ঈদের ষষ্ঠ দিনে দর্শনার্থীতে পূর্ণ রাজধানীর পুরান ঢাকার আহসান মঞ্জিল। কেউ এসেছেন পরিবার-পরিজন নিয়ে, কেউ এসেছেন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে। অনেক বিদেশি দর্শনার্থীও এসেছেন আহসান মঞ্জিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। 

একদিকে ঈদের আনন্দ, অন্যদিকে সাপ্তাহিক ছুটি। সব মিলিয়ে আহসান মঞ্জিলে দর্শনার্থীর ভিড়। শুক্রবার (১৫ জুলাই) সরেজমিনে এমনটি দেখা গেছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এমনিতে ভিড়, তার ওপর ঈদের উপলক্ষ। নানা বয়সী মানুষ ঘুরতে এসেছেন নবাবী আমলের এ স্থাপনায়।  

নারায়ণগঞ্জের পাগলা থেকে উম্মে কুলছুম হীরা সন্তানদের নিয়ে এসেছেন আহসান মঞ্জিল দেখতে। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন দর্শনীয় স্থানে বেড়াতে আসা সবসময়ই আনন্দের। আমি আরও ৪-৫ বার এসেছি আহসান মঞ্জিলে। তখন বাচ্চারা ছোট ছিল। তাদের কিছু মনে নেই, এখন বড় হয়েছে। আর তাই তাদের ইতিহাস দেখানো ও জানানোর জন্য এখানে নিয়ে এসেছি।  

রাজধানীর খিলক্ষেত থেকে ঘুরতে আসা রাশেদুল হাসান বলেন আমরা চার বন্ধু একসঙ্গে ঘুরতে এসেছি। ঢাকার অনেক জায়গায় গিয়েছি। কিন্তু আহসান মঞ্জিলে আসা হয়নি। এবার ছুটির দিনে এলাম। নবাবী আমলের অনেক কিছুই দেখলাম।  

বিক্রমপুর থেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আসা হারিস হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি প্রথমবারের মতো আহসান মঞ্জিলে এসেছি। এখানকার বাইরের পরিবেশ যদিও মনোমুগ্ধকর তবে দর্শনার্থী বেশি। তাই ভালোভাবে উপভোগ করা যাচ্ছে না। এছাড়া প্রচণ্ড গরমে অস্বস্তি লাগছে। কয়েকদিন পরে আবার আসব। তখন ভালোভাবে ঘুরে ঘুরে দেখবো নিদর্শনসমূহ।

গাজীপুর থেকে আহসান মঞ্জিলে আসা সাহাদাত হোসেন ঢাকা পোস্টকে জানান নবাবদের সম্পর্কে অনেক কিছুই জেনেছি বই-পুস্তকে। নবাবী আমলের অনেক কিছুই পড়েছি। আজ সবকিছুই বাস্তবে এসে দেখলাম। খুব ভালো লাগছে। এ ছাড়া কর্মব্যস্ততার পর বন্ধের দিনে ঘুরতে এসেছি তাই অনেকটা আনন্দ লাগছে। পরিবেশটা ভালো, তবে লোকজন একটু বেশি মনে হচ্ছে। 

শিশু তাসফিয়া এসেছে বাবা-মায়ের সাথে। সে বলেন এখানে খুব ভালো লাগছে। অনেকক্ষণ ধরে এসেছি। ভেতরে পুরনো অনেক নিদর্শন দেখেছি। একটু পর বুড়িগঙ্গা নদীতে ঘুরতে যাব।

আহসান মঞ্জিলের নিরাপত্তা পরিদর্শক হাসিবুল হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে শুক্রবার ও শনিবার অনলাইনে ১ হাজার ও অফলাইনে ১ হাজার টিকিটসহ মোট ২০০০ টিকেট দেওয়া হচ্ছে। অন্যান্য দিন অনলাইনে ১ হাজার এবং অফলাইনে ৫০০ টিকেট দেওয়া হচ্ছে। আগে শুধু অনলাইনে টিকিট দেওয়া হতো। ৮ জুলাই থেকে অফলাইনে টিকিট দেওয়া শুরু হয়েছে। গ্যালারির নিদর্শন এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা দিই আমরা।

আহসান মঞ্জিলে প্রবেশের টিকিট অনলাইনে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত পাওয়া যায়। এছাড়া শুক্রবারে বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭.৩০টা পর্যন্ত টিকেট পাওয়া যায়। প্রবেশ ফি ২০ টাকা। 

১৮৭২ সালে নবাব আবদুল গনি তার ছেলে খাজা আহসানউল্লাহর নামে বাসভবনের নামকরণ করেন আহসান মঞ্জিল। এটি একটি দোতলা ভবন। বারান্দা ও মেঝে মার্বেল পাথরে তৈরি। প্রতিটি কক্ষের আকৃতি অষ্টকোণ। প্রাসাদের ভেতরটা দুই ভাগে বিভক্ত। পূর্বদিকে বড় খাবার ঘর। উত্তরদিকে লাইব্রেরি। পশ্চিমে জলসাঘর। পুরো ভবনের ছাদ কাঠের তৈরি। নিচতলায় খেলার ঘরে রয়েছে বিলিয়ার্ড খেলার জন্য আলাদা জায়গা। দরবার হলটি সাদা, সবুজ ও হলুদ পাথরের তৈরি। 

ছাড়া দোতলায় রয়েছে বৈঠকখানা, গ্রন্থাগার আর তিনটি মেহমান কক্ষ। পশ্চিম দিকে আছে নাচঘর আর কয়েকটি আবাসিক কক্ষ। আহসান মঞ্জিলের তথ্যকর্মীর কাছ থেকে জানা যায়, আহসান মঞ্জিলের ৩১টি কক্ষের মধ্যে ২৩টি কক্ষ বিভিন্ন প্রদর্শনীর জন্য। 

নয়টি কক্ষ লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি থেকে প্রাপ্ত ফ্রিৎজকাপ কর্তৃক ১৯০৪ সালে তোলা ছবির সঙ্গে মিলিয়ে সাজানো হয়েছে। তৈজসপত্র এবং নওয়াব এস্টেটের পুরোনো অফিস এডওয়ার্ড হাউস থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন নিদর্শন সংরক্ষণ করে প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে। এতে সংগৃহীত নিদর্শন সংখ্যা চার হাজার সাতটি।

১৮৮৮ সালে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে ও ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ভবনটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আহসান মঞ্জিলই ঢাকার প্রথম ইট-পাথরের তৈরি স্থাপত্য। যেখানে প্রথম বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা হয় নবাবদের হাতে। মঞ্জিলের স্থাপত্যশৈলী পশ্চিমাদের সব সময়ই আকৃষ্ট করত। লর্ড কার্জন ঢাকায় এলে এখানেই থাকতেন। বাংলাদেশ সরকার আহসান মঞ্জিলকে জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করে। ১৯৯২ সালে এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

আইবি/আরএইচ