আত্মীয়ের মাধ্যমে প্রথম পরিচয়। এরপর ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ। নিজেকে বিধবা, অসহায় দাবি করে প্রবাসী বাংলাদেশী ব্যবসায়ী কামরুল হাসানের কাছে আর্থিক সহযোগিতা চান মডেল ও অভিনেত্রী রোমানা ইসলাম স্বর্ণা। বিভিন্ন অজুহাতে টাকাও নেন। দেশে ফেরার পর বাসায় ডেকে ফাঁদে ফেলে অর্ধউলঙ্গ করে ছবি তুলে ওই ব্যবসায়ীকে ব্লাকমেইল করেন, সম্মানহানি ও মামলার ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক বিয়ে করেন স্বর্ণা।

এখানেই শেষ নয়, মডেল অভিনেত্রী স্বর্ণা পরে আবার ওই ব্যবসায়ীকে তালাক দেন। সিটি করপোরেশন বলছে, স্বর্ণার ওই তালাকনামা জাল। তার এসব প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য অর্থ আত্মসাৎ।

ভুক্তভোগীর দাবি, পরিচয় থেকে তালাক পর্যন্ত নগদ টাকা, বাড়ি-গাড়িসহ প্রায় দেড় কোটি টাকার সম্পদ হাতিয়ে নিয়েছেন অভিনেত্রী স্বর্ণা। আর এসব অপকর্মে তাকে সহযোগিতা করেন মা আশরাফি ইসলাম শেইলি (৬০), নিজের ছেলে আন্নাফি (২০) ও ফারহা আহমেদসহ অজ্ঞাত যুবক। এসব অভিযোগ তুলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন ওই প্রবাসী ব্যবসায়ী।

ওই মামলায় বৃহস্পতিবার (১১ মার্চ) সন্ধ্যায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়া এলাকা থেকে মা আশরাফি ইসলাম শেইলি ও ছেলে আন্নাফিসহ স্বর্ণাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

পুলিশ বলছে, আগেও বিয়ের ফাঁদ পেতে প্রতারণা করেছে স্বর্ণা। তিনি প্রথম স্বামীকে তালাক দেন ২০১৭ সালে। এরপর এক উকিলকে বিয়ে করেন। পরে তাকেও তালাক দেন।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী কামরুল হাসানের (৪৫) বাড়ি মাদারীপুরে। থাকেন ঢাকার পল্লবীতে। ২০০৫ সালে সৌদি আরবে ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে মক্কায় রাবিয়াহ আল-মদিনা ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও ফ্রুটস ইমপোর্ট ও কন্সট্রাকশন প্রতিষ্ঠান কে এম জুয়েল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান তিনি।

রোমানা ইসলাম স্বর্ণা

খালাতো ভাইয়ের মাধ্যমে প্রথমে স্বর্ণার সঙ্গে পরিচয়

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে খালাতো ভাই মাহমুদুল হাসান নীড়ের মাধ্যমে ধানমন্ডিতে স্বর্ণার সঙ্গে পরিচয়। স্বর্ণা বিধবা ও এক ছেলের মা দাবি করে চলচ্চিত্র ও নাট্য অভিনেত্রী এবং উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় নিজের দেন। তিনি ফেসবুক আইডি দিয়ে প্রবাসী ওই ব্যবসায়ীকে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে অনুরোধ করেন। ২০১৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবে ফেরেন ওই ব্যবসায়ী। অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে স্বর্ণাকে ফেসবুকে রিকোয়েস্ট দিয়ে ফ্রেন্ড লিস্টে যুক্ত হন তিনি। এরপর শুরু চ্যাটিং। প্রায়ই ম্যাসেঞ্জারে ফোন করে সিনেমা জগতে খারাপ অবস্থা চলছে বলে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন স্বর্ণা। ওই ব্যবসায়ী তাকে এড়িয়ে চলা শুরু করলে হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে কল করতে থাকেন। এভাবে চলতে থাকে তাদের যোগাযোগ।

উবার ব্যবসার নামে সাড়ে ২২ লাখ টাকা ধার নেন স্বর্ণা

উবারে গাড়ির ব্যবসা করবে বলে টাকা ধার দিতে প্রবাসী ব্যবসায়ীকে অনুরোধ করেন স্বর্ণা। অনেকটা অতিষ্ঠ হয়ে পরিশোধের প্রতিশ্রুতিতে ২০১৮ সালের ৫ ও ৬ নভেম্বর এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকে আড়াই লাখ টাকা, ইউসিবি ব্যাংকে ধানমন্ডি শাখার অ্যাকাউন্টে ৮ লাখ এবং ৮ নভেম্বর প্রবাসী বন্ধুর ডেমরাস্থ স্ত্রীর কাছ থেকে ১২ লাখসহ মোট সাড়ে ২২ লাখ টাকা ধার দেন ওই প্রবাসী।

ফ্ল্যাট কিনতে হাতিয়ে নেয় ৬৬ লাখ টাকা

২০১৮ সালের নভেম্বরে স্বর্ণা আবার হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে ওই ব্যবসায়ীকে জানায়, লালমাটিয়ার সি-ব্লকে অবস্থিত একটি আকর্ষণীয় ফ্ল্যাট বিক্রি হচ্ছে। ফ্ল্যাটের মালিক তার পরিচিত। সে (স্বর্ণা) চাইলে মালিক আর অন্য কারও কাছে বিক্রি করবে না। কিন্তু তার হাতে টাকা নেই। প্রবাসী কামরুলের নামেই ফ্ল্যাটটি কেনার জন্য স্বর্ণা এক কোটি টাকা চায়। পরে ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে তাকে (স্বর্ণা) কিছু লভ্যাংশ দিলেই হবে বলে জানায়। ফ্ল্যাটটি কেনার জন্য কয়েক দফায় বিভিন্ন মাধ্যমে মোট ৬৬ লাখ টাকা স্বর্ণাকে দেন ওই ব্যবসায়ী।

রোমানা ইসলাম স্বর্ণা

ফ্ল্যাট-গাড়ি দেখাতে ডেকে বিয়ের ফাঁদ

ওই ব্যবসায়ী এজাহারে লেখেন, ২০১৯ সালের ১৩ মার্চে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরলে রোমানা ইসলাম স্বর্ণা আমার টাকায় কেনা উবারে ভাড়ায় চালিত প্রাইভেট কার ও ফ্ল্যাট দেখার জন্য লালমাটিয়ার বাসায় যেতে অনুরোধ করে। ১৪ মার্চ সন্ধ্যায় ব্যক্তিগত গাড়িতে স্বর্ণার ফ্ল্যাটে যাই। সেখানে ফলমূলসহ নাস্তা খেতে দেওয়া হয়। সেসব খেয়ে মাথা ঝিমঝিম করে। বিছানায় নিয়ে স্বর্ণা আমাকে অর্ধউলঙ্গ করে নিজেও অর্ধনগ্ন হয়ে ছবি তুলে ব্লাকমেইল করে বিয়ের চাপ দেয়। না হলে ওই সব ছবি পাঠিয়ে ও ধর্ষণ মামলা দিয়ে মান-সম্মান নষ্ট করবে বলে হুমকি দেয়।

ক্রমাগত হুমকি ও সম্মানের ভয়ে ওই বছরের ২০ মার্চ রেজিস্ট্রির মাধ্যমে বিধবা স্বর্ণাকে বিয়ে করেন কামরুল। দেনমোহর বাবদ নগদ ১০ লাখ টাকা ও ৩৩ ভরি স্বর্ণ দিতে বাধ্য হন তিনি। এরপর বিভিন্ন অজুহাতে চার লাখ টাকা মূল্যের হাতঘড়ি, দেড় লাখ টাকার দুইটি আইফোন আদায় করে স্বর্ণা।

পরে ৪ এপ্রিল সৌদি আরবে চলে যান কামরুল। ৪-৫ মাস পর দেশে ফিরে দেখা করতে চাইলে স্বর্ণা খারাপ আচরণ করতে থাকেন। আচরণ সন্দেহজনক মনে হওয়ায় ফ্ল্যাট এবং গাড়ি বুঝিয়ে দিতে বলেন ওই ব্যবসায়ী। তখন তিনি (স্বর্ণা) বাড়ি-গাড়ি বুঝিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

মা-ছেলেসহ গ্রেফতার রোমানা ইসলাম স্বর্ণা

নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার ফেরত পেতে গত বছরের ৬ জানুয়ারি আদালতে মামলা করেন ওই ব্যবসায়ী। ওই মামলায় আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে গাড়ি ও ফ্ল্যাট কেনা বাবদ নেওয়া সব টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি অন্যায় আচরণ না করার শর্তে জামিন নেন স্বর্ণা। এরপর তিনি ভালো আচরণ করে আবারও ১২ লাখ টাকা নিয়ে টয়োটা গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৮-৬৭০৫) কিনে নেন। এর মাঝে নগদ ১০ লক্ষাধিক টাকাসহ নানা কৌশলে হাতিয়ে নেন আরও স্বর্ণালংকার।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে স্বর্ণা আবারও ওই প্রবাসীকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। ফোন দিলে গালিগালাজ করেন। ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে লালমাটিয়ার বাসায় গিয়ে স্বর্ণার সন্ধান না পেয়ে ওই প্রবাসী মোহাম্মদপুর থানায় গিয়ে স্ত্রী নিখোঁজ জানিয়ে পুলিশের সহযোগিতা চান।

রাত পৌনে ৩টায় স্বর্ণা বাসায় ফেরেন। পুলিশ তখন তার ফ্ল্যাটে গেলে তিনি (স্বর্ণা) দরজা না খুলে মোবাইলে জানায় তাকে (প্রবাসী কামরুল) তালাক দিয়েছেন। এজন্য তিনি মোবাইলে তালাকনামার কপিও পাঠান।

তেজগাঁও পুলিশের ডিসির কার্যালয়ে প্রতারণার বিস্তারিত তুলে ধরে ওই প্রবাসী ব্যবসায়ী বলেন, আমি তালাকের কপিটি যাচাইয়ের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) অফিসে আবেদন করলে আমাকে জানানো হয় এটা ভুয়া তালাকনামা। এর কোনো সত্যতা নেই। তালাকের নোটিশটিও জাল।

কামরুল বলেন, তার পুরো পরিবার একটি প্রতারক চক্র। আমাকে প্রথমে ফুসলিয়ে পরে ফাঁদে ফেলে জিম্মি করে। জোরপূর্বক বিয়ে করে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও বিভিন্ন মালামালসহ ১ কোটি ৪৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছে স্বর্ণা ও তার পরিবার।

মা-ছেলেসহ গ্রেফতার রোমানা ইসলাম স্বর্ণা

তিনি বলেন, আমি একজন সৌদি প্রবাসী ব্যবসায়ী। আমি আজ প্রায় ২০ বছর যাবত প্রবাস যাপনে সরকারকে নিয়মিত রেমিট্যান্স দিয়ে আসছি। তারা (স্বর্ণা ও তার পরিবার) যোগসাজশ করে আমার কষ্টার্জিত টাকা আত্মসাৎ করেছে। আমাকে পথে বসিয়েছে। আমি তাদের প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

পাঁচ দিনের রিমান্ড চাইবে পুলিশ

বৃহস্পতিবার (১১ মার্চ) রাতে সংবাদ সম্মেলন করে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশিদ বলেন, ভুক্তভোগী যেসব অভিযোগ তুলে মামলা করেছেন, আমরা এর অনেক তথ্যের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছি। তারপরই মা-ছেলেসহ স্বর্ণাকে গ্রেফতার করি।

স্বর্ণার বিরুদ্ধে আগেও প্রতারণা ও ব্লাকমেইল করে দুটি বিয়ের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে একজন আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছেন। প্রতারণার ব্যাপারে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। সেজন্য গ্রেফতারদের শুক্রবার (১২ মার্চ) দুপুরে তাদের আদালতে সোপর্দ করে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হবে।

জেইউ/এসএসএইচ