ছয় ঋতুর বাংলাদেশে এখন দুই ঋতু বিরাজ করছে। মার্চ থেকে গ্রীষ্মকালীন গরম শুরু হয়ে অব্যাহত থাকে অক্টোবর পর্যন্ত। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের কারণে ব্যাপকভাবে কমেছে বৃষ্টিপাত। চলতি বছর দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়নি। আগামীতেও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। হালকা বৃষ্টিপাত ও ভ্যাপসা গরম ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য সহায়ক। তাই বছরের শেষ দিকে এসেও ডেঙ্গুর প্রকোপ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। যা আগামীতে আরও বাড়ার আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে যে পরিমাণ বৃষ্টি হচ্ছে তাতে মশার উপদ্রব বাড়বে। কারণ, হালকা বৃষ্টিতে যেখানে-সেখানে পানি জমে মশার জন্ম হচ্ছে। এটাই ধীরে ধীরে ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে। আগামী ১১ অক্টোবর পর্যন্ত দেশব্যাপী ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। তবে, রাজধানীতে বৃষ্টির পরিমাণ খুব বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যা এডিস মশার প্রজননস্থল বাড়ার পাশাপাশি ডেঙ্গু জ্বর বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। এ অবস্থায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনকে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।

বর্তমানে যে পরিমাণ বৃষ্টি হচ্ছে তাতে মশার উপদ্রব বাড়বে। কারণ, হালকা বৃষ্টিতে যেখানে-সেখানে পানি জমে মশার জন্ম হচ্ছে। এটাই ধীরে ধীরে ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে। আগামী ১১ অক্টোবর পর্যন্ত দেশব্যাপী ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। তবে, রাজধানীতে বৃষ্টির পরিমাণ খুব বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যা এডিস মশার প্রজননস্থল বাড়ার পাশাপাশি ডেঙ্গু জ্বর বাড়াতে সহায়তা করতে পারে

প্রয়োজনে স্কুল-কলেজ এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যদের কাজে লাগাতে হবে। এতে জনমনে সচেতনতার পাশাপাশি মশার লার্ভাও ধ্বংস করা সম্ভব হবে— বলছেন তারা।
 
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল (৭ অক্টোবর) পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৯ হাজার ৫২৩ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১৭ হাজার ১৭৭ জন। গত ৬ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এটি এ বছরে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. মনোয়ার হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ধারাবাহিক বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে ডেঙ্গু বাড়বে কি না। বৃষ্টির পানি জমে থাকলে এডিস মশার জন্ম হয়। যখন বৃষ্টি বাড়ে তখন ডেঙ্গু হয় না। বৃষ্টি কমার দুই-চারদিন পার হওয়ার পর জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশ বিস্তার ঘটে।

বৃষ্টি বেশি হলে ডেঙ্গু মশার লার্ভা ধ্বংস হয় কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা নির্ভর করে কী পরিমাণ বৃষ্টি হচ্ছে তার ওপর। ভারী বৃষ্টি হলে মশা মারা যায়, তবে লার্ভা মারা যায় না। বৃষ্টির পরে লার্ভাগুলো স্থির থাকার সুযোগ পেলে আবারও সেখান থেকে মশার জন্ম হয়। স্থিরভাবে থাকলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই লার্ভা থেকে মশার জন্ম হয়। ফলে দ্রুত সময়ে মশার উপদ্রব বাড়ে।

‘আগামী ১১ অক্টোবর থেকে সারাদেশে বৃষ্টির প্রবণতা বাড়বে। তবে এ বৃষ্টিতে ডেঙ্গুসহ অন্য মশার উপদ্রব কমার সম্ভাবনা নেই। কারণ, সারাদেশে বৃষ্টি শুরু হলেও রাজধানীতে বৃষ্টির পরিমাণ অনেক কম হবে। ঢাকা বিভাগে সেভাবে ভারী বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। হালকা বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টির পরিমাণ কম হলে এডিসসহ অন্য মশার উপদ্রব বাড়ে। বেশি হলে সবকিছু ধুয়ে চলে যায়। সেক্ষেত্রে মশা বাড়ার সম্ভাবনা কম থাকে।’ 

আবহাওয়াবিদ ড. মো. আবদুল মান্নান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আগামী ১১ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় ঢাকায় বৃষ্টি কম হবে। রাজধানীতে যদি বৃষ্টি বেশি হয় তাহলে ডেঙ্গুর লার্ভা ভেসে যাবে। যখনই অল্প বৃষ্টি হয়, তখন সাময়িকভাবে সেখানে ওয়াটার লগিং হয়। তখনই সেখান থেকে লার্ভার জন্ম হয় এবং পরবর্তীতে ডেঙ্গুর মতো মশা তৈরি হয়। চলতি বছর আবহাওয়ায় বৈরীভাবের কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিয়েছে।

‘এ বছর ঢাকায় ভারী বর্ষণ আমরা পাইনি বললেই চলে। এ পরিস্থিতির কারণে এডিস মশার লার্ভাগুলো জন্মানোর সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া আমাদের ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমেও সরাসরি পানি প্রবাহিত হয় না। পানি জমে থাকলে সেখান থেকে ডেঙ্গু মশার জন্ম হয়। আমাদের বর্তমান আবহাওয়া ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সবুর খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঢাকায় ডেঙ্গু বাড়ার বিষয়টি পুরোপুরি আবহাওয়া সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। ঢাকায় যে হারে কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে তাতে ডেঙ্গু বাড়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। কনস্ট্রাকশন কাজ যেখানে শুরু হয়, সেখানে কর্তৃপক্ষ জায়গাটি ঘিরে ফেলে। ঘিরে ফেললে ভেতরে কী হচ্ছে সেটা দেখা যায় না। মূলত সেখান থেকেই মশার জন্ম হয়। ঢাকার সঙ্গে ডেঙ্গুর সম্পর্ক হচ্ছে চলমান নির্মাণের গল্প। 

আগামী দিনে ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করার দুটি বিষয় আছে। একটি হচ্ছে ডেঙ্গু রোগী যত বেশি হবে, এর প্রকোপও তত ভয়াবহ হবে। কারণ, একটি মশা যদি ডেঙ্গু রোগীকে কামড় দিয়ে একজন সুস্থ মানুষকে কামড় দেয় তাহলে তারও ডেঙ্গু হবে। অসুখটা কমাতে হলে দুটি কাজ করতে হবে। ডেঙ্গু রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা করে মশারির ভেতর রাখতে হবে। অন্যদিকে, মশানিধন করতে হবে। রাজধানীর মশানিধনে সিটি কর্পোরেশনকে আইন করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে সব ক্ষমতা সিটি কর্পোরেশনের।’ 

সিটি কর্পোরেশনগুলো মশা নিয়ন্ত্রণে কতটুকু সফল— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা সবাই জানি ডেঙ্গু মশা সকালে কামড়ায়, সন্ধ্যায় নয়। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনগুলো মশার ওষুধ ছিটায় সন্ধ্যায়। ওষুধ দেওয়ার সময়টা পরিবর্তন করা গেলে ভালো কাজ হতো। সিটি কর্পোরেশনগুলো মশা নিয়ন্ত্রণে যে কাজগুলো করছে সেগুলো কোনোটাই বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত নয়। লোক দেখানো আর টাকা কামানোর ধান্দা। মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি কর্পোরেশনগুলো যদি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সহায়তা নিতো তাহলে ১৫ দিনেই মশা অনেকটা কমে যেত। এটা না পারার কোনো কারণ নেই।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের ফোর কাস্টিং মডেলে দেখেছি, আগামী ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু কমার সম্ভাবনা নেই। ২০ অক্টোবরের পরে হয়তো ডেঙ্গুর প্রবণতা কমে আসতে পারে। তবে, ডেঙ্গু নিধনে যদি কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় তাহলে উপদ্রব কমানো সম্ভব। 

‘২০ অক্টোবরের পর ডেঙ্গুর প্রবণতা কমবে কি না— সেটা এখনই শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে ২০ তারিখ পর্যন্ত যে কমবে না সেটা বলতে পারছি। কারণ, ২০ তারিখের পর বৃষ্টি থেমে যাওয়ার কথা। যদি থেমে না যায় তাহলে ডেঙ্গুর প্রবণতা বাড়বে। যদি বৃষ্টি থেমে যায় তাহলে এটাও কমে যাবে।’ 

এ মুহূর্তে সিটি কর্পোরেশনগুলোর হটস্পট ম্যানেজমেন্ট করা উচিত। অনেক জায়গায় ডেঙ্গুর হটস্পট আছে, সেসব জায়গায় ক্রাশ প্রোগ্রাম করে উড়ন্ত মশা মেরে দিতে হবে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে মানুষকে আরও সচেতন করতে হবে। এছাড়া এ বিষয়ে যারা গবেষণা বা কাজ করেন তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারে সিটি কর্পোরেশনগুলো। তাদের সঙ্গে রাখলে এ কাজে সফল হওয়া যাবে— মত দেন এ কীটতত্ত্ববিদ।

এসআর/এসকেডি/এমএআর/