প্রতিদিন অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির আগুন থেকে বাদ যাচ্ছে না চাল, ডাল, আটা, চিনি থেকে শুরু করে সবজি বাজারও। যার প্রভাব পড়েছে ইফতার বাজারেও।

এবারের রমজানে দাম বেড়েছে সকল ইফতার সামগ্রীর। এ অবস্থায় ক্রেতাদের অসহায় আত্মসমর্পণ ছাড়া অন্য কোন উপায়ও নেই। দফায় দফায় দাম বাড়লেও বাজার মনিটরিংয়ের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। একইসঙ্গে বিক্রেতাদের সিন্ডিকেটও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় অনেকের ইচ্ছা থাকলেও চাহিদা মাফিক পণ্য কিনতে পারছেন না। তবে বিক্রেতারা বলছেন- অনেকেই আসছেন, দেখছেন, দাম জিজ্ঞাসা করছেন কিন্তু না কিনেই ঘুরে যাচ্ছেন।

আরও পড়ুন- রমজানের প্রথম দিনেই জমজমাট ‘চকের ইফতার বাজার’

রাজধানীর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চকবাজারের ইফতার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত বছর জব্বার মিয়ার স্পেশাল দই বড়া প্রতি ৪ পিস বিক্রি হয়েছে ১২০ টাকায় এবং প্রতি ৮ পিস বিক্রি হয়েছে ২৪০ টাকায়। কিন্তু এ বছর সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১৫০ টাকা এবং ৩০০ টাকায়। তবে স্থান এবং মানভেদে প্রতি চার পিস ১০০ টাকা ৮ পিস ২০০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

রমজানের আরেক বিশেষ আইটেম শাহী শরবত গত বছর প্রতি লিটার ২৫০ টাকায় বিক্রি হলেও এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০০ টাকায়। এছাড়া গত বছর যে লাবাং ১২০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে এ বছর তা ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের ১১০ টাকা লিটার দরের বোরহানি এ বছর ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ২০ টাকার ফিরনি এবং জর্দা বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়।

২২০ টাকার মুরগির ঝাল ফ্রাই বিক্রি হচ্ছে ৩২০ টাকায়, ২৫০ টাকার কবুতর ভুনা বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকায়, ৬০ টাকার টেংরি কাবাব বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, ১১০ টাকার তন্দুরি কাবাব বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়, ৮০০ টাকা কেজির সুতি কাবাব বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকায়, ১২০ টাকার হাফ গরু এবং মুরগির আচার ১৫০ টাকায়, ৬০ টাকার শাহী পরাটা ৮০ টাকায়, ৪০ টাকার নরমাল পরাটা ৬০ টাকায়, ৮০ টাকা লিটারের খোলা মাঠা ১০০ টাকা, ১৫০ টাকা মূল্যমানের ফালুদা (বড় বাটি) ২০০ টাকায়, ৮০ টাকার মাঝারি বাটি ১০০ টাকায়, ৪০ টাকার দুধ নান ৬০ টাকায়, ২০০ টাকা কেজি দরের জিলাপি ২৪০ টাকা, আড়াই হাজার টাকার ভুনা রাজ হাঁস ৩ হাজার টাকা, ১ হাজার টাকার চিনা হাঁস ১২ শ টাকা, ৮০০ টাকার ভুনা পাতি হাস ১ হাজার টাকা এবং ১০ টাকার টিক্কা বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকায়।

আরও পড়ুন- তারাবি-সেহরিতে যেভাবে রমজানকে স্বাগত জানাল মুসলিম বিশ্ব

গত বছর ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। তবে এ বছর তা ২০০ টাকা বেড়ে কেজি প্রতি ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

চকবাজারের শাহী পরাটা বিক্রেতা মো রুবেল মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রথম রোজায় বিক্রি একটু বেশি হয়েছে তবে সামনে এই বিক্রি কমে আসবে। যেটুকু বিক্রি হয়েছে সেটাও খুব একটা ভালো না। মানুষ প্রথম দিকে কষ্ট করে হলেও ইফতার কিনছে কিন্তু এভাবে তো প্রতিদিন কিনবে না। পেঁয়াজ, আটা, তেলসহ সবকিছুর দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে আমরাও দাম না বাড়িয়ে পারছি না। সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় আমরাও অপারগ।

লাবাং বিক্রেতা হাবিবুর রহমান বলেন, ক্রেতা আসছে, দেখছে, দাম জিজ্ঞাসা করছে কিন্তু কিনছে কম। যেভাবে দাম বেড়েছে তাতে অনেকেই চাহিদা অনুযায়ী কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন।  গত বছর যেভাবে বিক্রি হয়েছে এবছর তার চেয়ে অনেক কম বিক্রি হবে। মানুষের হাতে টাকা নাই; টাকা না থাকলে কিনবেন কীভাবে?

আরও পড়ুন- অলিগলির ইফতারে স্বস্তি

রাজধানীর বংশাল থেকে ইফতার কিনতে আসা মোহাম্মাদ রাইয়ান নামের এক ক্রেতা ঢাকা পোস্টকে বলেন, পুরান ঢাকার এই ইফতার বাজার বিখ্যাত। প্রতি বছর রমজানে আমাদের বাসার ইফতার চক বাজার থেকেই কেনা হয়। এ বছরও কিনতে এসেছি। যেভাবে সবকিছুর দাম বাড়ানো হয়েছে তাতে চাহিদামাফিক সবকিছু কিনতে পারছি না। কয়েকটি আইটেম কিনেই বাজেট শেষ হয়ে গেছে। প্রতিদিন যেহেতু ইফতার সামগ্রী কিনতে হয় সেহেতু এমন চড়া দামে আমাদের বেশ বিপাকে পড়তে হচ্ছে।

মতিঝিল থেকে ইফতার সামগ্রী কিনতে আসা ফয়সাল আহমেদ নামে এক ক্রেতা বলেন, আমরা বন্ধুরা কয়েকজন মিলে মেসে থাকি। সবাই মিলে একদিন ইফতার করবো বলেই এখানে সবকিছু কিনতে এসেছি। কিন্তু সবকিছুর দাম দেখে মনে হচ্ছে এখানে আসাটাই ভুল হয়েছে। অনেক কিছুর পরিকল্পনা থাকলেও অল্পকিছু কিনেই মেসে ফিরতে হবে।

কেরানীগঞ্জ থেকে ইফতার সামগ্রী কিনতে আসা জুনাইদ বলেন, আমি কেরানীগঞ্জ থেকে ইফতার সামগ্রী কিনতে এসেছি। কিন্তু প্রতিটি আইটেম দাম অতিরিক্ত। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক খাবার কিনতে পারছি না। যেভাবে সবকিছুর দাম বাড়ছে তাতে সামনে আরও সমস্যা হতে পারে। ১০০০ টাকা নিয়ে বাজারে এসেও তেমন কিছুই কিনতে পারিনি। 

ইফতার সামগ্রী কিনতে আসা ব্যবসায়ী শরীফ বলেন, আমার পরিবারে মা-বাবা ও ভাই-বোনসহ সবাই ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ খাবারটি পছন্দ করেন। পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে ইফতার করার সময় এই খাবারটি রাখতেই হয়। গত বছর ৬০০ টাকা দিয়ে কিনলেও এ বছর দাম বেশি নিচ্ছে।

এমএম/এমজে