রোগী বাঁচাতে ডাক্তারদের কী পরিমাণ ধৈয্য আর কৌশল অবলম্বন করতে হয় তারই চিত্র ফুটে এসেছে এক চিকিৎসকের ফেসবুক স্ট্যাটাসে। বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (এসজেডএমসিএইচ) গাইনি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন এক রোগীর জীবন বাঁচানোর নিরন্তর চেষ্টায় সফল হওয়ার গল্প তুলে ধরেছেন এসজেডএমসিএইচের চিকিৎসক সায়েম চৌধুরী।

ফেসবুক স্ট্যাটাসটি ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়ে গেছে। স্ট্যাটাসটিতে ৬ হাজারের বেশি মানুষ রিয়েক্ট দিয়েছেন। কমেন্ট সাড়ে পাঁচশর বেশি আর ১১শর বেশি শেয়ার হয়েছে। ঢাকা পোস্টের পাঠকদের জন্য সেই ফেসবুক স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

‍‘রাখে আল্লাহ!! মারে কে?

এই কথাটার মর্ম গতকাল রাতে আবার বুঝতে পারলাম, নতুন করে। আমাদের গাইনি ইউনিট-১ এ এক রোগী এলো ৫ মাসের গর্ভবতী, রক্ত এবং পানি ভাঙা নিয়ে। এছাড়া ওনারা আর কোনো হিস্টোরি দেননি। আমরা আমাদের মতো থ্রেটেন্ড অ্যাবরশন চিন্তা করে ট্রিটমেন্ট চালু করি। পরের দিকে দেখি পেশেন্ট শকে যাচ্ছে!! তার মানে কোথাও ইন্টারনাল ব্লিডিং হচ্ছে!? ইউএসজি (USG) রিপোর্ট আসলে দেখি, আইইউডি (IUD) সাথে রাপচার্ড ইউটেরাস!! পেশেন্ট পার্টিকে আবার ধরা হলো। এবার জানা গেলো এক নতুন কাহিনী!!

তাদের ভাষ্যমতে:

তারা কোনো এক কোয়াকের কাছে ৫ মাসের বাচ্চা নষ্ট করতে গিয়েছিলেন। কোয়াক কী একটা জিনিস ঢুকালো, তারপর থেকে রোগীর এই অবস্থা। পরে কন্ট্রোল করতে না পেরে রোগীকে তারা হাসপাতালে নিয়ে আসলেন।
রাত তখন ১০টা।

বুঝতে পারলাম যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে, রাপচার্ড ইউটেরাস!! তা না হলে রোগী বাঁচবে না!! কিন্তু ভেতরের ঘটনা ছিল আরও ভয়াবহ!! অ্যানি আপু অর্ডার দিয়ে ওটি রেডি কর। ব্লাড ডিমান্ড দাও। অ্যানেসথেসিয়াতে দেখি ইকবাল স্যার। সাথে সাথে ছুটে আসলো আরবী আপু, সিফাতি আপু এবং ইউনিট-২ থেকে সুরভী আপু। আমরা উভয় ইউনিটের চিকিৎসকেরা তখন একসাথে, এক টেবিলে।

ওপেন করার পর দেখা গেল, শুধু রক্ত!! রক্ত আর রক্ত!! ইন্টারনাল ইলিয়াক আর্টারির ব্রাঞ্চগুলো সব লেসেরেটেড!!
এরকম কেমনে হলো? পরে বোঝা গেলো, ওই কোয়াক যখন বাচ্চা নষ্ট করার জন্য ডি অ্যান্ড সি (D&C) করেছিল, তখন কিউরেট, ইউটেরাস ফুটো করে ভেতরে ঢুকে গিয়ে এই বাজে অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। এতগুলো ব্রাঞ্চ ছেড়া ও প্রচুর রক্তপাতের কারণে কিছু ঠিক মতো দেখাই যাচ্ছে না। কোনো মতেই রিপেয়ার করা সম্ভব হচ্ছে না। ছুটে এসে ওটিতে উপস্থিত হলেন নফসি আপু। এদিকে প্রচুর রক্তপাতে রোগী পুরো ঝুঁকিপূ্র্ণ। বিপি পাওয়া যাচ্ছে না, পালস হলো ২০০। ব্লাড পাওয়া যাচ্ছে না। সন্ধানীতে ব্লাড দিলো আমাদেরই দুইজন জুনিয়র। একে একে ১৪ ব্যাগ ব্লাড দেওয়া হলো। সর্বমোট ৫টা চ্যানেল ওপেন করা হলো শরীরে। যখন রোগীর এরকম যায় যায় অবস্থা, তখন সবাই হতাশ হয়ে পড়লো। ইকবাল স্যার তার সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছিল। এবার ছুটে আসলেন মাহবুব স্যার। এসে বললেন, আল্লাহ ভরসা! হাল ছাড়ব না। যতক্ষণ পর্যন্ত মনিটর বিপ বিপ শব্দ করছে তার মানে রোগী বেঁচে আছে!! রোগী যুদ্ধ করছে, আমরা ও আমাদের সাধ্যমত চেস্টা করব। বিপি মেশিন খুলে নেওয়া হলো। আমরা সার্জনরা মনিটরের দিকে আর নজর দিব না। অ্যানেসথেসিয়া স্যারেরা সব দেখছেন।

ওদিকে রক্তপাত তখনও বন্ধ হয়নি। এ ধরনের রক্তপাত বন্ধ করার জন্য ভাস্কুলার সার্জন দরকার। বগুড়াতে তো ভাস্কুলার সার্জন নেই। সার্জন সিদ্ধান্ত নিলেন আরও ওপেন করবেন। ইন্টারনাল ইলিয়াক আর্টারি রিপেয়ার করবেন। কিন্তু সেটাতেও ব্যর্থ হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, এখন যদি কিছু না করা হয় রোগী এমনিতেও মরবে। উনি রোগীকে আরও ওপেন করে কমন ইলিয়াক আর্টারি রিপেয়ারের সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সফল হলেন! ৬ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধের পর আসতে আস্তে স্ট্যাবল হলো পেশেন্ট। আবার বিপি ঠিক ঠাক হলো। অতঃপর আইসিইউতে পাঠানো হলো রোগীটিকে।

**এত বড় ঘটনাটি শুধুমাত্র এইজন্যই শেয়ার করা, অপারেশন শেষে স্যার বলেছিলেন, যদি এই পুরো অপারেশনের কাহিনী ভিডিও করা যেত, তাহলে সাধারণ মানুষ বুঝতো কী পরিমাণ ডেডিকেশন আর ধৈর্যের সাথে ডাক্তারেরা যুদ্ধ করে!! ভিডিও তো করা সম্ভব হয়নি, কিন্তু আশা করি এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটু হলেও আন্দাজ করা যায়, এই পুরো টিমের কষ্ট ও পরিশ্রমের কাব্য। আমি আমার শজিমেকের শ্রদ্ধেয় স্যার, ম্যাডাম, সিনিয়র এবং জুনিয়রদের নিয়ে গর্বিত।’

বর্তমানে রোগী স্বাভাবিক আছেন বলে জানিয়েছেন ওই চিকিৎসক।

ওএফ