাহলে আমি এই যুদ্ধটা এনজয় করতে পারতাম না। তবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আমাকে সবুজ পাসপোর্ট গার্ল হিসেবে চিনেছে, এটাই আমার বড় প্রাপ্তি।

ঢাকা পোস্ট : আপনি ১৩০ ঘুরে বিশ্ব পর্যটক হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছেন, আপনার ব্যক্তি জীবনের গল্প শুনতে চাই।

কাজী আসমা আজমেরী : আমি খুলনার মেয়ে। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে আমি। আমার বেড়ে ওঠা খুলনাতেই। এসএসসি, এইচএসসি শেষে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছি। এরপর নিউজিল্যান্ডে চলে যাই, চাকরির সুবাদে এখন সেখানেই বসবাস করছি। রেড ক্রসে কাজ করতাম আগে, এখন অন্য একটি চাকরি করছি। রোটারি ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছি। বিভিন্ন দেশের স্বেচ্ছাসেবী বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে থাকতে ভালোবাসি। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার একটি কোম্পানির সঙ্গে কাজ করছি, মূলত অনলাইনে কাজ করি সেখানে। বাংলাদেশ শুধু নয় আমি সাউথ এশিয়ার মধ্যে ইয়াংগেস্ট একজন নারী যে এ বয়সেই ১৩০ দেশ ভ্রমণ করেছি। ভ্রমণের পাশাপাশি আমি একজন চেঞ্জমেকার, মোটিভেশনাল স্পিকার। এছাড়া আমার একটা ছোট ট্রাভেল এজেন্সি রয়েছে। আমি খুলনায় একটি ছোট লাইব্রেরি করেছি। মানুষের জন্য কিছু করতে চাই।

ঢাকা পোস্ট : বিভিন্ন দেশে যখন যান তখন ভ্রমণের পাশাপাশি আর কী কী কার্যক্রম থাকে আপনার?

কাজী আসমা আজমেরী : আমি আগেই বলেছি বিশ্ব পর্যটকের পাশাপাশি আমি একজন চেঞ্জমেকার, মোটিভেশনাল স্পিকার। ছোটবেলা থেকেই জেন্ডার বৈষম্য বিষয়টি আমাকে তাড়িত করতো। আমি রোটারি ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যুক্ত আছি। বিভিন্ন দেশে স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানায় ছেলে-মেয়েদের ভ্রমণের গল্প শোনানোর জন্য। আমার ভ্রমণের ৯০ তম দেশ ফিলিপিন থেকে আমার জীবনের গল্প শোনানো, ছেলে-মেয়েদের অনুপ্রাণিত করার কাজ শুরু করি। অসমতা বিষয়ে তাদের সাহস দেই। আমি এ পর্যন্ত  ৫০ হাজার ছেলে-মেয়েকে আমার ভ্রমণের গল্প শুনিয়েছি। আগামীতে ১৫০ তম দেশ ভ্রমণ করার মধ্যে দিয়ে আমি আশা করছি প্রায় ১ লাখ ছেলে-মেয়েকে আমার ভ্রমণের গল্প শোনাতে পারবো।

তিনি আরও বলেন, সবশেষ জিম্বাবুয়ের একটি স্কুলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের আমার ভ্রমণের গল্প শুনিয়ে অনুপ্রাণিত করেছি। আমি একজন বাংলাদেশি, একজন নারী, একটি ‘দুর্বল’ পাসপোর্ট নিয়ে বিশ্ব ভ্রমণ করছি। তাহলে তারা কেন পারবে না। ভ্রমণ করলে কত কিছু জানা যায়, সাহস জাগে নিজের প্রতি... এমন সব গল্প শুনিয়েছি তাদের। আমি বিভিন্ন দেশে যাই ইকুয়ালিটি নিয়ে কথা বলি, বিভিন্ন সেমিনারে এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলি। ছেলে-মেয়েদের ট্রাভেল করার বিষয়ে অনুপ্রাণিত করি।

বিশ্ব ভ্রমণের গেলে যা কিছু শেখা যায়, যেমন অভিজ্ঞতা হয়— সেসব বিষয় ছেলে-মেয়েদের মাঝে তুলে ধরলে তারা অনুপ্রাণিত হয়। ভ্রমণ বিষয়ে মনকে কীভাবে প্রসারিত করে, আত্মবিশ্বাস বাড়ে, বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত হয়। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলি সবার সঙ্গে, তারাও মোটিভেটেড হয়।

ঢাকা পোস্ট : একজন নারী হয়েও নানান চ্যালেঞ্জ উপেক্ষা করে বিশ্ব পর্যটকের তালিকায় নিজেকে নিয়ে এসেছেন। বিভিন্ন দেশে যখন যান, তখন এ বিষয় নিয়ে অন্যরা কী বলে?

কাজী আসমা আজমেরী : অন্যান্য দেশে নারী পুরুষের বৈষম্যটা কম। তাই তারা খুব বেশি অবাক হয় না আমার বিষয়ে। কিন্তু আমি যখন আফ্রিকায় গিয়েছিলাম বিশেষ করে বতসোয়ানা, নামিবিয়া, জিম্বাবুয়ে, জাম্বিয়া, মোজাম্বিক দেশগুলোতে ঘুরেছি- তখন তারা খুব অবাক হতো। তারা বলতো, তুমি একজন নারী হয়ে এত দেশ কীভাবে ঘুরলে? তারা খুব অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করতো।

সুইডেনের ৪০ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন দেশ ঘুরেছে, ইউরোপের অনেক মানুষ ৮০/৯০টা দেশ ঘুরেছে। আমি সেঞ্চুরি ক্লাবের মেম্বার। সেখানকার সবাই একশর বেশি দেশ ঘুরেছে। তাদের কাছে এটা কোনো বিষয় না। তবে আমি যেহেতু অল্প বয়সেই এতোগুলো দেশ ঘুরেছি, তাই অনেকেই অবাক হয়। এতো দেশ ঘুরেছি জার্মান, লেবানন, সুইডিশ টিভিতে-রেডিওতে ডেকেছে, বিভিন্ন প্রোগ্রামে আমাকে ডাকে। তবে আমাকে ডাকার অন্যতম আরেকটি কারণ হলো আমি একটি দুর্বল পাসপোর্ট নিয়ে, চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশ্ব ভ্রমণ করছি, করতে পেরেছি তাই। এতে করে আমি আরও উৎসাহ পাচ্ছি, অন্যদেরও উৎসাহ দিচ্ছি।

একজন নারী হিসেবে এতো দেশ ঘোরার কারণে বিবিসি বাংলা, জার্মানি, সুইডেনের রেডিও, উজবেকিস্তানের টিভি, রাশিয়ার পত্রিকা, ভারতের আনন্দ বাজার, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, দ্যা হিন্দু সহ দেশের অনেক পত্রিকায় আমার ভ্রমণ নিয়ে প্রায় ১০০টির মত আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোই আমার পাওয়া, আমার দেশকে সবার সামনে তুলে ধরার গর্ব।

ঢাকা পোস্ট : আপনি এত দেশ ঘুরলেন, সবার মনে একটা প্রশ্ন জাগে, এত দেশ ঘুরতে তো প্রচুর টাকার প্রয়োজন—এগুলোর জোগান কীভাবে হয়েছে?

কাজী আসমা আজমেরী : আমি নিউজিল্যান্ডে চাকরি করি, আর পড়ালেখা চলমান থাকা অবস্থা থেকেই আমি চাকরি করে আসছি। আগে থেকেই আমি টাকা জমাই। পরে প্রতি দেড় বছর চাকরি করে সেই টাকা জমিয়ে রাখি, আর পরের ৬ মাস বিশ্ব ভ্রমণে বের হই। সম্পূর্ণ নিজের খরচেই আমি ঘুরে বেড়াই। ৬ মাস টানা ট্যুর করলে একটি জিনিস হয় যে খরচটা কমে আসে। এছাড়া লো-কস্টের অনেক এয়ারলাইন্স আছে তাদের বিভিন্ন অফারে আমি নজর রাখি। কোন দেশে গেলে একবার ফ্লাই করি, আর বাকি জায়গাগুলোতে আমি সড়ক পথে বাসে-ট্রেনে যাতায়াত করে খরচটা কমিয়ে আনি। অনেক সময় ইয়ুথ হোস্টেলে থাকি, এভাবে খরচ কমিয়ে আনার চেষ্টা করি সব সময়। নিজের টাকা আর ভ্রমণের আগ্রহ থেকেই আমি বিভিন্ন দেশ ঘুরতে পেরেছি।

ঢাকা পোস্ট : আমাদের দেশের অনেকে এখন বিদেশ ভ্রমণে আগ্রহী হয়ে উঠছে। সবার মধ্যে সর্বনিম্ন খরচে কীভাবে বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়ানো যায়- এমন বিষয়ে জানান আগ্রহ থাকে। এ বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?

কাজী আসমা আজমেরী :  কম খরচে সবাই বিশ্ব ভ্রমণ করতে চায়, আমি নিজেও এমটা অনুসরণ করি। আমারা যারা ভ্রমণ প্রিয় মানুষ তাদের জন্য লোকস্টের বেশ কিছু এয়ারলাইন্স আছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের অফার, ডিসকাউন্ট থাকে ফ্লাইটে, হোটেলে। কোন সময়টা ভ্রমণ করলে খরচ কম সেটা জানতে হবে। আমি যে পন্থা অবলম্বন করি তা হলো- কোনো দেশে গেলে প্রথমে একবার ফ্লাই করে সেখানে যাই। পরে আশপাশের দেশে বাসে, ট্রেন করে যাই। এমনও হয়েছে আমি ২৩ হাজার কিলোমিটার ট্রেনে-ট্রেনে গেছি। চায়না থেকে ইউরোপে যাওয়ার রেকর্ড আছে আমার। সেক্ষেত্রে আমার কম খরচ কম হয়, আর বিশ্ব ঘোরার শখটাও পূরণ হয়। এমন সব কৌশল সবাই অবলম্বন করলে কম খরচে বিশ্ব ভ্রমণ করতে পারবেন।

এছাড়া বিভিন্ন দেশে ইয়ুথ হোস্টেল আছে সেগুলোতে থাকলে বাংলাদেশি টাকায় মাত্র এক-দুই হাজার টাকায় থাকা যায়। অনেক বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় হয়, কালচার জানা যায়, সেই সঙ্গে সবচেয়ে বড় ব্যাপার খরচ অনেক কম। সবার যেহেতু উদ্দেশ্য বিদেশ ঘোরা তাই শপিংটা না করলে অনেক ভালোভাবে ভ্রমণ করা যাবে।

ঢাকা পোস্ট : আপনাকে দেখে অনেকে বিশ্ব ঘুরে দেখার অনুপ্রেরণা পায়, আপনার মতো করে বিশ্বটা ঘুরে দেখতে চায়। তাদের উদ্দেশ্যে কী বলবেন?

কাজী আসমা আজমেরী : তরুণদের বলবো তোমরা বিশ্বটাকে দেখার চেষ্টা করো, বিশ্বে অনেক কিছু আছে, অনেক জানার বিষয় আছে। তোমরা অনেক কিছু জানতে পারবে। আর নারীরাও যেন ভ্রমণ অবশ্যই করে, তাহলে তোমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে অনেকগুণ। তরুণরা বেরিয়ে পড়। ঘুরতে শুরু করো। টাকা জমিয়ে বিদেশ ঘুরো, ঝুড়িতে অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকবেই। পাশাপাশি আমার নিজেরও লক্ষ্য বাংলাদেশি ট্রাভেলর হিসেবে বিশ্বের মানুষকে আমাদের দেশকে পরিচিত করানো। সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে বিশ্ব ভ্রমণের বিষয়ে উৎসাহিত করবো অন্যদের।

এএসএস/এসএম