কাটআউট পদ্ধতিতে রাজধানীতে চলছে ইয়াবার কারবার। এক ইয়াবার ডিলার আরেকজনকে চেনেন না। ফুলের তোড়া বা প্যাকেটের আড়ালে মাজারে যাচ্ছে ইয়াবা। সেখান থেকে সাপ্লাই চেইন নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। নতুন করে ইয়াবা কারবার সহজ করতে গড়া হচ্ছে মাজার। সর্বশেষ ইয়াবার সঙ্গে আইসের চালানও এসেছে বিমানযোগে।

বৃহস্পতিবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজধানীর মাদক ব্যবসার অন্যতম হোতা মো. আব্দুল্লাহ মনির ওরফে পিচ্চি মনির ও তার সহযোগীকে হাজারীবাগ থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এ সময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় বিদেশি অস্ত্র, ইয়াবা ও নগদ অর্থ।

শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাব সদর দফতরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাতে র‌্যাব-২ এর একটি দল রাজধানীর হাজারীবাগ থানা এলাকার মধুবাজারের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান পরিচালনা করে মাদক ব্যবসার অন্যতম হোতা আব্দুল্লাহ মনির ওরফে পিচ্চি মনির (৩৩), ও তার সহযোগী মো. জুবায়ের হোসেনকে (৩৩) গ্রেপ্তার করে।

অভিযানে জব্দ করা হয় ২টি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগজিন, ১২ রাউন্ড তাজা গুলি, ১৮ হাজার ৭৭০ পিস ইয়াবা, ৬ গ্রাম আইস এবং মাদক বিক্রির নগদ ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার মনির মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার কথা স্বীকার করেছেন। 

ফলের ব্যবসা ছেড়ে ইয়াবা কারবারে পিচ্চি মনির

গ্রেপ্তার পিচ্চি মনিরের পরিবার জীবিকার সন্ধানে ১৯৯৫ সালে ঢাকায় এসে লালবাগ থানার শহীদনগর এলাকায় বসবাস শুরু করে। মনিরের বাবা চাতক শাহ জীবিকা নির্বাহের জন্য ফলের ব্যবসা শুরু করেন। মনির তাকে সহযোগিতা করতেন। এক সময় মনির এলাকার বখে যাওয়া ছেলেদের সঙ্গে চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধের মাধ্যমে জড়িয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে তিনি এলাকার বখাটেদের নিয়ে লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর ও কেরানীগঞ্জ থানা এলাকায় একটি অপরাধ চক্র গড়ে তোলেন। চক্রের হাত ধরে মাদক ব্যবসায় নামেন মনির।

টেকনাফ-কক্সবাজার থেকে ইয়াবা আনতেন পিচ্চি মনির

২০১২ সাল থেকে কামরাঙ্গীরচর এলাকায় মনির তার বন্ধুর সঙ্গে পার্টনারশিপে মাদক ব্যবসা শুরু করেন। প্রথমে স্থানীয় মাদক ডিলারদের কাছ থেকে অল্প অল্প করে মাদক কিনে খুচরা মাদকসেবীদের কাছে বিক্রি করতেন। ২০১৬ সাল থেকে নিজেই কক্সবাজারের ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ডিল করা শুরু করেন। গড়ে তোলে নিজস্ব মাদক নেটওয়ার্ক। এরপর টেকনাফ ও কক্সবাজার থেকে তার কাছে নিয়মিত ইয়াবা সরবরাহ করা হতো। মাঝে মধ্যে তিনি ও তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা ঢাকা থেকে কক্সবাজার গিয়ে মাদকের চালান নিয়ে আসতেন। মূলত তারা মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে টাকা লেনদেন করত। শতকরা ২০ শতাংশ হারে অ্যাডভান্স পেমেন্টের মাধ্যমে ইয়াবা ঢাকায় আসত।

ছদ্মবেশে ইয়াবার চালান পৌঁছে দিত মনিরের ডিলাররা

গ্রেপ্তার মনির জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাবকে জানিয়েছেন, প্রতিমাসে কয়েকটি চালান টেকনাফ, কক্সবাজার থেকে ঢাকায় নিয়ে আসতেন। রাজধানীর মিরপুর-১৩, ইসলামবাগ, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, কেরানীগঞ্জ, কামরাঙ্গীরচর, আজিমপুরসহ আরও বিভিন্ন এলাকায় খুচরা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদক সরবরাহ করতেন। প্রত্যেক খুচরা বিক্রেতার জন্য ভিন্ন ভিন্ন মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন তিনি। মনির ঢাকায় বিভিন্ন জায়গায় ভাড়াটিয়া ছদ্মবেশে মাদকের কারবার করতেন। কখনো ফুলের তোড়া বা প্যাকেটের আড়ালে মাজারে পৌঁছে দিতেন ইয়াবার চালান। সেখান থেকে ডিলাররা নিয়ে পৌঁছে দিত গন্তব্যে।

কাটআউট পদ্ধতিতে ইয়াবার কারবার, একে অপরকে চেনে না কারবারিরা

নিজের ও ইয়াবা ব্যবসার নিরাপত্তা নিশ্চিতের স্বার্থে খুচরা বিক্রেতা বা কারবারিদের পারস্পরিক পরিচয় নেই। শুধু তাই নয়, রাজধানীর মিরপুর-১৩, ইসলামবাগ, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, কেরানীগঞ্জ, কামরাঙ্গীরচর, আজিমপুরে তার ডিলার বা কারবারিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন আটটি মোবাইলফোন থেকে। ব্যবহার করেন ভিন্ন ভিন্ন সিম। যাতে ডিলারদের মধ্যে পরিচয় না হয়।

এক বাসায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন না মনির

২০২০ সালের ডিসেম্বরে মোহাম্মদপুর থানার হাতিরপুল এলাকার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া করা বাসা থেকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কাছে অস্ত্র ও ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন মনির। এরপর থেকে সাবধান হয়ে যান। এক একটি এলাকায় এক-দুই বছরের বেশি সময় অবস্থান করতেন না তিনি। 

ইয়াবা কারবারের উদ্দেশ্যে মাজার গড়ছেন মনির

কমান্ডার মঈন বলেন, গ্রেপ্তার মনির শরীয়তপুরে নিজ বাড়িতে কোটি টাকার স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। তিনি তার মৃত বাবার কৃতি সন্তান, এমনটিই জনসাধারণকে জানানো ও এলাকায় প্রচারের উদ্দেশ্যে মাদক ব্যবসার অবৈধ টাকা দিয়ে একটি মাজার নির্মাণ করছেন। তবে র‌্যাব জানতে পেরেছে, ওই মাজার গড়া হচ্ছে ইয়াবা কারবারের জন্য। মাজারের আড়ালে মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের হাব হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্য ছিল তার। 

ইয়াবার পাশাপাশি ২০১৮ সালে অস্ত্র কারবারে নামেন মনির

গ্রেপ্তার মনির ২০১৮ সাল থেকে অস্ত্র ব্যবসা শুরু করেন। তিনি ২০১৮ সালে অবৈধ পিস্তলসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন এবং ৭ মাস কারাভোগ করে। ২০২০ সালে তিনি আবারও অস্ত্র ও মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হন। এ সময় তিনি এক বছর কারাভোগ করেন। তার নামে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় অস্ত্র ও মাদক সংক্রান্ত ৩টি মামলা রয়েছে। 

সর্বশেষ ইয়াবা-আইসের চালান আসে বিমানে

কক্সবাজার থেকে সে বিভিন্ন উপায়ে ইয়াবা আনতেন মনির। কখনো কক্সবাজার-টেকনাফের কারবারিরা নিজেরাই ঢাকায় এসে ইয়াবা পৌঁছে দিতেন। তবে সর্বশেষ ইয়াবার চালান এসেছে বিমানযোগে। সেই ইয়াবা আনা হয় কার্বন পেপারে মুড়িয়ে। ২০০ পিস ইয়াবা একেকটি চালান প্যাকিং করে কারবারিদের মাধ্যমে রাজধানীর আটটি জোনে সরবরাহ করেন মনির। মাদক কারবারের অর্থ তিনি পাঠান বিকাশে, কখনো টেকনাফ থেকে আসা ব্যবসায়ীদের নগদে পেমেন্ট করতেন।

বিমানে কীভাবে আসছে ইয়াবা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা কক্সবাজার থেকে ইয়াবা নিয়ে আসা দুজনের এয়ার টিকিট পেয়েছি। যারা মনিরের কাছে ২০ হাজার পিসের ইয়াবার চালান ও ৫০ গ্রাম আইস পৌঁছে দিয়েছে। মনিরের বক্তব্যে উঠে এসেছে বিমানেই এসেছিল সেই চালান। 

জেইউ/এসকেডি