দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে চারপাশে তাকিয়ে, দেশের অস্থিতিশীল অবস্থা দেখে আমি এবং আমরা চিন্তিত। আমি মাঝে মাঝে নিজেকে বলি, আমি সৌভাগ্যবান যে আমি একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক। আমার জন্ম ফিলিস্তিনের গাজায় হলে যে কী হতো তা আমি স্বপ্নেই ভাবতে পারি না! কাজেই একজন নাগরিক হিসেবে আমি মুক্ত এবং গর্বিত বাংলাদেশি।

একজন সাধারণ জনগণ হিসেবে আমার বা আমাদের চাওয়া কী? খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সুযোগ পেয়ে বেঁচে ও টিকে থাকা। খাদ্যের দাম বাড়লে সংসার অস্থির হয়ে ওঠে। অন্তত পুষ্টিকর মাছ, মাংস, ডিম নিয়মিত খাবার একটা বাসনা তখন অতৃপ্ত হয়ে ওঠে!

বস্ত্রের কথা ভাবলে একটা বিষয় লক্ষ করি যে, ঢাকার মতো ঘিঞ্জি শহরে কত কত শপিং মল! অসহ্য রকমের কেনাকাটার চাপ! এমন কোনো তথ্য আছে যা নিশ্চিত করে যে, মানুষের ভাতের অভাব থাকলেও পোশাকের নেই? অন্য শহর বা গ্রামের চিত্র কেমন? বাসস্থানের খরচ বাড়ছেই!

বাড়ি ভাড়া পাওয়া ও দেওয়া কঠিন। এ দেশে বাড়ি করাও কঠিন। এপার্টমেন্টের মালিকানা তুলনামূলক সহজ হলেও কতজন কিনতে পারে বা এর সমস্যাগুলোর মোকাবিলাইবা কতজন করতে পারে? চাইলেই নিজের একটা বাসা বা ঘর তৈরি কি সম্ভব?

এতকিছুর মধ্যে শিক্ষার অবস্থাই সবচেয়ে সস্তা বলে মনে হচ্ছে। হ্যাঁ বিনামূল্যে বই এবং অল্প বেতনে পড়ার সুযোগ আছে কিন্তু মান? স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই মানের নিশ্চয়তা নেই সেখানে দেশ অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে শিক্ষা বা শেখার কোনো পরিবেশ কি আদৌ থাকে? আর চিকিৎসা?

...শেখার জন্য চাই চমৎকার পরিবেশ। হরতাল বা অস্থিরতা, কোনো কারণে স্কুল বন্ধ হওয়া শিশুদের মনের জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়।

দেশে এত ভালো ডাক্তার থাকা সত্ত্বেও কেবল আস্থার অভাবে সব দেশের বাইরে ছুটে যায়! আমি বিশ্বাস করি যোগ্য ডাক্তার আমাদের আছে কিন্তু আস্থা ও নিশ্চয়তা নেই। বিশ্বাসের অভাব আমাদের অন্য দেশের মুখাপেক্ষী হতে বাধ্য করছে।

কাজেই এখানে যদি প্রশ্ন করি, আমাদের দেশের প্রতিটি মানুষের মৌলিক চাহিদা কি পূরণ হচ্ছে? উত্তর যদি না হয় তাহলে সেটা কেন? কী কারণ আছে যার জন্য আমরা এগিয়ে যেতে পারছি না! আমাকে এ প্রশ্ন করা হলে আমি বলবো রাজনৈতিক অস্থিরতা একটা বড় কারণ।

আচ্ছা, আমাদের দেশ, দেশের মানুষ, দেশের সংস্কৃতির জন্য উপযুক্ত কোনো শাসক নেই? (আমি বিশ্বাস করি আছে কিন্তু সিস্টেমের গোঁড়ায় গলদ। কাজ করার জন্য ইতিবাচক পরিবেশ ‘মিসিং’। মিসিং সততা, আস্থা, দেশপ্রেমসহ মৌলিক কিছু মানবীয় গুণাবলী) কেউ নেই?

এ কেমন অদ্ভুত কথা যে, ‘যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ’! সিস্টেম কেন বারবার ফেইল করছে? আর এর প্রভাব পড়ছে দেশের মানুষদের মনে, মস্তিষ্কে, বেড়ে ওঠায়, শিক্ষায়, চেতনায়, দেশপ্রেমী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে, নিরাপত্তাসহ সবকিছুতে! আর এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হলো ছোট ছোট শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। কীভাবে?

প্রথমত, শেখার জন্য চাই চমৎকার পরিবেশ। হরতাল বা অস্থিরতা, কোনো কারণে স্কুল বন্ধ হওয়া শিশুদের মনের জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়। শিশুরা প্রতিদিন বের হতে চায়, খেলতে চায়, খেলার পরিবেশ চায় আর এর জন্য স্কুল, কলেজের চেয়ে চমৎকার স্থান আর কী হতে পারে? শিক্ষার্থী যেমনই হোক সমবয়সীদের সঙ্গ শিশুদের মনকে রাখে প্রফুল্ল।

আমি লক্ষ করে দেখেছি আমরা বাড়ির বড় মানুষেরাই শিশুদের মনকে নানাভাবে অস্থির করে রাখি। কারণ নিজেরাই অস্থির থাকি জীবিকা ও নিরাপত্তা নিয়ে! আমাদের দেশে মৃত্যুর ধরনগুলো অদ্ভুত।

রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় মাথার উপরে যখন তখন কিছু টুপ করে পড়ে মানুষ মরে যেতে পারে! ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, হত্যা, চাকরি চলে যাওয়ার ভয় এগুলো কি কোনোভাবে জীবনের নিরাপত্তা দেয়?

আর এগুলো বড়দের অস্থির করে চলে ক্রমাগত! আর এর একটা অংশ নানাভাবে শিশুদের মধ্যে প্রভাবিত হয়। অবশ্য আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া বা ইন্টারনেটের কল্যাণে শিশুরা অনেক খবর নিজেরাই সরাসরি জেনে যায়। সমস্যা হলো ওরা যখন প্রশ্ন করে তখন কি উত্তর দেওয়া যায়?

আমরা নিজেরাই শৈশব থেকে একটা হ-য-ব-র-ল দেশের পরিস্থিতি দেখে বড় হতে হতে ভাবি আমার সন্তানের ক্ষেত্রে এমনটা হবে না! ওদের বোঝাই, রাস্তা ধরিয়ে দেই যে, কী করলে বা কীভাবে প্রস্তুতি নিলে দেশ ছেড়ে অন্য কোনো দেশে গিয়ে শান্তিতে থাকা যাবে!

আমরা ক্রমশ কেবল ব্রেইন ড্রেইন নয় বরং শান্তির খোঁজে কঠিন পদক্ষেপ নিয়ে ফেলি! কে চায় দেশত্যাগ করতে? কার ইচ্ছে করে?

একটা মানুষ যে শৈশব থেকে নিজ ভূমিতে বেড়ে ওঠে তার কি ইচ্ছে করে না দেশেই শান্তিতে মরতে? করে, কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের এগোতে দিচ্ছেই না!

শিশুরা প্রতিদিন বের হতে চায়, খেলতে চায়, খেলার পরিবেশ চায় আর এর জন্য স্কুল, কলেজের চেয়ে চমৎকার স্থান আর কী হতে পারে? শিক্ষার্থী যেমনই হোক সমবয়সীদের সঙ্গ শিশুদের মনকে রাখে প্রফুল্ল।

সরকারের স্বৈরাচার হয়ে ওঠা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অপরাগতা, ধর্মীয় বিবাদ সামলাতে হিমশিম খাওয়াসহ ক্রমশ বেড়ে চলা জনসংখ্যাকে ‘এসেট’ হিসেবে তৈরি করার ব্যর্থতা তো মানুষকে কোনোমতেই শান্তি দিচ্ছে না!

‘পারফেক্ট সোশ্যাল ব্যাল্যান্স’ ও ‘হারমনির’ ভীষণ অভাব আমরা অনুভব করছি। আর যতদিন ধরে সোশ্যাল ব্যাল্যান্স মিসিং থাকবে ততদিনে সাধারণের মনে শান্তি আসবে না। শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউ ভালো থাকবেন না।

আমরা যখন শান্ত পরিবেশে যাই কেমন অনুভব করি? আবার যখন হইচই হট্টগোলের মধ্যে যাই তখন? কাজেই নিজেকেই প্রশ্ন করি, এখন যে অবস্থায় আছি এটা কি একজন মানুষ হিসেবে আমাকে, আমাদের শিশু ও পরিবারের সবাইকে শান্তি দিচ্ছে? কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে দোষারোপ না করে বরং সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করি, চলুন।

একে অপরকে কাঁদা না ছিটিয়ে হিংসা ভুলে এক হই। শৈশবে পড়েছিলাম ‘একতাই বল’। মনে আছে না ভুলেই গেছি? 

ফারহানা মান্নান : প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, শৈশব; শিক্ষা বিষয়ক লেখক ও গবেষক